প্রচারণা ঘিরে সহিংসতায় ভোটের দিনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, পুলিশের কড়া নজরদারিতে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র
নির্বাচনী প্রচারণা ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটতে থাকায় ভোটের দিনও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচনের দুই সপ্তাহ বাকি থাকলেও প্রচারণার মাঠে ইতোমধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। প্রার্থীদের পারস্পরিক দোষারোপ, অতীতের রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ, নিরাপত্তা ইস্যু এবং প্রকাশ্য হুমকির ভাষা নির্বাচনী পরিবেশকে ক্রমেই অস্বস্তিকর করে তুলছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার প্রথম সাত দিনেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষের অধিকাংশই হয়েছে বিএনপি এবং জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে। এতে একজন নিহত হওয়াসহ অন্তত দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে ১৪৪টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫৫টি।
এছাড়া ভীতি প্রদর্শন ও আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ৬টি এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা ২টি।
পুলিশের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও ঝুঁকিপূর্ণ আসনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ওই প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে ৩০০ আসনেই অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি সব আসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার শঙ্কাও রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, সারাদেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ৮ হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ১৬ হাজার ৫৪৮টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি। এছাড়া ঢাকা মহানগরীর ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৬১৪টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে ২৫ হাজার ৫০০টি বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা এবং ৫০০টি ড্রোন ব্যবহার করা হবে। এছাড়া সারাদেশে মোট ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এর মধ্যে রয়েছেন দেড় লাখ পুলিশ সদস্য, এক লাখের বেশি সেনাসদস্য এবং ৫ লাখ ৭৬ হাজার আনসার সদস্য।
এসব প্রস্তুতির পরও নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ কাটেনি।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিসিটিভি ও বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দুটিই চাহিদার তুলনায় অর্ধেক পাওয়া গেছে।
"এর ওপর পুলিশের মনোবলও এখনো পুরোপুরি ফিরেনি। এমন পরিস্থিতিতে ভোটের দিন বাস্তবে কী হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে," বলেন তিনি।
নির্বাচনের সার্বিক স্থিতিশীলতা নিয়ে রাজনৈতিক নেতারাও প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্টকারীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঢাকা-৯ আসনের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাশিন প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের নিষ্ক্রিয়তা ধীরে ধীরে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, "বিশেষ করে নারীরা টার্গেট হচ্ছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।"
তবে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা সুষ্ঠু থাকবে, তা প্রশাসনের ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, "নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক থাকবে, তা নির্ভর করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর। বর্তমানে নির্বাচন ঘিরে যে দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে, তা তাদের চোখের সামনেই ঘটছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্টকারীদের আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব এসব প্রতিষ্ঠানের।"
"তারা যদি নিষ্ক্রিয় ও ঢিলেঢালা আচরণ করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এবং বুঝতে হবে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা আছে—এটি প্রমাণ করতে হলে তাদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে," যোগ করেন রিজভী।
এদিকে, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসান মাহবুব জোবায়ের দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এখন পর্যন্ত পরিবেশকে অতটা খারাপ বলা যাবে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে বলেই বিশ্বাস করি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রাসী বক্তব্য থেকে বিরত থাকা এই হানাহানি বন্ধের জন্য জরুরি।"
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
তিনি বলেন, "ভোটের দিন যেভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে, তার মহড়া এখন থেকেই দেওয়া প্রয়োজন। এতে নাশকতার পরিকল্পনাকারীদের কাছে বার্তা যাবে যে তারা এসব করে পার পাবে না। একই সঙ্গে বিচার ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। কারণ কাউকে গ্রেপ্তার করার পর যদি সে একদিনেই জামিন পেয়ে যায়, তাহলে এই অরাজকতা বন্ধ হবে না।"
তিনি আরও বলেন, "নির্বাচনের আগে যাদের গ্রেপ্তার করা হবে, তারা যেন নির্বাচনের আগে মুক্তি না পায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।" সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া গেলে একটি গ্রহণযোগ্য ও ভয়হীন নির্বাচন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি বাহারুল আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "প্রতিটি নির্বাচনেই সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে এমন কোনো নির্বাচন হয়নি, যেখানে কেউ মারা যায়নি, যদিও এসব ঘটনা কাম্য নয়।"
নির্বাচনে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়ে পুলিশের আশাবাদ জানতে চাইলে তিনি বলেন, "পুলিশ শুধু আশাবাদী নয়, আত্মবিশ্বাসী। ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। রাজনৈতিক চাপ, ভাঙচুর বা সন্ত্রাসী তৎপরতা—যেকোনো প্রতিকূলতার জন্য পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে।" আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে এসব কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, "সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে যদি ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোট বন্ধও হয়, তবু বাকি ৪২ হাজার কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করা হবে।"
কিছু জায়গায় সমস্যা হতে পারে—এটি মাথায় রেখেই পুলিশ কাজ করছে। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে পুলিশ অত্যন্ত আশাবাদী বলে জানান আইজিপি।
