অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোর অপেক্ষায় সরকার; কার্যত অচল দুদক
অনুসন্ধান, মামলা, চার্জশিট কিংবা অভিযুক্তদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা—তিন সদস্যের কমিশনের অনুমোদন ছাড়া এসব গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারে না দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মার্চ মাসের শুরুতে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার একসঙ্গে পদত্যাগ করার পর গত এক মাস ধরে এসব কাজের কোনোটিই করতে পারছে না দুদক; ফলে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে সংস্থাটিতে।
বর্তমান সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ আইনে রূপান্তর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কমিশনার নিয়োগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতির নেতৃত্বে একটি সার্চ কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। এই কমিটিতে আরও থাকবেন হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি), সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান, সরকারি দল ও বিরোধী দল থেকে একজন করে সংসদ সদস্য এবং দুর্নীতিবিরোধী কাজে অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি।
এই কমিটি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন ও মনোনয়ন আহ্বান করবে এবং প্রয়োজনে নিজ উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহ করবে। যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। এরপর প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুইজনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা হবে। এছাড়া কমিশন সর্বোচ্চ পাঁচজন কমিশনার নিয়ে গঠিত হবে, যার মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং একজন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে দক্ষ ব্যক্তি থাকতে হবে।
অধ্যাদেশটি বিল হিসেবে সংসদে উত্থাপন ও পাশ করা না হলে ১১ এপ্রিল মধ্যরাতের পর এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকরিতা হারাবে।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি মনোনীত একজন বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি প্রার্থীদের সুপারিশ করে থাকে এবং সেখানে কমিশন হয় তিন সদস্যবিশিষ্ট।
বিঘ্নিত হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান
দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে টিবিএসকে বলেন, কমিশন ছাড়া দুদক একপ্রকার অচল। 'গত দেড় বছরে দুদক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবিরোধী ড্রাইভ দিয়েছে। সর্বোচ্চ সংখ্যক মামলা, চার্জশিট, জব্দ করেছে। এখন কমিশন অনুমোদন না দিলে অনুসন্ধান, মামলা অনুমোদন করা সম্ভব হয় না। এমনকি কমিশন না থাকায় আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া যাচ্ছে না। এতে অভিযুক্তদের আত্মগোপন বা দেশত্যাগের ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে,' বলেন তিনি।
দুদক সূত্র জানায়, গত ৩ মার্চ তিন সদস্যের কমিশন পদত্যাগ করে। কমিশন না থাকায় অভিযোগ অনুসন্ধানের অনুমোদন, নতুন মামলা করা, চার্জশিট অনুমোদন, সম্পত্তি ক্রোক ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এতে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, কমিশন ছাড়া দুদক আইনে নির্ধারিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে কমিশন থাকার সময় যেসব অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুমোদিত হয়েছিল, সেগুলো চলমান রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, কমিশন না থাকায় দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। 'নেতৃত্বহীন দুদক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফলে সংস্থাটি একপ্রকার অকার্যকর হয়ে পড়েছে।'
তিনি আরও বলেন, সরকার কী প্রক্রিয়ায় দুদক কমিশন গঠন করবে, তা তাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। সংসদে অধ্যাদেশ পাশ না হলে আগের নিয়মে কমিশন গঠন হতে পারে। আগের নিয়মেই যদি কমিশন গঠন হয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে, সরকার সংস্কারবিমুখ। যদিও সংশোধনী অধ্যাদেশে দুদক সংস্কার কমিশনের পুরো প্রস্তাবনা মানা হয়নি আমলাতন্ত্রের চাপে, তবুও তা আগের চেয়ে ভালো।
স্থবির হয়ে পড়ার আগে রেকর্ড কার্যক্রম
২০২৫ সালে সর্বোচ্চসংখ্যক অনুসন্ধান, মামলা ও সম্পদ জব্দ করেছে দুদক। গত বছর ৮৭৪টি মামলা করে কমিশন, যেখানে ২০২৪ সালে ৪৫১টি মামলা হয়। আবার ২০২৫ সালে ২ হাজার ৫৩৬টি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশ। ২০২৪ সালে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল মাত্র ৮৪৫টি।
একইসাথে রেকর্ড পরিমাণ সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করার আদেশও দেয়া হয়। ২০২৫ সালে সম্পদ জব্দ ও ফ্রিজ আদেশের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে। ওই বছরে মোট ৩০ হাজার ৩৫২.৭৫ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ ও ফ্রিজ করা হয়েছে—যেখানে শুধু ফ্রিজ আদেশই ছিল ২৪ হাজার ১১৭.৩৭ কোটি টাকা এবং জব্দ করা হয়েছে ৬ হাজার ২৩৫.৩৮ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৬১.৪৫ কোটি টাকা। ২০২৩ ও ২০২২ সালেও যথাক্রমে ৪১৫.৪৩ কোটি ও ৮১০.৭১ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ ও ফ্রিজ করা হয়েছিল, যা ২০২৫ সালের তুলনায় অনেক কম।
একইভাবে জরিমানা আদায় ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ জমার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে আদালত চারগুণ বেশি জরিমানা আদেশ দিয়েছেন এবং ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে, যা আগের বছরের ৮১ কোটি টাকার তুলনায় অনেক বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ড. আব্দুল মোমেনকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। একই সময়ে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সাবেক জেলা জজ মিঞা মুহাম্মদ আলী আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদকে।
কমিশনের তিন সদস্যই গত ৩ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
