এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি এখনো সম্পূর্ণ নয়: আমীর খসরু
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের এই লক্ষ্য অর্জনের মতো প্রস্তুতি এখনো সম্পূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপ, উচ্চ সুদের হার এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বর্তমানে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোববার (১৯ জানুয়ারি) রাজধানীর শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত 'ন্যাশনাল মাল্টি-স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন' বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বল্পোন্নত দেশ হতে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে সরকারের অনুরোধে জাতিসংঘের ইউএন-ওএইচআরএলএলএস-এর তৈরি করা একটি 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রাজুয়েশান রেডিনেস এসেসমেন্ট' প্রতিবেদন উপস্থাপনের জন্য এই সভার আয়োজন করা হয়।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, 'বাংলাদেশ বর্তমানে একটি জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার মূলত 'ফায়ার ফাইটিং' পদ্ধতিতে প্রতিদিনের সংকট মোকাবিলা করছে। অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই এখন নিম্নমুখী। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, সরকারি তহবিলে ধারাবাহিক চাপ বা 'রক্তক্ষরণ' পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্য এবং আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, 'এটি শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং খাদ্যসহ সব ধরনের পণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়াবে; যা ইতিমধ্যে একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা।'
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম দ্বিগুণ হয়েছে এবং শ্রীলঙ্কায় তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ এখনো দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তবে জনগণের ওপর হঠাৎ করে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করার চেষ্টা থাকলেও, দীর্ঘ সময় এই চাপ সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারি তহবিল থেকে এভাবে রক্তক্ষরণ চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত এর ক্ষতি জনগণের ওপরই বর্তাবে।
সংকট উত্তরণে সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'বিএনপির ম্যানিফেস্টোতে যে অর্থনৈতিক নীতিগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট সমন্বয় তৈরি হয়েছে। এসব নীতির কার্যকর ও সময়োচিত বাস্তবায়ন সম্ভব হলে অর্থনীতি একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।'
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে গ্র্যাজুয়েশন স্থগিত রাখা বা সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা হলো—আগামী প্রায় তিন বছরের মধ্যে অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোকে শক্তিশালী করা। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারলে ভবিষ্যতে গ্র্যাজুয়েশন একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হয়ে উঠবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউএন-ওএইচআরএলএলএস এবং বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয় সহযোগিতা প্রদান করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ইউএন-ওএইচআরএলএলএস-এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মিজ রাবাব ফাতিমা এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।
