বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ: ‘প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা’ নেবে ইসি
ভোটগ্রহণ শুরুর মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১১টি দলের নেতাদের পৃথক বৈঠক ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবন।
দুই পক্ষই নির্বাচনি পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুতর সব অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, ভোট কেনাবেচাসহ যেকোনো অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
'জনগণই বিশৃঙ্খলাকারীদের প্রতিরোধ করবে': নজরুল ইসলাম খান
বুধবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'যে নির্বাচন প্রতিরোধ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, আমাদের কিছু করা লাগবে না—জনগণই তাদের প্রতিরোধ করবে। এমনকি আমরাও যদি এমন কাজ করার চেষ্টা করি, জনগণ আমাদেরকেও প্রতিরোধ করবে।'
নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, ফেনী-১ আসনে টাকা বিলানোর ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ময়মনসিংহ, রামু, বগুড়ার কাহালু, লক্ষ্মীপুর এবং সৈয়দপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত নেতাদের বেআইনি কার্যক্রমের অভিযোগে আটক করা হচ্ছে। তিনি বলেন, 'এসব বিষয়ে আমরা ইসিকে ভিডিও ও সংবাদ উপাত্ত দিয়েছি। দ্রুত ও শক্ত পদক্ষেপ নিতে বলেছি, যাতে আর কেউ এমন ঘটনার সাহস না পায়।'
সৈয়দপুরে টাকাসহ জামায়াত নেতাকে আটকের ঘটনায় ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবের এক মন্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন নজরুল। তিনি বলেন, 'সচিবের এমন মন্তব্য যে ৫০ লাখ কেন, ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বহন করতে পারেন—এটি ঠিক নয়। ভোটারদের প্রভাবিত করা ঠেকাতেই এখন বিকাশে ১ হাজার টাকার বেশি লেনদেন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরে সচিব দাবি করেছেন তাকে 'মিসকোট' করা হয়েছে। যদি তিনি এমন কথা বলে থাকেন তা দুঃখজনক, আর গণমাধ্যম ভুল করলে সেটিও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।'
এছাড়া শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের একটি ব্যাখ্যামূলক কার্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিষয়টিকে 'রহস্যজনক' বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতা বলেন, 'যারা পরিবর্তন চায় না বা নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পারছে, তারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে পারে। তাই ইসির শক্ত অবস্থান নেওয়া উচিত।'
'সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হবে গণপ্রতিরোধ': জামায়াত
এদিকে, ভোটের দিন কোনো হামলা বা সহিংসতা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। বুধবার ১১ দলীয় জোটের পক্ষে সিইসির সাথে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, 'আমরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছি। এই বীর জনতা আর কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করবে না।'
জামায়াত নেতা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন স্থানে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্বাচনি বুথ ভাঙচুর করা হচ্ছে। তিনি বলেন, 'আমরা কোনো অবস্থাতেই মাঠ ছাড়ব না। জনগণকে সাথে নিয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।'
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, 'যেসব আসনে বিএনপির অবস্থান ভালো সেখানে সিসি ক্যামেরা কম, আর জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থানে ক্যামেরা অস্বাভাবিক বেশি। এটি কমিশনের পক্ষপাতিত্ব।'
সৈয়দপুরে টাকা উদ্ধারের ঘটনাকে 'সুস্পষ্ট নাটক' আখ্যা দিয়ে তিনি দাবি করেন, ব্যাংক বন্ধ থাকায় ব্যবসার প্রয়োজনে ওই নেতা টাকা বহন করছিলেন। ওই অভিযানে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা বিগত সরকারের বিতর্কিত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সহযোগী ছিলেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এছাড়া কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থীর 'ট্রাক মার্কায় ভোট না দিলে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হবে'—এমন হুমকির তীব্র সমালোচনা করেন জুবায়ের। তিনি বলেন, 'সিইসি শুধু আশ্বাস দিচ্ছেন, কিন্তু জাতি এখন কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়।'
ভোট কেনাবেচা ও ইসির প্রস্তুতি
১১ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইসি জানায়, ভোট কেনাবেচা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসি সচিবালয় আরও জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯টি আসনে একটানা ভোটগ্রহণ চলবে। দেশের সব ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপার, নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম পৌঁছে গেছে। রাত ৮টা ২০ মিনিট পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকলেও ইসি বলছে, তারা শতভাগ প্রস্তুত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পূর্ণ তৎপর রয়েছে। এখন সবার নজর কালকের ভোটগ্রহণের পরিবেশ ও ইসির প্রতিশ্রুত 'কঠোর ব্যবস্থা'র দিকে।
