নির্বাচনি প্রচারণা ঘিরে সংঘাত-সহিংসতা; ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বাড়তি নজর পুলিশের
দুই সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দেশজুড়ে চলছে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা। এর মধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যে ঘটছে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা।
এমন পরিস্থিতিতে ভোটের দিনও আইনশৃঙ্খলার অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরের ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো সক্রিয় করার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীদারদের নিয়ে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেওয়া সম্ভব।
প্রচারণার শুরুর এক সপ্তাহে ২৫ সংঘাত, নিহত ১
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণার প্রথম সাত দিনেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। যার অধিকাংশই হয়েছে বিএনপি এবং জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে। এসব সংঘর্ষে একজন নিহতসহ আহত হয়েছেন অন্তত দুই শতাধিক নেতা-কর্মী।
সর্বশেষ বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বিকেলে শেরপুরের ঝিনাইগাতী স্টেডিয়ামে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এতে দুই পক্ষের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক আহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন মাওলানা রেজাউল করিম নামের জামায়াতের এক নেতা।
রাজধানীতেই প্রচরণা চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দুই নেতা। তাদের একজন ঢাকা-৮ আসনের ১১–দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও অন্যজন ঢাকা-১৮ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীব।
শুধু নির্বাচনি প্রচারণায় নয়, এর আগেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সেসব ঘটনায় আহত হওয়ার পাশাপাশি অনেকে নিহতও হয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন বলা হয়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তত ৫৪টি সহিংসতার ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪৯৪ জন এবং নিহত হয়েছেন ৩ জন।
সংগঠনটি আরও জানায়, প্রচারণা শুরুর আগে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩টি নির্বাচনি সংঘাতের ঘটনায় ১০৩ জন আহত এবং একজন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ১৪৪টি নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫৫টি।
এছাড়া ভীতি দেখানো এবং আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ছয়টি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে দুইটি। তাছাড়া হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে ছয়টি, প্রচারকাজে বাধা প্রদানের ঘটনা ঘটেছে ১৭টি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ৮টি, অবরোধ-বিক্ষোভের মতো ঘটনা ১০টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে একটি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ২৪টি।
এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিসহ ৪ জন।
সারাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ২৫ হাজারের বেশি, ঢাকায় ১ হাজার ৬১৪
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে সারাদেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ৮ হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ১৬ হাজার ৫৪৮টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি।
এছাড়া ঢাকা মহানগরীর ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৬১৪টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পুলিশের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও ঝুঁকিপূর্ণ আসনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। যা ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
সেই প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে ৩০০ আসনেই অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা রয়েছে। সবগুলো আসনে এআই প্রযুক্তিসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে পারে ফ্যাসিবাদী শক্তি ও তাদের দোসররা।
এছাড়া, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী শীর্ষ দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও একাধিক প্রার্থীর কারণে ১৪৪ আসনে দলীয় বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে চরম রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে ৬৫ আসন এবং দলীয় একাধিক প্রার্থীর কারণে ৭৯ আসনে সংঘাত-সহিংসতা ঘটতে পারে।
এছাড়া ২৬ আসনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। চরমপন্থী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় থাকায় ১০টি আসন, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সংক্রান্ত ৫৫টি আসন, চরমপন্থী ও পার্বত্য সশস্ত্র গোষ্ঠী সংক্রান্তে ১৩টি আসন, ভৌগলিক কারণে ৩৩টি আসন এবং সংখ্যালঘু নিপীড়ন ইস্যুতে ২৭টি আসন ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনগুলোতে যেসব আসনে আওয়ামী লীগ সব সময়ই জয়লাভ করেছে, সেসব আসনে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হতে পারে।
আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থানের কারণে ঝুঁকিতে থাকা আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাগেরহাট-১ ও ৩, খুলনা-১, বরগুনা-১ ও ২, পটুয়াখালী-২ ও ৪, টাঙ্গাইল-১, জামালপুর-৩, ময়মনসিংহ-১০, গাজীপুর-১, ফরিদপুর-১, ৩ ও ৪, গোপালগঞ্জ-১,২ ও ৩, মাদারীপুর-১,২ ও ৩, শরীয়তপুর-১,২ ও ৩, সুনামগঞ্জ-২ ও ৩, মৌলভীবাজার- ৪, হবিগঞ্জ- ২ ও ৪।
ভার্চুয়াল মাধ্যমের অপব্যবহার ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধ করা গেলে মাত্র ১০৯টি আসনে নির্বাচনি সহিংসতা ঠেকানো যেতে পারে বলে ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে যে গণসহিংসতা, রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তঃকোন্দল, দখল-বেদখল ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। এখনও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
গত বছরের গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বিএনপির দলীয় কোন্দলে নিহত হন ৯০ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৯৭০ জন । বিএনপির সঙ্গে অন্য দলের কোন্দলে নিহত হয়েছেন ২১ জন এবং আহত হয়েছেন ৪৩১ জন।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বাড়তি নজর পুলিশের
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনসহ বডি ওর্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি, ড্রোন, ডগ স্কয়াড ব্যবহার করা হবে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন সদস্য মাঠে থাকবে। এর মধ্যে পুলিশ সদস্য থাকবে দেড় লাখ। এছাড়া সেনাবাহিনীর এক লাখের বেশি, নৌবাহিনীর পাঁচ হাজারের বেশি ও বিমানবাহিনীর সাড়ে ৩ হাজারের বেশি বেশি এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার সদস্য থাকবেন।
এদের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজারের বেশি, কোস্ট গার্ডের সাড়ে ৩ হাজারের বেশি, র্যাবের সাড়ে ৭ হাজারের বেশি এবং ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ২৫ হাজার ৫০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ৫০০ ড্রোন ব্যবহার করা হবে।যদিও শুরুতে ৪০ হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। পরে তা কমিয়ে আনা হয়।
আবার ২৫ হাজার ৫০০টি বডি ওর্ন ক্যামেরার মধ্যে মাত্র ১৫ হাজার ক্যামেরায় সরাসরি ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাইভ স্ট্রিমিং করা যাবে। বাকি প্রায় ১০ হাজার ক্যামেরা থাকবে অফলাইন। এসব ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও পরে প্রয়োজনে যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে আরও জানা যায়, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও শরীয়তপুরে সবচেয়ে বেশি বডি ক্যামেরা ব্যবহার হবে। কারণ এই চার জেলায় ভোটারদের কেন্দ্রে আসা ঠেকাতে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানোর আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।
এছাড়া ঢাকা রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়ায় সেসব জায়াগার ভোটকেন্দ্রর নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তারপরও ভোটের দিন নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
নির্বাচনে নিরাপত্তা দিতে সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হলেও এখনো শঙ্কা কাটেনি। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- বলেন, 'নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিসিটিভি ও বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দুটোই চাহিদার তুলনায় অর্ধেক পাওয়া গেছে। তার ওপর পুলিশের মনোবল এখনও ঠিকভাবে ফেরেনি।'
এমন পরিস্থিতিতে ভোটের দিন আদৌ কি হবে তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
রাজনৈতিক নেতারা যা বলছেন
ঢাকা-১৮ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীব দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- বলেন, 'এনসিপির নেতাদের প্রচারণায় হামলার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এই হামলাগুলোর মাধ্যমে একটি দল ভোটের দিন কেন্দ্র দখল, প্রভাব বিস্তারের বার্তা দিচ্ছে। তাদের চাপে প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আগেই একদিকে হেলে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে বিএনপির এই ধরনের হামলার প্রবণতা আরও বাড়বে।'
তিনি আরও বলেন, 'বিএনপির নিজেদের ভেতরেও অর্ন্তকোন্দল আছে। যার কারণে এক পক্ষ চুপচাপ থাকলেও, আরেক পক্ষ নির্বাচনি পরিবেশ অশান্ত করতে হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে। নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করাই এখন বিএনপির একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদি প্রশাসন এক পাক্ষিক না হয়, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার বিষয়ে আমরা আশাবাদী। তবে কিছু কিছু কেন্দ্র বিএনপি প্রভাব খাটিয়ে দখল করতে পারে সেই শঙ্কাও রয়েছে।'
তবে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা সুষ্ঠু হবে তা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- বলেন, 'নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক থাকবে এটা নির্ভর করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর।'
তিনি বলেন, 'বর্তমানে নির্বাচন ঘিরে যে দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে, এটা তাদের চোখের সামনেই ঘটছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্টকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানগুলোর। তারা যদি নিষ্ক্রিয় এবং ঢিলেঢালা আচরণ করে, তাহলে এটা বাড়তে থাকবে এবং বুঝতে হবে সরকারের সদিচ্ছা নেই। সরকারের সদিচ্ছা আছে, এটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।'
শেরপুরের ঘটনাটিকে দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, 'সেখানে একটি প্রতিপক্ষ সংগঠন যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছে, প্রশাসনের বলার পরও তারা জোর করে পায়ে পাড়া দিয়ে গোলমাল লাগানোর জন্য এই কাজগুলো করেছে। বিভিন্ন জায়গায় ওই সংগঠন এসব কাজ করে যাচ্ছে।'
এই বিএনপি নেতা বলেন, 'সুতরাং, এগুলো চিহ্নিত করে প্রশাসন যদি আগেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতো, তাহলে এই বাড়টা তারা বাড়তে পারতো না। এখন তাদেরই দায়িত্ব যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা।'
যা বলছেন আইজিপি
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি বাহারুল আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- বলেন, 'প্রতিটি নির্বাচনেই সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে এমন কোনো নির্বাচন হয়নি, যেখানে কেউ মারা যায়নি। যদিও এগুলো আমাদের কাম্য নয়।'
নির্বাচনে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়ে পুলিশ কতটা আশাবাদী জানতে চাইলে জবাবে তিনি বলেন, 'আমরা শুধু আশাবাদী নই, আমরা আত্মবিশ্বাসী। নির্বাচনে ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। আমরা যেকোনো ধরনের প্রতিকূলতার জন্য প্রস্তুত। এটা রাজনৈতিক চাপ হোক, ভাঙচুর হোক, মাস্তানি হোক, আমরা আমাদের লিগ্যাল টুলস দিয়ে এগুলো গুঁড়িয়ে দিবো। আমরা এজন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।'
তিনি আরও বলেন, 'সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্র। এর মধ্যে যদি ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোট বন্ধ হয় তো হোক, আমরা ৪২ হাজার কেন্দ্রে ভোট করে ফেলবো। তারপরও নির্বাচন ঠেকানো যাবে না। কিছু জায়গায় ঝামেলা হবে এটি আমরা মাথায় নিয়েই কাজ করছি। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে খুবই আশাবাদী।'
কি বলছে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- বলেন, 'নির্বাচন-পূর্ব এক ধরনের ঝুঁকি এবং নির্বাচনের দিন আরেক ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। নির্বাচনের আগের ঝুঁকিটা নির্বাচনের দিনের ঝুঁকিকে আরও বেশি বাড়িয়ে তোলে। তবে নির্বাচনের আগে আমরা যে সহিংসতা বা নাশকতামূলক কাজগুলো আমরা দেখি, সবগুলোই যে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত তা নয়।'
তিনি বলেন, 'অনেকে এই সুযোগে ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজ করে। তার মানে যে নিরাপত্তার ঝুঁকি আমরা দেখছি, এটি কেবল নির্বাচন কেন্দ্রিক নয়। এর সঙ্গে সমাজ ও অর্থনীতির অনেক সংযোগ আছে। এটিকে নিরসন করতে হলে সমাজকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'এজন্য প্রতিটি স্তরে একটি কমিটি করা যায়। যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দলসহ সব ধরনের অংশীদারদের রাখতে হবে। তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি পক্ষে কাজ করছে এটা বলার সুযোগ থাকবে না।'
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, 'ভোটের দিন তারা যেভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করছে, সেটি এখন থেকে মহড়া দেওয়া দরকার। এতে নাশকতার পরিকল্পনাকারীদের কাছে বার্তা যাবে, তারা এটি করে পার পাবে না। এছাড়া এর সঙ্গে বিচার ব্যবস্থাকে যুক্ত করতে হবে। কারণ একজন অপরাধীকে কষ্ট করে গ্রেপ্তারের পর সে যদি একদিন পর জামিন পেয়ে যায়, তাহলে এই অরাজকতা বন্ধ হবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'নির্বাচনের আগে যেসব সন্ত্রাসীকে ধরা হবে, তারা যেনো নির্বাচনের আগে ছাড়া না পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে, আমার ধারণা, একটি গ্রহণযোগ্য ও ভয়হীন নির্বাচন দেওয়া যাবে।'
