‘নামের ভুলে’ ১৮ বছর জেল: বাদল ফরাজির মুক্তির দাবিতে ৭ দিনের আলটিমেটাম
'নামের ভুলে' দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ভারত ও বাংলাদেশের কারাগারে বন্দি বাদল ফরাজির মুক্তির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার দাবিতে সরকারকে সাত দিনের আলটিমেটাম দিয়েছেন তার স্বজন ও মানবাধিকারকর্মীরা। তবে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আদেশ না পাওয়ায় তাকে মুক্তি দেওয়া যাচ্ছে না।
গতকাল সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে 'বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ' ব্যানারে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এই আলটিমেটাম দেওয়া হয়। 'ভুল বিচারে ১৮ বছর, ভারত থেকে বাংলাদেশ! বাদল ফরাজির মুক্তি কবে?'—এই স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত কর্মসূচিতে বাদল ফরাজির বড় বোন আকলিমা আক্তার, প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা পাভেল বাবু এবং 'বাদলের কারাবাস' বইয়ের লেখক রাহিতুল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনে ভাইয়ের মুক্তি চেয়ে আকলিমা আক্তার বলেন, "বাদল ফরাজি নির্দোষ। তাই ভারত তাকে বন্দিবিনিময় চুক্তিতে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল। ভারতের আইন অনুযায়ী চার বছর আগেই তার সাজা শেষ হলেও বাংলাদেশ সরকার আজও তাকে মুক্তি দেয়নি। তাকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "ছেলের মুক্তির আশায় থাকতে থাকতে আমার বাবা মারা গেছেন। মা-ও এখন মৃত্যুশয্যায়। তিনি ছেলেকে একনজর দেখার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন। আমার মা যেন মৃত্যুর আগে তাঁর ছেলেকে একবার দেখে যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করুন। সরকার যেন আমার ভাইয়ের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে তাকে মুক্তি দেয়।"
২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ঘুরতে ভারত যান বাদল ফরাজি। পরে ২১ জুলাই তাকে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। অভিযোগ ওঠে, ওই বছরের ৬ মে দিল্লির অমর কলোনিতে এক বৃদ্ধা খুনের ঘটনায় 'বাদল সিং' নামে একজনকে খুঁজছিল পুলিশ। নামের মিল থাকায় পুলিশ ভুলবশত বাদল ফরাজিকে গ্রেপ্তার করে। এই মামলার শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট দিল্লির আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং পরবর্তীতে উচ্চ আদালতও সেই সাজা বহাল রাখেন।
গ্রেপ্তারের পর দিল্লির তিহার কারাগারে ১০ বছর কারাভোগ করেন বাদল। সেখানে বসেই তিনি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন। একপর্যায়ে বন্দিদের কাউন্সেলিং করতে যাওয়া মানবাধিকারকর্মী রাহুল কাপুরের নজরে আসেন বাদল। শুরু হয় 'জাস্টিস ফর বাদল' শীর্ষক স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি। পরবর্তীতে সরকারের প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ভারত তাকে বন্দিবিনিময় চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।
বাদলের পরিবারের দাবি, ভারতীয় আদালতের আদেশ অনুযায়ী ২০২২ সালের ২০ জুলাই বাদল ফরাজির ১৪ বছরের সাজা পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু মুক্তির চার বছর পেরিয়ে গেলেও আইনি জটিলতায় তিনি এখনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
তবে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, যাবজ্জীবন সাজা মানে আমৃত্যু কারাবাস। কোনো বন্দি ১৪ বছর সাজা ভোগ করার পর ভালো আচরণের জন্য অনেক সময় সাজা মওকুফ করা হয়। বাদলের ক্ষেত্রে সাজা কমানোর জন্য ভারতের কাছে 'রিভিউ' আবেদন করা হলেও দেশটির সরকার তা নাকচ করে দেয়। এই কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ টিবিএসকে বলেন, "বাদল ফরাজির মুক্তির বিষয়ে কারাগারে কোনো সুনির্দিষ্ট আদেশ না আসায় তাকে মুক্তি দেওয়া যাচ্ছে না।"
এদিকে মানববন্ধনে লেখক রাহিতুল ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "শুধু নামের মিল থাকায় একজন মানুষ ১৮ বছর ধরে কারাবন্দি রয়েছেন, এর চেয়ে বড় অমানবিকতা আর হতে পারে না। আইনি জটিলতা থাকলে তা আগামী সাত দিনের মধ্যে দূর করে তার মুক্তি নিশ্চিত করুন। অন্যথায় আমরা আবারও রাজপথে নামব।"
প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশনের পাভেল বাবু বলেন, "তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই তিনি বাদল সিং, তারপরও তো তার সাজা শেষ হয়েছে। এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আগামী সাত দিনের মধ্যে সরকারকে মুক্তির বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।"
