ঝুঁকি মোকাবিলায় আরবিএস ড্যাশবোর্ড চালু করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
দেশের ব্যাংকিং খাতে তদারকি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় আনুষ্ঠানিকভাবে রিস্ক–বেসড সুপারভিশন (আরবিএস) ড্যাশবোর্ড চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল রোববার (৪ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এই আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত তদারকি ব্যবস্থার উদ্বোধন করেন। এ সময় ডেপুটি গভর্নররা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টিভিএসকে বলেন, "দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল আরবিএস-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করা। এখন মূল কাজ হলো আরবিএস-এর নির্ধারিত ফর্মুলা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা।"
তিনি বলেন, "এর আগে আমরা দুইভাবে ব্যাংকগুলো মনিটরিং করতাম। একটি ছিল অনসাইট সুপারভিশন—নির্দিষ্ট সময় পরপর ব্যাংকে গিয়ে তদারকি করা। অন্যটি ছিল অফিসে বসে অফসাইট সুপারভিশন। এখন থেকে তদারকি হবে রিস্ক–বেসড। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নির্দিষ্ট ফরম্যাটে আগেই আমাদের কাছে পাঠাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এরপর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।"
তিনি আরও বলেন, "এক্ষেত্রে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একটি হলো তথ্যের নির্ভুলতা, অন্যটি সময়ানুবর্তিতা। কোনো ব্যাংকে সমস্যা দেখা দিলে যদি তারা যথাযথ তথ্য প্রকাশ না করে, তাহলে সেটি সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।"
ভারতের অভিজ্ঞতা
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) ২০০৩ সালে পরীক্ষামূলকভাবে আরবিএস ব্যবস্থা চালু করে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে এটি আরও পরিকল্পিতভাবে বড় ৩০টি ব্যাংকে সম্প্রসারণ করা হয়।
আরবিএস পুরোপুরি বন্ধ না হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। তবে ২০২০ সালে করোনা মহামারির পর ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি বাড়তে থাকায় আরবিআই এই ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে 'অ্যাডভান্সড সুপারভাইজরি মনিটরিং সিস্টেম' বা 'দক্ষ' (DAKSH) নামে একটি ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়, যা আরবিএস ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করে তোলে।
দেশে আরবিএসের শুরুটা কেমন হবে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর তথ্যভিত্তিক তদারকি আরও নির্ভুল ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। ইতোমধ্যে এ পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিভাগীয় কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি কেবল ঘটনার পর তদারকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি বলেন, "আগে কোনো অনিয়ম ঘটার পর পরিদর্শন করা হতো। আরবিএস পদ্ধতিতে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। যেমন, কোনো বড় ঋণ অনুমোদনের আগেই সেই ঋণের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা যাবে।"
সমন্বিত ড্যাশবোর্ড
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক বলেন, "আরবিএস মূলত একটি তথ্যনির্ভর ব্যবস্থা। তদারকি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট 'সুপারভিশন ম্যাট্রিক্স' তৈরি করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইন্সপেক্টররা বিভিন্ন বিষয় যাচাই করবেন। তথ্যের সঠিকতা ও বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করেই ব্যাংকের ঝুঁকির মানদণ্ড নির্ধারিত হবে।"
তিনি আরও বলেন, "এর আগে টেমপ্লেট বা গুগল ড্রাইভের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হতো, যা ছিল অনিরাপদ ও ধীরগতির। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক একটি পূর্ণাঙ্গ ড্যাশবোর্ড তৈরি করেছে। প্রতিটি ব্যাংককে নির্দিষ্ট লগইন আইডি ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হবে। ব্যাংকগুলো সরাসরি তাদের নিজস্ব ড্যাশবোর্ডে তথ্য আপলোড করবে। এই পদ্ধতিটি অনেকটা আইএমএস বা ওআইইএমএস সিস্টেমের আদলে কাজ করবে।"
১২টি বিভাগ ও বিশেষায়িত টিম
আরবিএস কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে ১২টি ব্যাংকিং সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট (বিএসডি) গঠন করা হয়েছে। ৩ নম্বর সার্কুলার (এসটিসিটি)-এর আওতাভুক্ত ব্যাংকগুলোর জন্য আলাদা আলাদা ব্যাংকভিত্তিক টিম কাজ করবে। প্রতিটি টিমের নেতৃত্বে থাকবেন একজন লিড সুপারভাইজার, যিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিদর্শন ও তদারকি কার্যক্রম সরাসরি দেখভাল করবেন।
তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর জন্য কঠোর সময়সীমা ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়েছে। তথ্য সাপ্তাহিক ও মাসিক—এই দুই ভিত্তিতে হালনাগাদ করতে হবে। প্রতিটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এমডি বা ডিএমডি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা 'ফোকাল পয়েন্ট' হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রধান কার্যালয় থেকে অনুমোদিত ও ভেরিফায়েড তথ্যই কেবল বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে নিয়মিত তথ্য ফলোআপ করা হবে। কোনো তথ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে তাৎক্ষণিকভাবে স্পেশাল ইন্সপেকশনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ডিজিটাল রূপান্তর ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমাতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নেপথ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা
বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এই কর্মসূচির অন্যতম শর্ত হলো ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা।
আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা বাধ্যতামূলক ছিল।
এছাড়া বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়াতে 'ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট'-এর মাধ্যমে কাজ করছে। আরবিএস বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং আইটি অবকাঠামো ও ড্যাশবোর্ড তৈরিতে বিশ্বব্যাংক কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়ন দিয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা
দেশে আরবিএস চালুর প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ব্যাংকগুলোর তথ্য গোপনের সংস্কৃতিকে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সঠিক তথ্য গোপন করে বা তথ্য ম্যানিপুলেট করে, যা এই ডেটানির্ভর ব্যবস্থার বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া ডেটা বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি নিরূপণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতার ঘাটতিও একটি চ্যালেঞ্জ।
পাশাপাশি আইটি অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ঝুঁকি সঠিকভাবে চিহ্নিত হলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে।
