ভোটকেন্দ্রে প্রতিবন্ধী ভোটারদের সুবিধা নিয়ে প্রচারের আহ্বান
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কার্যকর প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছে ডিস্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) টিআইবির অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ভোটের দিনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিজস্ব যানবাহন ব্যবহারের সুযোগ, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গাইডসহ ভোট দেওয়ার অনুমতি এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নিচতলায় বিশেষ বুথ স্থাপনের মতো সিদ্ধান্ত থাকলেও এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রচার না থাকায় অনেক প্রতিবন্ধী ভোটারই তা জানেন না।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনের ক্ষেত্রে 'সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র' বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণা কেবল প্রার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভোটারদের জন্যও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক ভোটাররা যেন তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী উপযোগী পরিবেশে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব।
তিনি বলেন, অনেক দেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য বাড়ি গিয়ে ভোট সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে অন্তত তাদের জন্য নিরাপদ ও বাধাহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচনী ইশতেহার যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ জন্য সব রাজনৈতিক দলকে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নতুন সরকারের প্রতি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি বিশেষায়িত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানান।
সরকারি ভবনগুলোতে প্রবেশগম্যতা বা 'অ্যাক্সেসিবিলিটি'র অভাবকে মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি প্রতীকীভাবে এক সপ্তাহের জন্য লিফট বন্ধ রেখে কর্মকর্তাদের প্রতিবন্ধীদের কষ্ট অনুধাবনের প্রস্তাব দেন।
ডিস্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচের সদস্যসচিব খন্দকার জহুরুল আলম বলেন, "নির্বাচন কমিশন প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য নিচতলায় বুথ, হুইলচেয়ারসহ প্রবেশ এবং দোভাষীর ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না।"
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, প্রচার ও তথ্যের অভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে এখনো নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "আমরা এখনো নিশ্চিত নই যে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারব কিনা। প্রক্রিয়াগত ও অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।"
বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী যুব কর্মী মো. আবদুল্লাহ বলেন, "সহকারী ও দোভাষীর উপস্থিতি থাকলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগ অনেক সহজ হয়। কিন্তু এসব তথ্য না জানার কারণে অনেকেই ভোট দিতে আগ্রহ হারান।"
এ সময় বক্তারা ভবিষ্যতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পোস্টাল ব্যালট চালুর দাবি জানান। তাদের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনা ছাড়া প্রতিবন্ধী মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সাইটসেভার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও বলেন, "নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু নির্বাচনকালেই নয়, নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও সংসদে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।"
বক্তারা আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের গৃহীত সুবিধাগুলো সম্পর্কে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো জরুরি। এতে প্রতিবন্ধী ভোটারদের আস্থা বাড়বে এবং ভোটগ্রহণে অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পাবে।
ডিস্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচের সভাপতি মনসুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, "প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে এখনো অগ্রগতি নেই। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী।"
