মার্কিন দূতাবাসের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট গঠনে পুলিশের প্রাথমিক সম্মতি
ঢাকার মার্কিন দূতাবাস তাদের কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য একটি স্বতন্ত্র পুলিশ বাহিনী গঠনের অনুরোধ নবনির্বাচিত সরকারের কাছে পুনরায় পেশ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই প্রস্তাবটি নাকচ করা হলেও বাংলাদেশ পুলিশ এখন এতে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে।
কূটনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের একজন কর্মকর্তা টিবিএসকে জানান, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোতে বারবার হামলার ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে মার্কিন দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদল পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ও অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, দূতাবাস ৩০ সদস্যের একটি ইউনিট গঠনের অনুরোধ করেছে, যার নেতৃত্বে থাকবেন একজন উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি)। এই ইউনিটের মূল কাজ হবে মার্কিন কূটনীতিকদের সুরক্ষা দেওয়া। দূতাবাস শুরুতে তাদের নিজস্ব রিজিওনাল সিকিউরিটি অফিসারকে (আরএসও) এই ইউনিটের প্রধান করার প্রস্তাব দিলেও বাংলাদেশ পুলিশের আপত্তির মুখে তারা ডিআইজির নেতৃত্বে কাঠামো গঠনে সম্মত হয়।
প্রস্তাবিত এই বাহিনী মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের স্পিয়ার প্রোগ্রামের অধীনে কাজ করবে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো স্বাগতিক দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রশিক্ষিত করার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা, যাতে যেকোনো হুমকি বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়।
মালি, বেনিন, বুরকিনা ফাসো, মৌরিতানিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, নাইজার, কেনিয়া, তিউনিসিয়া, ইরাক, দক্ষিণ সুদান, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, চাদ ও নাইজেরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে স্পিয়ার-এর কুইক রেসপন্স টিম এখন সক্রিয় রয়েছে।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ উভয় পক্ষই এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল। সে সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক চিঠির প্রেক্ষিতে পুলিশের মতামত চাওয়া হলে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
এরপর তৎকালীন আইজিপি বাহারুল আলম এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, বাংলাদেশে ইতিমধ্যে একটি কূটনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগ রয়েছে যা ঢাকার সব বিদেশি মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তিনি বলেছিলেন, 'কেবল একটি দূতাবাসের জন্য আলাদা বাহিনী বরাদ্দ করা হলে তা বৈষম্যমূলক হবে।'
বর্তমান পুলিশ-প্রধানের মন্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে এ বিষয়ে বারবার যোগাযোগ করা হলেও ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বৈষম্যমূলক আচরণের আশঙ্কা
এই প্রস্তাব নতুন করে উত্থাপিত হওয়ায় কূটনীতিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা সতর্ক করে বলছেন, একটি নির্দিষ্ট দূতাবাসের জন্য আলাদা ইউনিট গঠন করা হলে অন্য বিদেশি মিশনগুলোর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের যৌক্তিক নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো বিবেচনা করা। তবে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ হিসেবে দেখা হতে পারে। এর পরিবর্তে তিনি পুরো কূটনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের সব সদস্যকে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেন।
আগে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতদের অতিরিক্ত পুলিশ এসকর্ট সুবিধা দেওয়া হতো। তবে ২০২৩ সালের মে মাসে সব কূটনৈতিক মিশনের জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে তৎকালীন সরকার এই সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়।
স্পিয়ার প্রোগ্রাম কী?
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে দূতাবাসের নিরাপত্তা সুসংহত করার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি সার্ভিসের অ্যান্টি-টেরোরিজম অ্যাসিস্ট্যান্স' (এটিএ) উদ্যোগের অধীনে স্পিয়ার প্রোগ্রাম চালু করা হয়।
এই প্রোগ্রামের আওতায় স্বাগতিক দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে বিশেষায়িত কুইক-রেসপন্স টিম গঠন করা হয় এবং তাদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তারা কয়েক মিনিটের মধ্যে জরুরি পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই টিমগুলো বিভিন্ন দেশে হামলা প্রতিরোধ, অপরাধ দমন ও জরুরি সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
