১৫ অক্টোবর থেকে আমানত ফেরত দেওয়া শুরু করবে ন্যাশনাল ব্যাংক; তারল্য সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক
আগামী ১১ অক্টোবর থেকে বড় অংকের আমানতকারীদের কাছ থেকে আবেদন গরহন শুরু করবে ন্যাশনাল ব্যাংক। ১৫ অক্টোবর থেকে আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়াসহ পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম ফের শুরু করবে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, মো. কবির আহমদ, মো. সরোয়ার হোসেন ও মো. আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি এবং আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন গভর্নর।
আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখা এবং ব্যাংকের কার্যক্রম সুশৃঙ্খল রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের সব শাখায় সব ধরনের সেবা চালু করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুরুতে ৩ হাজার কোটি টাকার সহায়তা নিয়ে প্রস্তুত থাকবে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই সহায়তা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এই সহায়তা বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে নেওয়া হবে, তবে এর গ্যারান্টর হবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গ্রাহকদের এখনো আস্থা রয়েছে: চেয়ারম্যান
ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেলিতা মেহজাবীন টিবিএসকে বলেন, 'আমরা আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে সব সেবা চালু করব। আমরা সব ব্রাঞ্চে, এটিএম বুথে পর্যাপ্ত তারল্য রেখে প্রস্তুত থাকব, যাতে কোনো গ্রাহক খালি হাতে না ফিরে যান। এজন্য আমরা ১১ অক্টোবর থেকে হাই-ভ্যালু ডিপোজিটরদের [বড় অঙ্কের আমানতকারী] আবেদন নেব।'
তিনি আরও বলেন, অনিয়ম ও সুশাসন ব্যবস্থায় দুর্বলতার কারণে দীর্ঘদিন যাবত ন্যাশনাল ব্যাংক পুরোদমে ব্যবসা করতে পারেনি।
'এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটিকে পুরোপুরি ব্যবসা করার সুযোগ দিয়েছে। গ্রাহকরা সব ধরনের এলসি [ঋণপত্র] খুলতে পারবেন। গ্রাহকরা চেক দিয়ে, আরটিজিএস কিংবা এনপিএসবি—সব ধরনের সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের টাকা নিতে পারবেন,' বলেন তিনি।
মেলিতা মেহজাবীন বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংক দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক। এই ব্যাংকের এক সময়ে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত ছিল।
'গ্রাহকের আস্থা রয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে যখন গ্রাহকরা দেখবেন সব ধরনের সেবা পাচ্ছেন, তখন তারা নতুন করে এখানে আমানত রাখবেন বলে আশা করছি,' বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের ২২১টি শাখা ও ৫৩টি এটিএম বুথ গ্রাহকের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকবে। ব্রাঞ্চগুলোতে গ্রাহকরা পূর্বের ন্যায় সব ধরনের সার্ভিস গ্রহণ করতে পারবেন।'
ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক জানান, ১৫ অক্টোবর থেকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে সব শাখা ও এটিএম বুথে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
'প্রয়োজনে সহায়তা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক'
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানকে ডেকে পাঠিয়ে গ্রাহকরা যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে সহযোগিতার প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বাত্মক সহায়তা দেবে। ব্যাংকে গচ্ছিত সঞ্চয় ফেরত পাওয়ার দাবিতে গত মাসে চারজন আমানতকারী হাইকোর্টের শরণাপন্ন হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত এল।
দেশের অন্যতম পুরোনো এই বেসরকারি ব্যাংকটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র তারল্য সংকট ও ব্যাপক খেলাপি ঋণের সঙ্গে লড়াই করছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা পেয়ে আসছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক পেয়েছে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা।
যেভাবে সংকটে পড়ল ন্যাশনাল ব্যাংক
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দীর্ঘদিন ধরে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পর শিকদার গ্রুপ এই ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। এখন ব্যাংকটির পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন মাল্টিমোড গ্রুপ, হোসাফ গ্রুপ ও আর্মানা গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা।
তবে আগের অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে ব্যাংকটি এখনো সংকটে ভুগছে। যেমন খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, টানা লোকসান ও টাকা তুলতে গ্রাহকদের সমস্যা হচ্ছে ব্যাংকটিতে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বারবার তারল্য সহায়তা দেওয়ার পরও ব্যাংকটি পুরোপুরি স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারেনি।
২০২২ সাল থেকে প্রতি বছর লোকসান গুনছে ন্যাশনাল ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির বিতরণকৃত মোট ঋণের ৫৬.৪৪ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি, যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি আছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ব্যাংকটি প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা লোকসান করেছে। সর্বশেষ অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির লোকসান ছিল ২ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয় ৭.১০ টাকা। ২০২৫ সালের একই এ সময়ে লোকসান ছিল শেয়ারপ্রতি ৩.৬ টাকা; টাকার অঙ্কে ৯৮৫ কোটি টাকা।
