অপরিশোধিত তেল নিয়ে অনিশ্চয়তা, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন চলবে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত
রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) কাছে অপরিশোধিত তেলের মজুত আছে ৩৭ হাজার ৯৯০ মেট্রিক টন। বর্তমানে সক্ষমতার কম পরিশোধন করায় মজুতকৃত জ্বালানি দিয়ে রিফাইনারিটি আগামী ৬ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত চলবে। এরপর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে এটি বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি বাংলাদেশ।
ইআরএলের তথ্যমতে, শোধনাগারটিতে দৈনিক গড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিক টন তেল পরিশোধন করা যায়। তবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বর্তমানে দৈনিক ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টন জ্বালানি পরিশোধন করা হচ্ছে। আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৩৭ হাজার ৯৯০ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রড অয়েল) মজুত রয়েছে।
সেই হিসাবে আরো ১০ দিন চলবে পরিশোধন কার্যক্রম। এরপর আগামী ৬ এপ্রিল সকাল থেকে শোধনাগারটির মূল কার্যক্রম ক্রুড অয়েল পরিশোধন বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এরপর কিছুদিন সেকেন্ডারি পরিশোধন কার্যক্রম চলবে।
এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল বোঝাই একটি জাহাজ গত ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পথে যাত্রা করার কথা থাকলেও তা আটকে যায়। জাহাজটির চুক্তি বাতিল করা হয়।
এছাড়া আবুধাবি থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলের আরেকটি চালানও বাতিল করা হয়েছে। ফলে চলতি মাসে অপরিশোধিত তেলের কোনো চালান দেশে আসেনি। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আগামী মাসে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে, যেখানে প্রতি ব্যারেলে অতিরিক্ত ২৫ সেন্ট বেশি ব্যয় হচ্ছে। সে অনুযায়ী, আগামী ৬ এপ্রিলের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের চালান আসার সম্ভবনা নেই।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশেনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে ক্রুড অয়েলের সংকট থাকলেও পর্যাপ্ত পরিশোধিত তেল আমদানি করা হচ্ছে। তুলনামূলক কম হলেও ইআরএলের উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। কারণ, শোধনাগারটি বন্ধের খবরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে জ্বালানি খাতে।
বিপিসির তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ বেশি। প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ভারত ও চীন থেকে বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। এছাড়া পেট্রোল শতভাগ ও অকটেনের বড় অংশ দেশে উৎপাদন হয়।
অবৈধ মজুতের কারণে সংকট
বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠে জ্বালানির সরবরাহ থাকলেও মজুতদারের কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের বেশি তেল সংগ্রহ ও মজুত করছেন। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। এছাড়া অবৈধ সুযোগসন্ধানী মজুতদার তো আছেই।
যেমন, শুক্রবার (২৭ মার্চ) চট্টগ্রামের বিমান বন্দর সংলগ্ন এলাকা থেকে ২৭টি ড্রামে অবৈধ মজুত ৫ হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল জব্দ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার ও মেরিন বিভাগের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ৩১ হাজার ২০৩ মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে। এ নিয়ে চলতি মাসে ২৮টি জাহাজ মোট ৭ লাখ ৯০ হাজার ৭৪০ মেট্রিক টন জ্বালানি পরিবহন করেছে।
এসব চালানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা এবং গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি রয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৯ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ৩৯ হাজার ৭১৬ টন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), ৭৮ হাজার ২৫ টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল, ১ লাখ ৭৬ হাজার ২০২ টন গ্যাস অয়েল, ৯ হাজার ৯০৯ টন বেস অয়েল এবং ৫ হাজার ১৯ টন মনোইথিলিন গ্লাইকল রয়েছে। এছাড়া পাইপলাইনে ভারত থেকে ডিজেল আমদানিও অব্যাহত আছে।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) দুপুরে সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক আছে। ফলে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে মজুতদারি ও কালোবাজারির চেষ্টা করছে। সরকার এসব অনিয়ম প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিকল্প খুঁজছে বিপিসি, প্রতিবন্ধকতা ক্রুড অয়েলের ধরন
বিপিসির তথ্যমতে, সরকারি তেল পরিশোধনাগার ইআরএল তৈরি করা হয় ১৯৬৮ সালে। বিপিসির মাধ্যমে আনা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল তারা শোধন করে। এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল ও ফার্নেসসহ ১৬ রকমের তেল জাতীয় পণ্য উৎপাদন করে ইআরএল। বাৎসরিক পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। এছাড়াও ক্রুডের সঙ্গে সংমিশ্রণ হিসেবে বছরে প্রায় এক মেট্রিক টন প্রাকৃতিক গ্যাস কন্ডেন্সেট প্রসেস করে ইআরএল।
কিন্তু নির্মাণপ্রতিষ্ঠা থেকেই এই শোধনাগারে সৌদি আরব থেকে আমদারি করা অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড (এএলসি) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা মারবান ক্রুড প্রক্রিয়াজাত করা যায়। ফলে বিকল্প খুঁজতেও বেগ পেতে হবে সংস্থাটিকে। কারণ, সব ধরনের ক্রুড অয়েল এখানে পরিশোধন করা সম্ভব নয়।
স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়েনি। আর ৩০ লাখ টন পরিশোধন সক্ষমতার ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও নানা জটিলতায় প্রকল্পটি অনুমোদন পেতে ১৪ বছর সময় লাগে।
তবে বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, সংকট তৈরি হওয়ার পর অন্য উৎস থেকে কাছাকাছি স্পেসিফিকেশনের ক্রুড অয়েলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। বিশেষ করে আফ্রিকা ও ইউরোপের মতো দেশ থেকে আমদানির কথা ভাবছে সরকার। কাছাকাছি ধরনের অপরিশোধিত তেল পরীক্ষামূলক পরিশোধনের কথাও ভাবছে সংস্থাটি।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মো. জাহাঙ্গীর কবির গত বুধবার টিবিএসকে বলেন, অপরিশোধিত তেলের দুটি জাহাজ আটকে যাওয়ায় সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছিল। বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বেশ কিছু নতুন সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগযোগ করা হচ্ছে। আগামী মাসে তেল সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে।
