বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ঈদ উদযাপনে মানুষের ঢল
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘরে দুপুর তিনটার দিকে মো. হুমায়ুন কবির তার পরিবারের আট সদস্যকে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন। সকালে তারা চিড়িয়াখানা ঘুরে এসেছেন, এরপর জাদুঘরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। আগের ঈদগুলো গ্রামে কাটালেও এবার অফিসের ব্যস্ততার কারণে ঢাকায় থাকতে হয়েছে তাদের।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'গ্রামের ঈদের চেয়ে ঢাকার ঈদের পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন। তবে এবারের ঈদ অনেক বেশি নিরাপদ মনে হচ্ছে। বাচ্চারা চিড়িয়াখানায় গিয়ে বেশ আনন্দ করেছে। নানা প্রজাতির পশু-পাখি দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছে। এখন বিমানে চড়ার বায়না ধরায় বিমান বাহিনী জাদুঘরে নিয়ে এসেছি।'

তার সঙ্গে থাকা দশ বছরের সাফিন বলেন, 'আমরা অনেক ঘুরেছি, আরও ঘুরব। চিড়িয়াখানায় হাতি, হরিণ দেখে খুব ভালো লেগেছে। বাবা রাতে আমাদের মজাদার খাবার খাওয়াবেন। ঢাকার ঈদই আমার সবচেয়ে পছন্দের।'
এবারের ঈদুল ফিতরে নয় দিনের দীর্ঘ ছুটি পেয়েছে মানুষ। এই সুযোগে কেউ বেড়াতে গেছেন দূর-দূরান্তে, কেউ রাজধানী ও আশপাশের বিনোদনকেন্দ্রে পরিবার নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি তাদের জন্য স্বস্তির খবর।
বিভিন্ন পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারের ঈদে দর্শনার্থীর চাপ অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি। ঈদ উপলক্ষে তারা নানা ছাড় ও নতুন রাইড, গেম এবং প্যাকেজ চালু করেছে।
করোনাকালে বিনোদন খাতের ব্যবসা একপ্রকার স্থবির হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে গিয়েছিল। তবে এবার পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘরের কাউন্টার ম্যানেজার মো. জাকারিয়া হোসেন বলেন, 'ঈদের দিনে প্রায় ২৫ হাজার দর্শনার্থী এসেছিল। বিকেলে ভিড় আরও বেড়েছিল। এবারের ঈদে দর্শনার্থীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেশি।'
তিনি জানান, জাদুঘরে ২৫টির মতো রাইড রয়েছে, আর প্রবেশমূল্য মাত্র ৫০ টাকা।
ঈদের দ্বিতীয় দিনে শ্যামলীর ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ড শিশু পার্কে দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়। পার্কটিতে প্রবেশমূল্য ১০০ টাকা, আর ভেতরে রয়েছে প্রায় ৫০টি রাইড। প্রবেশের পরই শোনা যায়, 'আমাদের দেশটি স্বপ্নপুরী, সাথী মোদের ফুলপরি...' গানটি, আর চক্রাকার রাইডে শিশুদের উচ্ছ্বাস।
মোহাম্মদপুর থেকে আসা হুমায়রা বেগম তার তিন সন্তান ও পরিবারের অন্যদের নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, 'ঢাকায় বিনোদন কেন্দ্র বলতে কয়েকটি শিশু পার্কই। যেহেতু ঈদ ঢাকায় কাটছে, তাই বাচ্চাদের নিয়ে বের হয়েছি। ওরা সবাই বেশ উপভোগ করছে। সন্ধ্যার পর সিনেপ্লেক্সে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে, এরপর সবাই মিলে বাইরে খাবো—এটাই আমাদের ঈদ উদযাপন।'

পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে আসা লাকি আক্তার বলেন, 'আমি নাগরদোলা ও ঘোড়ায় চড়েছি। নাগরদোলায় একটু ভয় পেয়েছি, তবে খুব মজা লেগেছে। আজ আরও ঘুরবো।'
ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ডের ম্যানেজার মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, 'এই পার্কে আগের মতো জৌলুস না থাকলেও এবারের ঈদে দর্শনার্থীর উপস্থিতি ভালো। ঈদের দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিনে আরও বেশি মানুষ এসেছে।'
শুধু রাজধানী নয়, আশপাশের বিনোদন কেন্দ্রগুলোরও একই চিত্র। আশুলিয়ার জামগড়ায় ফ্যান্টাসি কিংডমে দ্বিতীয় দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বেড়েছে।
ফ্যান্টাসি কিংডম কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা ঈদ উপলক্ষে তিনটি নতুন রাইড চালু করেছে—ড্রপ অ্যান্ড টুইস্ট রাইড, টপ স্পিন রাইড ও ভিআর ৩৬০ রাইড। ছোটদের জন্যও নতুন রাইড রয়েছে।
পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে ইনডোর থিম পার্ক টগি ওয়ার্ল্ড ছোটদের জন্য নানা ধরনের বিনোদন সুবিধা দিচ্ছে। এখানে ১৫০টির বেশি রাইড ও গেম রয়েছে।
ঢাকার অদূরে সাভারে অবস্থিত নন্দন পার্ক বৃহত্তম বিনোদনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে একটি। নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের পাশে থাকা এ পার্কে ৫০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন প্যাকেজ রয়েছে। ওয়াটার ওয়ার্ল্ডসহ বিভিন্ন রাইড আলাদা টিকিটের মাধ্যমে উপভোগ করা যায়।
ইনডোর বিনোদনের আরেক জনপ্রিয় জায়গা বাবুল্যান্ড। এখানে কার সিটি, ট্রাম্পোলিন, বল পুলসহ বিভিন্ন রাইড রয়েছে। বাবুল্যান্ডের প্লে-গ্রাউন্ডে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে। মাত্র ৪০০-৫০০ টাকায় দুই ঘণ্টা খেলার সুযোগ মেলে।
রাজধানীর মিরপুর-২, মিরপুর-১২, ধানমন্ডি, গ্রিনরোড, বাড্ডা, ওয়ারী, উত্তরা, লক্ষ্মীবাজার, শেওড়াপাড়া এবং নারায়ণগঞ্জে বাবুল্যান্ডের শাখা রয়েছে।
বিনোদন কেন্দ্রগুলোর ভিড় প্রমাণ করে এবারের ঈদ সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্যও স্বস্তি নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ ছুটির ফলে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বিনোদনে সময় কাটাতে পেরেছে, যা অর্থনীতির এ খাতকেও চাঙ্গা করেছে।