ঢাকার বস্তিতে হামের প্রাদুর্ভাব: অপুষ্ট ও টিকাবঞ্চিত শিশুরাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ঢাকার বস্তিতে বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো।
রাজধানীর কড়াইল বস্তির বাসিন্দা দেড় বছর বয়সী ওয়াসেনা গত সাত দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। অবস্থার অবনতি হলে গত বৃহস্পতিবার তাকে মহাখালীর ডিএনসিসি (ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন) কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তার মা মুন্নি বেগম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "পাঁচ দিন ধরে জ্বর ছিল, নাপা খেয়েও জ্বর কমছিল না। পরে চোখ লাল হয়ে যায়, মুখে ঘা হয়, পানিও খেতে পারছিল না। বস্তির ফার্মেসির দোকানদারের পরামর্শে এ হাসপাতালে নিয়ে আসি।"
তিনি জানান, ওয়াসেনা এখনো হামের কোনো টিকা পায়নি। অসুস্থ থাকায় টিকা দেওয়া হয়নি। আশপাশের অনেক বাচ্চার জ্বর থাকায় তাদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে ওয়াসেনা হামে আক্রান্ত হতে পারে বলে তার ধারণা।
একই চিত্র দেখা গেছে ১৪ মাস বয়সী রায়হানের ক্ষেত্রেও। ঈদের পরদিন থেকে জ্বরে ভোগা এই শিশুর শরীরে পরে র্যাশ ও মুখে ঘা দেখা দেয়। কড়াইল বস্তির এই শিশুটি ৯ মাস বয়সে গ্রামে থাকার কারণে টিকা নিতে পারেনি। এখন ৯ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সোমবার দুপুরে ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে এখন শুধু হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের ভর্তি নেওয়া হচ্ছে। সারা দেশ থেকে রেফার করা রোগীদেরও ভর্তি করা হচ্ছে। তবে রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভর্তি রোগীদের অধিকাংশই ঢাকার এবং তাদের বড় অংশ কড়াইল বস্তির বাসিন্দা।
ডিএনসিসি হাসপাতালে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৭৭ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল, যার মধ্যে ৪৪ জন আইসিইউতে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৫২ শিশু। এখন পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৭৫ জন।
চিকিৎসকেরা জানান, ঘনবসতি, অপুষ্টি ও টিকাদানের ঘাটতির কারণে বস্তি এলাকার শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ডিএনসিসি হাসপাতাল কড়াইল বস্তির কাছাকাছি হওয়ায় সেখানকার রোগী বেশি আসছে।
ডিএনসিসি হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. আসিফ হায়দার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিতে শিশুরা একসঙ্গে বসবাস ও খেলাধুলা করে, ফলে খুব দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়। বস্তির শিশুরা অনেক সময় অপুষ্টিতে ভোগে, কৃমির সমস্যাও থাকে। এর সঙ্গে টিকা না নেওয়ার বিষয়টি যুক্ত হলে হামের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের হাসপাতালে সারা দেশ থেকে রেফার করা রোগীরা আসছে। কোন এলাকার রোগী বেশি—সে তথ্য আলাদা করে রাখা হয়নি। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আমরা সব তথ্য পাঠাচ্ছি, যাতে হটস্পট নির্ণয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।"
ডা. আসিফ বলেন, হাসপাতালে আসা বেশিরভাগ শিশুই টিকা নেয়নি বা এক ডোজ নেওয়ার পর আরেকটি ডোজ নেয়নি। এমনকি নয় মাসের কম বয়সী শিশুর মধ্যেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে মাতৃদুগ্ধ থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টিবডি সব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল একদিনে হাম ও হাম-সন্দেহে আক্রান্ত রোগীর হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মিলিয়ে ১ হাজার ৪৬২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এ সময় সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুজনের ক্ষেত্রে হাম নিশ্চিত এবং পাঁচজনের ক্ষেত্রে উপসর্গ ছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ২০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১১৮ শিশু। ১৫ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৯৯ জন হাম রোগী পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে। সারা দেশে শনাক্ত হওয়া সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৫৩৪ জন, যার মধ্যে ৬ হাজার ১৬ জন ইতোমধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে।
অপুষ্ট ও টিকাবঞ্চিত শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়লেও সব শিশু সমানভাবে ঝুঁকিতে নয়; বরং অপুষ্টি ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকা শিশুরাই বেশি জটিল অবস্থায় পড়ছে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "হাম প্রায় সব শিশুকেই আক্রান্ত করতে পারে। তবে গুরুতর অবস্থায় যাচ্ছে মূলত সেই সব শিশু, যারা আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে বা ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মতো সমস্যায় আক্রান্ত। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারাই বেশি জটিলতায় পড়ে এবং হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।"
ডা. মুশতাক আরও জানান, দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার বা প্রয়োজনীয় ভিটামিন—বিশেষ করে ভিটামিন এ—পায় না। অনেক ক্ষেত্রে মায়েরা কাজের জন্য বাইরে থাকায় শিশুরা পর্যাপ্ত বুকের দুধ থেকেও বঞ্চিত হয়। ফলে এসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হাম তাদের জন্য মারাত্মক আকার ধারণ করে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিওনেটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ও অপুষ্টির শিকার শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ; একজন রোগী অন্তত ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই কোনো শিশুর জ্বর বা কাশি হলে তাকে অন্য শিশুদের থেকে দূরে রাখতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "হাম হলে র্যাশ দেখা দিতে কয়েকদিন সময় লাগে। বর্তমানে যেহেতু প্রাদুর্ভাব চলছে, তাই শিশুর জ্বর বা চোখ লাল হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে এবং ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে হবে।"
হাম প্রতিরোধে বস্তি এলাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করতে কোভিডের মতো কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং চালু করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, "হাসপাতালে আসা রোগীদের তথ্য নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের সংস্পর্শে আসা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের আইসোলেশনে রাখা গেলে বা প্রাথমিক অবস্থাতেই রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া গেলে সংক্রমণ কমানো সম্ভব। অনেক পরিবারে মা-বাবা কাজ না করলে আয় বন্ধ হয়ে যায়। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে, যাতে তারা সহজে চিকিৎসা নিতে পারে এবং আইসোলেশনে থাকতে পারে।"
