তেল বিক্রির সীমা বেঁধে দেয়ার পরেও পেট্রোল পাম্পগুলোতে কমছে না ‘প্যানিক বায়িং’
সরকারি আশ্বাস আর কঠোর রেশনিং—কোনো কিছুতেই কমছে না রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোর ভিড়। আজ শনিবার (৭ মার্চ) সকাল থেকেই ঢাকা ও এর আশপাশের পাম্পগুলোতে তেল নিতে আসা গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের শঙ্কায় গত ৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া 'প্যানিক বায়িং' বা আতঙ্কিত হয়ে তেল কেনা আজও অব্যাহত রয়েছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সরেজমিন পরিদর্শনে তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন এবং পরিবাগের দুটি পাম্পসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গাড়ির দীর্ঘ জট দেখা যাচ্ছে।
সাভারের আফজাল ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. শাহিন আলমের কণ্ঠেও অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, 'শেষবার তেল পেয়েছি বুধবার (৪ মার্চ)। সেসময় ৪,৫০০ লিটার অকটেন ও ১৩,৫০০ লিটার ডিজেল পেলেও সেই মজুদ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।' আগামীকাল (৮ মার্চ) স্থানীয় ডিপো থেকে তেল মিলবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান তিনি।
হরমুজ প্রণালী বন্ধের খবরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি চাহিদার ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এটি বড় উদ্বেগের।
চাপ সামলাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) তেল বিক্রির সীমা বেঁধে দিয়েছে। নতুন নির্দেশনায় মোটরসাইকেলে দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার, প্রাইভেট কারে ১০ লিটার, এসইউভি বা মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস ও ভারী যানে ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল বরাদ্দ করা হয়েছে।
রাজধানীর পাম্পগুলোর চিত্র
রাজধানীর পরিবাগের 'পূর্বাচল ট্রেডার্স' ফিলিং স্টেশনের প্রবেশমুখে ঝুলছে 'অকটেন, পেট্রোল নেই' লেখা সাইনবোর্ড। একের পর এক মোটরসাইকেল চালক এসে হতাশ হয়ে ফিরছেন। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন বাকবিতণ্ডায়।
পাম্পের এক অপারেটর জানান, ভোর ৪টায় তাদের অকটেন ও পেট্রোলের মজুদ শেষ। তিনি বলেন, 'বৃহস্পতিবারের (৫ মার্চ) পর আর তেল পাইনি। এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি। আতঙ্কে সবাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছেন।'
তেল নিতে আসা বাইক চালক রুবেল আহম্মেদের অভিযোগ, 'সাতটি পাম্প ঘুরেও তেল পাইনি। কেউ বলছে স্টক নেই, কেউ বলছে সরকার দাম না বাড়ানো পর্যন্ত বেচবে না।
আমার ধারণা, পাম্প মালিকরা তেল মজুদ করছেন।' তবে তেল না থাকলেও পাম্পটিতে গ্যাসের জন্য সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
পাশের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে সরকারি নির্দেশ মেনে তেল বিক্রি হলেও বাইরে গাড়ির দীর্ঘ সারি। রমনা পেট্রোল পাম্পে ২০ মিনিট ধরে অপেক্ষায় থাকা চাকরিজীবী লিমন হাসান টিবিএসকে বলেন, 'মাত্র ২ লিটার তেল দিচ্ছে।
কাল অফিস, যাতায়াত নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। অন্তত ৫ লিটার দিলে সুবিধা হতো। সামনের দিনগুলো নিয়ে শঙ্কায় আছি।'
একই চিত্র নীলক্ষেতের 'মেসার্স পথের বন্ধু' ও ঢাকা কলেজের পাশের পাম্পেও। তেলের অভাবে পাম্প বন্ধ থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় চালকরা।
মাইক্রোবাস চালক আল আমিন বলেন, 'দুপুর ১টা থেকে দাঁড়িয়ে আছি। গাড়িতে সামান্য তেল, রাস্তায় শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়। কখন তেল দেওয়া শুরু হবে সেই অপেক্ষায় আছি।'
জ্বালানি জরুরি অবস্থা ও সরকারি পদক্ষেপ
পরিস্থিতি সামলাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সব ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি বরাদ্দ ১০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
জরুরি খাতকে প্রাধান্য দিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও গ্যাস সরবরাহ ৫০ এমএমসিএফডি কমানো হয়েছে।
এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও জ্বালানি জরুরি অবস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুদ ৭ দিন এবং অকটেনের রিজার্ভ ১৫ দিনের মতো রয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেছেন, 'আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। মানুষের উদ্বেগের কারণে চাহিদা বেড়েছে, তবে মজুদ শেষ হয়ে যায়নি।'
বিপিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাফার স্টক বাড়াতে জি-টু-জি পার্টনার এবং সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও আফ্রিকার সরবরাহকারীদের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা চলছে।
কৃত্রিম সংকট রোধে জেলা প্রশাসন ও বিজিবি নজরদারি জোরদার করেছে। ড্রাম বা কন্টেইনারে তেল বিক্রি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতে রসিদ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম ৩৫ শতাংশ বাড়লেও সরকার আপাতত সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান কমানোতেই মনোযোগ দিচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় নাগরিকদের ব্যক্তিগত যাতায়াত সীমিত করারও আহ্বান জানিয়েছে সরকার।
