বেসরকারি খাত কেন বিদেশি ঋণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে
২০২২ সালের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ২৩ শতাংশেরও বেশি কমে প্রায় ১৯.৯৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বৈশ্বিক চড়া সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্পমেয়াদি ডলারের দায় দ্রুত পরিশোধ করছে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতাও কমাচ্ছে।
এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান স্বল্পমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে। এর মধ্যে রয়েছে বায়ারস ক্রেডিট, বিলম্বিত আমদানি বিল পরিশোধ ও অন্যান্য বাণিজ্য সুবিধাসহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে এই ঋণ ৪২.৪৮ শতাংশ কমে ১০.২১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
এই ব্যাপক পতন ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোনো ঋণের মেয়াদ না বাড়িয়ে (রোল ওভার) বিদেশি দায় পরিশোধের দিকে বেশি ঝুঁকছে। পাশাপাশি আমদানি ব্যয় ও চলতি মূলধনের জোগান দিতে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের ওপর তাদের নির্ভরতা কমছে।
একই সময়ে বেসরকারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালের শুরুতে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৪.৯২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯.৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, হঠাৎ করে পুনঃঅর্থায়ন ও মেয়াদ বাড়ানোর চাপ এড়াতে তারা অস্থিতিশীল ও স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের বিকল্প খুঁজছেন। তারা এখন কাঠামোবদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা নেওয়ার দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
মেঘনা গ্রুপ অভ ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, 'বিদেশি ঋণ অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এর সুদহার এখন ৭ থেকে ৮ শতাংশের ঘরে।' তার প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে।
এমজিআই চলতি মূলধনের সুবিধাসহ স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ নিয়েছে। এর পাশাপাশি ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ঋণও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মোস্তফা কামাল টিবিএসকে বলেন, 'আমাদের এখনো বিদেশি ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। তবে ২০২০-২১ সালের তুলনায় এটি এখন অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।'
বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের সুদহার নির্ধারিত হয় আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক সোফর-এর (সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট) ভিত্তিতে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অভ নিউইয়র্কের তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত সোফর রেট ছিল ৩.৮৭ শতাংশ। ২০২১ সালে সোফর রেট ছিল শূন্যের কাছাকাছি, মাত্র ০.০৫ শতাংশ। ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাংলাদেশসহ বিশ্ব অর্থনীতি কোভিড মহামারি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলে এই রেট লাফিয়ে ১.৫০ শতাংশে পৌঁছায়। এর সঙ্গে বিদেশি ঋণদাতারা 'ক্রেডিট রিস্ক স্প্রেড' যুক্ত করে। এছাড়াও বিদেশে পাঠানো সুদের ওপর ২০ শতাংশ উইথহোল্ডিং ট্যাক্স দিতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ সর্বোচ্চ ২৫.৯৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা দুই বছর আগে ছিল ১৩.২৩ বিলিয়ন ডলার।
সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা অবস্থায় মোট বেসরকারি বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৬৮ শতাংশ বা ১৭.৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল স্বল্পমেয়াদি দায়। চার বছর পর, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মোট বেসরকারি বৈদেশিক ঋণ কমে দাঁড়িয়েছে ১৯.৯৪ বিলিয়ন ডলার; অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদি ঋণের অংশও কমে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কমার পেছনে সম্ভবত বেশ কয়েকটি চাপের সম্মিলিত প্রভাব রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী চড়া সুদহার বিদেশি ঋণ নেওয়ার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অন্যদিকে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ডলারভিত্তিক ঋণের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রায় ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের পরিমাণও বেড়ে গেছে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, "বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও তা পর্যাপ্ত নয়। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং ডলার প্রাপ্তি অনিশ্চিত থাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভবত নতুন করে বিদেশি ঋণ নেওয়া এড়িয়ে চলেছে। উল্টো যেখানে সম্ভব, সেখানে আগের দায়গুলো পরিশোধ করেছে।'
সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে। এই ঋণ কমেছে ৪২.৪৮ শতাংশ।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, 'আমদানি ব্যয় মেটাতে ট্রেড ক্রেডিট ও স্বল্পমেয়াদি ঋণের ব্যবহার কমে যাওয়ার বিষয়টিও এর মাধ্যমে আংশিকভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।'
টিবিএসকে তিনি বলেন, 'আমদানির বিল পরিশোধ করা যখন কঠিন বা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, তখন ব্যবসায়ীরা আমদানি কমিয়ে বা পিছিয়ে দিতে পারে। তারা দেশীয় উৎস থেকে বেশি অর্থায়নের চেষ্টা করতে পারে, অথবা স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।'
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের মধ্যে ট্রেড ক্রেডিট ও অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি দায় অন্তর্ভুক্ত থাকে। তাই এই ঋণ কমে যাওয়ার বিষয়টি প্রকৃত ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি এসব অর্থায়নের প্রবাহে পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিতে পারে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, 'ঋণ কমার কারণে বৈদেশিক মুদ্রা ও পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি কমতে পারে। তবে একে সরাসরি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী হওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। এটি এমনও ইঙ্গিত দিতে পারে, বেসরকারি খাত বিনিয়োগ পিছিয়ে দিচ্ছে, অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ছে, অথবা কম আমদানি ও উৎপাদন নিয়ে নিজেদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'মোট বৈদেশিক ঋণ কমে যাওয়ার মানে হতে পারে, নতুন করে ঋণ নেওয়ার চেয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধ বেশি হয়েছে। তবে এর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করতে হলে নতুন ঋণ, পরিশোধ করা ঋণ, ট্রেড ক্রেডিট ও বিনিয়োগের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন।'
