চাহিদার চেয়ে তিনগুণ বেশি উৎপাদনে সংকটে দেশের ফ্লোট গ্লাস শিল্প
দেশের ফ্লোট গ্লাস বা কাচ শিল্পে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বেড়ে গেছে।
বর্তমানে দেশে মাসে কাচের চাহিদা প্রায় ৩০ হাজার টন, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টনে। এর বিপরীতে বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১০ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। প্রবৃদ্ধির আশায় উৎপাদন বাড়ানো হলেও এখন তা বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে উদ্যোক্তাদের।
২০১৮-১৯ সালে যখন দৈনিক চাহিদা ১ হাজার টনের বেশি ছিল এবং ২০২৫ সালের মধ্যে তা দ্বিগুণ হওয়ার পূর্বাভাস ছিল, তখনই অধিকাংশ বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। দ্রুত নগরায়ণ, আবাসন খাতের প্রবৃদ্ধি এবং মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো এই প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
তবে কোভিড-১৯ মহামারি এবং পরবর্তী বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা সেই সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দেয়। চাহিদা থমকে গেছে, কিছু ক্ষেত্রে কমেও গেছে। ফলে কারখানাগুলো সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করছে এবং মুনাফা কমে যাচ্ছে।
নির্মাণ খাতের ধীরগতি, বৈশ্বিক মন্দা এবং আমদানিকৃত কাচের আগ্রাসী বাজারজাতকরণের (ডাম্পিং) কারণে আকিজবশির গ্রুপ ও নাসির গ্রুপের মতো বড় উৎপাদকেরা আর্থিক চাপে পড়েছে। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ এই খাতে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করায় নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বাজার এই বাড়তি সক্ষমতা নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ গ্লাস মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হোসেন আলমগীর জানান, অর্থনৈতিক ধীরগতি, আবাসন ও মেগা প্রকল্পের কাজ কমে যাওয়া এবং দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগের কারণে কাচের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
তিনি বলেন, 'স্থানীয় উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, কিন্তু নির্মাণ খাত নিজেই তার গতি হারিয়েছে।'
উৎপাদন কমানোর সুযোগ নেই
দুই দশক আগেও বাংলাদেশের কাচের চাহিদার ৮০-৯০ শতাংশ আমদানি করতে হতো। সে সময় নির্মাণ খাতের রমরমা অবস্থায় স্থানীয় উৎপাদন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি উল্টে গেছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা তলানিতে।
আকিজবশির গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার খোরশেদ আলম বলেন, ফ্লোট গ্লাস শিল্পের একটি মৌলিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হলো মন্দার সময়েও উৎপাদন কমানোর সুযোগ না থাকা।
তিনি বলেন, 'একবার ফার্নেস বা চুল্লি চালু হলে তা টানা ১০ থেকে ১২ বছর চালু রাখতে হয়। উৎপাদন বন্ধ করলে ফার্নেস নষ্ট হয়ে যায়, যাতে শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়।'
ফলে চাহিদা কম থাকলেও কারখানাগুলো উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। অনেক সময় ফার্নেস সচল রাখতে লোকসানে পণ্য বিক্রি করতে হয়, এমনকি অবিক্রীত কাচ ধ্বংসও করতে হয়।
খোরশেদ আলম আরও বলেন, 'এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই কারখানা তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই হারে চাহিদা বাড়েনি।'
চাপে আকিজবশিরের ২,২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ
দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভরসা করে ২০২৪ সালে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ফ্লোট গ্লাস খাতে প্রবেশ করে আকিজবশির। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই এই বিনিয়োগ বড় আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।
কোম্পানির কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে ২০১৮-১৯ সালের অনুমানগুলো এখন আর কাজ করছে না। আবাসন খাতের স্থবিরতা এবং অবকাঠামো ব্যয় কমে যাওয়ায় চাহিদা তীব্রভাবে কমেছে।
বর্তমানে মোট দৈনিক কাচের চাহিদা আনুমানিক ১ হাজার টন। একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি একাই প্রায় ৬০০ টন সরবরাহ করে, যেখানে আকিজবশিরের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার টন।
খোরশেদ আলম বলেন, 'এই বিপুল সক্ষমতা শুষে নেওয়ার মতো বড় বাজার নেই। প্রতিযোগিতা বেড়েছে, দাম কমেছে এবং কোম্পানিগুলো ক্রমাগত লোকসান দিচ্ছে।'
বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ২০২০ সাল থেকে টাকার অবমূল্যায়ন এবং নির্মাণ খরচ বেড়ে যাওয়া বিনিয়োগের যৌক্তিকতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, কারখানা নির্মাণের খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ছোট বাজারে বাড়ছে বিনিয়োগ
বাজারের এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মেঘনা গ্রুপ ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ নিয়ে ফ্লোট গ্লাস খাতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. হাসান বলেন, কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, 'দ্রুত নগরায়ণ এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।'
তিনি আরও জানান, মেঘনা তাদের বিস্তৃত নির্মাণ ব্যবসা ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে গুণমান, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং রপ্তানি সুযোগের ওপর জোর দেবে।
২০০৫ সালে উৎপাদন শুরু করা নাসির গ্রুপ, যাদের দুটি বড় ইউনিটের দৈনিক সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার টন, তারাও আরও ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা ভাবছে। পিএইচপি ও এবি গ্লাস তাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এছাড়া বগুড়াভিত্তিক এবি গ্লাস প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৫০-৫০০ টন সক্ষমতার একটি নতুন ইউনিট প্রস্তুত করছে।
স্থানীয় চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে 'ডাম্পিং'
স্থানীয় উৎপাদকদের অভিযোগ, বিশেষ করে চীন ও ভারত থেকে আসা পণ্যের 'ডাম্পিং' (উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে রপ্তানি) অভ্যন্তরীণ চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নাসির গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের হেড অব বিজনেস মশিউর রহমান বলেন, কম দামের আমদানিকৃত পণ্য বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে ব্যবহৃত কাচের প্রায় ২০ শতাংশ এখনো চীন ও ভারত থেকে আসে।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তারা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে।' ভারত চীনা কাচের বিরুদ্ধে কঠোর অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা নিলেও বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামো এবং এর প্রয়োগ এখনো অপর্যাপ্ত।
মশিউর রহমান বলেন, 'কার্যকর অ্যান্টি-ডাম্পিং পদক্ষেপ ছাড়া দেশীয় উৎপাদকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।'
টিকে থাকার লড়াই ও নীতি সহায়তা
দাম কমে যাওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উৎপাদকেরা এখন বিশেষায়িত ও ভ্যালু-অ্যাডেড (মূল্য সংযোজিত) গ্লাস পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন।
খাতসংশ্লিষ্ট একজন জানান, 'এটিই হয়তো টিকে থাকার একমাত্র পথ। সাধারণ ফ্লোট গ্লাস এখন অধিক পরিমাণ কিন্তু স্বল্প মুনাফার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।' তবে তিনি সতর্ক করেন, শুধুমাত্র বৈচিত্র্য দিয়ে সক্ষমতা ও চাহিদার এই বিশাল পার্থক্য দূর করা সম্ভব নয়।
উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলছেন, শক্তিশালী নীতি সহায়তা ছাড়া এই শিল্পের সংকট আরও গভীর হতে পারে। তারা গ্যাস সরবরাহে সীমাবদ্ধতা, উচ্চ জ্বালানি খরচ, কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক এবং নীতির অসামঞ্জস্যতাকে দায়ী করছেন।
একজন নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, 'স্থানীয় সক্ষমতা ও গুণমান সবই আছে, কিন্তু নীতিমালার ঘাটতি দেশীয় উৎপাদকদের দুর্বল করে দিচ্ছে।'
খাতসংশ্লিষ্টরা কার্যকর অ্যান্টি-ডাম্পিং প্রয়োগ, শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, রপ্তানি প্রণোদনা এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাচের ব্যবহার বাড়াতে সহায়ক নীতিমালার দাবি জানিয়েছেন।
