পিলখানা ট্র্যাজেডি: বিস্ফোরক মামলায় আসামি হচ্ছেন শেখ হাসিনা
পিলখানা বিদ্রোহের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় আসামি হতে যাচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও সাবেক এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ আওয়ামী লীগের একাধিক হেভিওয়েট নেতাকর্মী।
সংশ্লিষ্ট মামলার চিফ পাবলিক প্রসিকিউটর বোরহান উদ্দিন বলেন, 'সাক্ষীদের সাক্ষ্যকালে নতুন করে অনেকের নাম এসেছে, যাদের নাম ইতোপূর্বে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয় হয়নি। এরমধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনসহ একাধিক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের নাম রয়েছে। আইন অনুযায়ী, এসব নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিধানও আছে। আমি ডিটেইলে এটা এই মুহূর্তে বলতে চাই না। এখানে কর্তৃপক্ষ কীভাবে চায়, সে বিষয়ে আমরা ভাবছি।'
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি দাবি-দাওয়ার নামে পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)-এর কিছু উচ্ছৃঙ্খল সদস্য বিদ্রোহ শুরু করেন। এ সময় তাদের গুলিতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। ওই ঘটনায় পুরো জাতি স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার শেষ হলেও ১৭ বছর ধরে ঝুলে আছে বিস্ফোরক আইনের মামলাটি।
বর্তমানে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক ড. মো. আলমগীরের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ গত ২৯ জানুয়ারি মামলায় দুই সেনা কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য করেন।
এ পর্যন্ত মামলায় ১,৩৪৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩০২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সাক্ষীর জবানবন্দিতে শেখ হাসিনাসহ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় আসামির সংখ্যা ৮২২ জন। এর মধ্যে প্রায় ২৫০ জন জামিনে আছেন। বাকিরা কারাগারে রয়েছেন।
পিলখানা ট্র্যাজেডির ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে প্রথমে চকবাজার থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর করা হয়। ২০১০ সালের ১২ জুলাই হত্যা মামলায় এবং ২৭ জুলাই বিস্ফোরক আইনের মামলায় চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। ২০১১ সালের ১০ আগস্ট হত্যা মামলায় চার্জ গঠন করে বিচার শুরু হয়। তবে বিস্ফোরক আইনের মামলার বিচার স্থগিত ছিল।
২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর হত্যা মামলায় ঢাকার নিম্ন আদালতের রায় ঘোষণা হয়। পরে ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল নিষ্পত্তি হয়। আপিলে খালাস পাওয়া কয়েকজনকে পরবর্তীতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, হত্যা মামলায় ঢাকার নিম্ন আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট আপিলে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং ৪ জনকে খালাস দেওয়া হয়। এছাড়া ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। খালাস পান ২৮৩ জন। হত্যা মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।
এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বলেন, 'আমরা পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিস্ফোরক আইনের মামলার দ্রুত বিচার চাই। আদালত দ্রুত রায় ঘোষণা করুন—এটাই আমাদের কাম্য। কোনো আসামির এ মামলায় জামিন হচ্ছে না। কয়েক দফায় নিম্ন ও উচ্চ আদালতে জামিন চাওয়া হলেও তা নামঞ্জুর হয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই। আশা করি, এ মামলায় সব আসামি খালাস পাবেন।'
প্রসিকিউশন পক্ষ দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি উল্লেখ করে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে দ্রুত মামলাটি নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়েছে।
বোরহান উদ্দিন বলেন, 'নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে বিডিআর শব্দটি আবারও উচ্চারণ করছি। বিজিবির নাম বিডিআর হিসেবে ফেরত যাচ্ছে মর্মে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এসেছে। এটি দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল।'
তিনি জানান, হত্যা মামলায় দণ্ড ও খালাসের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হয়েছে। আপিলে আগে খালাস পাওয়া কয়েকজনকে পরবর্তীতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
