প্রথমবার ভোট দেওয়ার আনন্দে উচ্ছ্বসিত তারা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটকেন্দ্রগুলোতে নজর কেড়েছে তরুণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। জীবনের প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরে রীতিমতো আবেগাপ্লুত তরুণ ভোটাররা। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে উচ্ছ্বাস। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ আবার বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে এসেছেন পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী ফারহানা প্রথমবারের মতো নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে দারুণ খুশি। তিনি বলেন, 'প্রথম ভোট দিতে পেরে আনন্দিত। আশা করি, সুষ্ঠু ভোট হবে। যারা সরকারে আসবেন তারা জনগণের জন্য কাজ করবেন। দেশের উন্নয়ন হবে।'
একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর কেন্দ্রগুলোতেও। মিরপুর-২ এর ভোটার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী ফারিহা তাবাসসুম মনিপুর হাই স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছিলেন মা, দাদু ও চাচীর সাথে। ভোট দেওয়ার পর নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, 'অনুভূতি অনেক ভালো। ঈদের মতো আনন্দ। খুশি লাগছে, ভালো লাগছে। ভোট দিতে অনেক এক্সাইটমেন্ট কাজ করছে।'
ঢাকা-৬ আসনের সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন আশরাফুল ইসলাম। ভোটার হওয়ার ১৫ বছর পর এবারই প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলেন তিনি। উচ্ছ্বসিত আশরাফুল বলেন, 'আলহামদুলিল্লাহ ভালো লাগছে। পরিস্থিতি ভালো। ভোটার হয়েছি ১৫ বছর আগে। কিন্তু ভোট দিলাম এই প্রথম। আগে ভোট দেয়ার পরিস্থিতি ছিল না, তাই ভোট দিইনি। তখন তো তাদের ভোট তারাই দিতো।'
রাজধানীর খিলগাঁও মডেল কলেজ কেন্দ্রে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। সেখানে কোলে তিন মাসের শিশু সাইফাকে নিয়ে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে এসেছেন রিমা। জীবনের প্রথম ভোট দিতে পেরে নিজের অন্যরকম ভালো লাগা ও খুশির কথা জানান তিনি। এদিকে, একই কেন্দ্রে ফাহমিদা মেহেনাজ আতশীও প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
৮৯ বছরের দাদা মোতাহারুল চৌধুরীকে নিয়ে প্রথমবার ভোট দিতে এসেছেন খিলগাঁও ঝিলপাড়ের বাসিন্দা ওয়াহিদ চৌধুরী (২৮) ও নানজীবা চৌধুরী (২২)। নানজীবা বলেন, 'আশা করি সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। প্রত্যাশা থাকবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এলাকাকে নিরাপদ রাখবেন, নারীবান্ধব একটা পরিবেশ তৈরি করবেন। যেসব সমস্যা আছে—বাস্তবায়ন হয়নি, সেগুলা তারা যাতে প্রায়োরিটি দেন।'
কল্যাণপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর। তরুণদের অনেকে ভোট দিয়ে আঙুলের কালি দেখিয়ে সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন। তরুণ ভোটারের সাথে কথা বলে জানা যায়, কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা তাদের মধ্যে বড় ধরনের আস্থা তৈরি করেছে। জহুর নামে এক তরুণ বলেন, 'আমি গতবার ভোটার হয়েছিলাম, কিন্তু ভোট দিইনি। তখন পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা ছিল। এবার পরিবেশ ভালো মনে হয়েছে, তাই ভোট দিয়েছি। জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা—আপনারা ভালো কাজ করবেন, মানুষের আস্থা ধরে রাখবেন।'
জিনাত আনিফিন ও জেনিফা তাসনিম—দুই বোন সকাল ৮টার মধ্যেই ভোট দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হন। জিনাত বলেন, 'গতবার আমি ভোটার হয়েছিলাম, কিন্তু ভোট দিতে আসিনি। তখন ভোটের পরিবেশ ছিল না, একতরফা নির্বাচন হতো বলে মনে হয়েছিল। এবার পরিবেশ ভালো লেগেছে, তাই ভোট দিয়েছি।'
জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'গণঅভ্যুত্থানের যে বার্তা, তা যেন কাজে প্রতিফলিত হয়। মানুষ যেন না ভাবে পরিবর্তন বৃথা গেছে।' জেনিফা তাসনিম বলেন, 'এবারই আমার প্রথম ভোট। প্রথমবার ভোট দিতে পেরে খুবই উচ্ছ্বসিত লাগছে।'
মোহাম্মদ সাদ্দাম (২৬) জানান, তিনি ২০১৮ সালে ভোটার হলেও এবারই প্রথম ভোট দিয়েছেন। তার ভাষায়, 'ভোট দিতে পেরে মনে হলো আমি সত্যিকারের একজন নাগরিক।'
আবার দুই বোন ডালেয়া আক্তার ও তানিয়া আক্তার সকাল ১০টার মধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ডালেয়া বলেন, 'আমি যাকে ভোট দিতে চেয়েছি, তাকেই ভোট দিতে পেরেছি—এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে।'
২৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ সামির প্রথম ভোট দিয়ে বলেন, 'তরুণদের কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার বিষয়টি জনপ্রতিনিধিরা গুরুত্ব দিয়ে সংসদে তুলবেন—এটাই প্রত্যাশা।'
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। জাতীয় যুবনীতি ২০১৭ অনুযায়ী, এই বয়সসীমার নাগরিকদের 'যুব' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
