প্রবাসী পোস্টাল ব্যালটের ৬০% হাতে পেয়েছে ইসি, ভোটের দিন বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত রয়েছে সুযোগ
কাতারপ্রবাসী মো. শাহিন মৃধা এক সপ্তাহ আগে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়ে তা পোস্ট অফিসে পাঠিয়েছেন। রোববার তিনি মোবাইলে পোস্টাল ব্যালটের অ্যাপে একটি নোটিফিকেশন পান, যেখানে জানানো হয়—তার দেওয়া ভোট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা গ্রহণ করেছেন।
শাহিন মৃধা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "দীর্ঘ ২৭ বছর প্রবাসী হিসেবে পরিবার ও দেশের জন্য কিছুটা হলেও অবদান রেখে আসছি, কিন্তু কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। এবার আমরা প্রবাসীরা উৎসাহ–উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিয়েছি। সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছি, যখন দেখেছি আমার ভোটটি আমার আসনে পৌঁছেছে।"
আর এক দিন পরই বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
প্রবাসীদের ভোট গ্রহণের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট পাঠানো হয়। এর মধ্যে সোমবার সকাল পর্যন্ত ৪ লাখ ৬০ হাজার ৪৮০টি ব্যালট বাংলাদেশে পৌঁছেছে—যা মোট প্রবাসী পোস্টাল ভোটের প্রায় ৬০ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত যেসব পোস্টাল ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছাবে, সেগুলো গ্রহণ করা হবে। এরপর আসা পোস্টাল ব্যালট বাতিল বলে গণ্য হবে। বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটের পর থেকেই ভোট গণনার কার্যক্রম শুরু হবে সংসদীয় আসনগুলোতে।
ইসি আরও জানিয়েছে, 'পোস্টাল ভোট বিডি' অ্যাপে নিবন্ধিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৫৯ মিনিটের মধ্যে ভোট দিতে হবে। যারা পোস্টাল ব্যালট পাওয়ার পর এখনো কিউআর কোড স্ক্যান করেননি, তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্ক্যান সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সোমবার প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন–সংক্রান্ত 'ওসিভি–এসডিআই' প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত 'পোস্টাল ভোট বিডি' অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধিত প্রবাসী ভোটারদের কাছে মোট ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৮২৪ জন ব্যালট গ্রহণ করেছেন এবং ৫ লাখ ৭ হাজার ৭৫ জন ভোট প্রদান সম্পন্ন করেছেন।
এছাড়া ৪ লাখ ৯১ হাজার ৬৮২ জন প্রবাসী ভোটার তাদের ব্যালট সংশ্লিষ্ট দেশের পোস্ট অফিস বা ডাক বিভাগে জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৪৩১টি ব্যালট ইতোমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে।
একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত (আইসিপিভি) ভোটারদের কাছেও পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। এখন পর্যন্ত দেশের ভেতরে নিবন্ধিত ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮ জন ভোটারের ঠিকানায় ব্যালট পাঠানো হয়েছে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে ৫ লাখ ২৮ হাজার ১৫৬ জন ভোটার ব্যালট গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ৪ লাখ ৭৩ হাজার ১৪৪ জন ভোট দিয়েছেন এবং ৪ লাখ ২৯ হাজার ৮৮২ জন তাদের ব্যালট পোস্ট অফিস বা ডাক বাক্সে জমা দিয়েছেন। এ পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা ২ লাখ ১৫ হাজার ৮৫০টি ব্যালট গ্রহণ করেছেন।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে দেশে ও প্রবাসে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার 'পোস্টাল ভোট বিডি' অ্যাপে নিবন্ধন করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির এক কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এবার ভোট গণনায় বেশি সময় লাগার অন্যতম কারণ পোস্টাল ব্যালট। কেন্দ্রগুলোতে ভোট গ্রহণ শেষে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটের পর গণনার প্রস্তুতি নেওয়া হবে। একই সময়ে পোস্টাল ব্যালটও খোলা হবে।"
ফলে যেসব আসনে পোস্টাল ব্যালটের সংখ্যা বেশি, সেসব আসনের ফল পেতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগবে বলে যাজাজন তিনি।
সর্বোচ্চ পোস্টাল ভোট নিবন্ধন ফেনী-৩ আসনে, সর্বনিম্ন বাগেরহাট-৩-এ
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনেই পোস্টাল ব্যালটে ভোটের জন্য নিবন্ধন হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ নিবন্ধন হয়েছে ফেনী–৩ আসনে—১৬ হাজার ৩৮ জন। এর মধ্যে প্রবাসী পোস্টাল ভোটার ১২ হাজার ৫৩৬ জন।
আর সর্বনিম্ন নিবন্ধন হয়েছে বাগেরহাট–৩ আসনে—১ হাজার ৫৪৪ জন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ১০ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন, এমন আসন রয়েছে ১৮টি। এর মধ্যে সিলেট–১ আসন ছাড়া বাকি সব আসনই চট্টগ্রাম বিভাগে।
এছাড়া চট্টগ্রাম–১৫ আসনে নিবন্ধন করেছেন ১৪ হাজার ২৭৪ জন ভোটার, এর মধ্যে প্রবাসী ১২ হাজার ৪৪৫ জন।
কুমিল্লা–১০ আসনে নিবন্ধন ১৩ হাজার ৯৩৯ জন, এর মধ্যে প্রবাসী ১১ হাজার ৮৯৮ জন।
নোয়াখালী–১ আসনে ১৩ হাজার ৫৯৪ জনের মধ্যে প্রবাসী ১১ হাজার ৬০২ জন এবং নোয়াখালী–৩ আসনে ১২ হাজার ৭৮৩ জনের মধ্যে প্রবাসী ১০ হাজার ৭৬৪ জন।
ফেনী–২ আসনে মোট নিবন্ধন ১২ হাজার ৭৪৭ জন, যার মধ্যে ওসিভি ভোটার ৯ হাজার ৯৪৬ জন।
কুমিল্লা–১১ আসনে ১২ হাজার ৫৪৪ জনের মধ্যে প্রবাসী ভোটার ১০ হাজার ৯৫৯ জন।
সিলেট–১ আসনে মোট নিবন্ধন ১২ হাজার ৪৩৯ জন, এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার ৯ হাজার ৪৮৬ জন।
সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আবদুল আলীম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এই সব পোস্টাল ভোট কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশের মানুষ যেমন বিভিন্ন প্রতীকে ভোট দেয়, প্রবাসীরাও বাংলাদেশেরই মানুষ। তারা এমন নয় যে নির্দিষ্ট কোনো প্রতীক বা দলকেই ভোট দেবে। ফলে এসব ভোট সব দলের দিকেই যাবে।"
তিনি বলেন, "ফেনী–৩ আসনে সর্বোচ্চ পোস্টাল ব্যালটে ভোটার নিবন্ধন হয়েছে ১৬ হাজারের মতো, যা ওই আসনের মোট ভোটারের তুলনায় খুবই সামান্য। এখানে দেশের ভেতরের ভোটের টার্নআউটই বেশি প্রভাব ফেলবে। আবার অনুমোদিত সব পোস্টাল ভোট যে আসবেই, তারও নিশ্চয়তা নেই।"
নির্বাচন কমিশনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বে থাকা এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমার গ্রামের বাড়ি রংপুর। দুই দিন আগে আমি ভোট দিয়েছি। ভালো লাগছে যে নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভোট দেওয়ার সুযোগও পেয়েছি।"
প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে সব প্রতীক থাকলেও দেশের ভেতরের পোস্টাল ব্যালটে ভোটারের নিজ এলাকার প্রতীকই রাখা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরের পোস্টাল ব্যালটে প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আসনের চূড়ান্ত প্রার্থী ও তাদের প্রতীক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় দুই হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে আড়াই শতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বাকিরা ৫১টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৯৭২ জন—যারা ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন।
