বিএনপির 'বিদ্রোহীদের' প্রত্যাখ্যান করলেন ভোটাররা
নির্বাচনি লড়াইয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা।
অন্তত ৪৬টি আসনে দলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র বা 'বিদ্রোহী' প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন বিএনপির কয়েকজন হাই-প্রোফাইল নেতা। তাদের প্রার্থিতা নির্বাচনি মাঠে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এই ৪৬টি আসনের মধ্যে সাতটিতে জয় পেয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা এবং দুটিতে জয়ী হয়েছে জামায়াত। বাকি ৩৯টি আসনে 'ধানের শীষ' প্রতীকের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করে বেসরকারিভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে এসব ৩৯টি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কা ছিল আগে থেকেই।
তফসিল ঘোষণার পর প্রথমদিকে ১১৭টি আসনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রায় ১৯০ জন বিএনপি নেতা মনোনয়নপত্র জমা দেন। বিদ্রোহ ঠেকাতে দলের পক্ষ থেকে অনেকের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৪৬টি আসনে প্রায় ৭৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে ছিলেন।
ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। সেখানে দারুস সালাম থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও বিদ্রোহী প্রার্থী সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু) ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি। এ আসনে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি জোটের শরিক হিসেবে কোদাল প্রতীকে লড়া বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল ইসলাম পরাজিত হয়েছেন। এখানে জয়ী হয়েছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল ইসলাম মিলন। এ আসনে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম নিরবও আলোচনায় ছিলেন।
অবশিষ্ট ৩৯টি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা বিদ্রোহী প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনে একটি উল্লেখযোগ্য লড়াই হয়, যেখানে বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক এপিএস-২ মো. আব্দুল মতিন খান স্বতন্ত্র বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত জয় পান বিএনপি প্রার্থী সেলিম ভূঁইয়া।
দিনাজপুর-২ ও ৫, পাবনা-৩, সিলেট-৫, নারায়ণগঞ্জ-২ ও ৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, হবিগঞ্জ-১, কিশোরগঞ্জ-১, টাঙ্গাইল-৩ ও ৫, সুনামগঞ্জ-৩, পঞ্চগড়-২, গোপালগঞ্জ-২, বরিশাল-১, নড়াইল-১, ঝিনাইদহ-৪, নওগাঁ-১, ৩ ও ৬, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা, সাতক্ষীরা-৩, চট্টগ্রাম-১৬, রংপুর-৩, মুন্সীগঞ্জ-১, রাজবাড়ী-২, মানিকগঞ্জ-১, যশোর-৫, নোয়াখালী-২, চাঁদপুর-৪, মাদারীপুর-১ এবং ময়মনসিংহ-১, ২, ৬, ৭ ও ৯ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিএনপির দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিলেন। তবে এসব আসনের সবকটিতেই 'ধানের শীষ' প্রতীক বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে।
বিদ্রোহীদের দখলে সাত আসন
বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা হলেন: ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২), শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল (কিশোরগঞ্জ-৫), লুৎফুর রহমান খান আজাদ (টাঙ্গাইল-৩), আব্দুল হান্নান (চাঁদপুর-৪), আতিকুল আলম শাওন (কুমিল্লা-৭), সালমান ওমর রুবেল (ময়মনসিংহ-১) এবং রেজওয়ানুল হক (দিনাজপুর-৫)।
দলের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও 'ধানের শীষ' প্রতীক না পেয়ে সারা দেশে পঞ্চাশের বেশি ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতা শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, জোটের শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া ১৬টি আসনের মধ্যে ১২টিতেই বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এতে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির ভোটে বিভাজন ঘটে এবং ওই আসনগুলোর বেশির ভাগেই বিএনপি-সমর্থিত জোটের প্রার্থীরা পরাজিত হন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি জমিয়তের সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে ছাড় দেয়। তবে 'ধানের শীষ' প্রতীক না পেয়ে দলের সাবেক সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং পরে বহিষ্কৃত হন।
কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনে প্রথমে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল। পরে জোটের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা বিএনপিতে যোগ দিলে তাকে 'ধানের শীষ' প্রতীক দেওয়া হয়। এরপর ইকবাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়।
টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ওবায়দুল হক নাসির মনোনয়ন পান। সেখানে দলীয় প্রতীক না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন বিএনপির সাবেক মন্ত্রী লুৎফুর রহমান খান আজাদ।
চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে বিএনপি মনোনয়ন দেয় সাবেক সংসদ সদস্য ও দলের রাজস্ব এবং ব্যাংকিং বিষয়ক সম্পাদক লায়ন হারুনুর রশিদকে। কিন্তু প্রতীক না পেয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হান্নান স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং বহিষ্কৃত হন।
কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে 'ধানের শীষ' প্রতীক পান। সেখানে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম শাওন স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং দল থেকে বহিষ্কৃত হন।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দলীয় প্রতীক পান। সেখানে উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর রুবেল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বহিষ্কৃত হন।
দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী) আসনে বিএনপি ব্যারিস্টার একেএম কামরুজ্জামানকে মনোনয়ন দেয়। সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় রেজওয়ানুল হককে বহিষ্কার করা হয়।
