খাদ্য উৎপাদন সর্বোচ্চ ভূমিকা রেখেও আয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে ক্ষুদ্র কৃষকরা: বিবিএস জরিপ
বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদকদের সিংহভাগই ক্ষুদ্র কৃষক, কিন্তু বড় কৃষকদের তুলনায় তাঁদের আয় অনেক কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আজ মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, দেশব্যাপী মোট খাদ্য উৎপাদকদের মধ্যে ৫৩.৬৫ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় তাঁদের কেন্দ্রীয় ভূমিকার বিষয়টিই ফুটিয়ে তোলে।
উৎপাদনশীলতার নিরিখে জাতীয় পর্যায়ে শ্রম-দিবস প্রতি গড় আয় ১,৮৬৮ টাকা।
তবে ক্ষুদ্র উৎপাদকরা আয় করছেন তুলনামূলক অনেক কম—শ্রম-দিবস প্রতি ১,৪৯৪ টাকা। অন্যদিকে বড় কৃষকদের ক্ষেত্রে এ আয় ২,৩০১ টাকা।
খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীলতা মৎস্য চাষে (অ্যাকুয়াকালচার)—শ্রম-দিবস প্রতি ১১,৩৮২ টাকা। এরপরেই রয়েছে স্থায়ী বা বহুবর্ষজীবী ফসল (৬,৫৩০ টাকা) এবং বনায়ন (৫,৩৯০ টাকা)।
অন্যদিকে গবাদিপশু বা প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদনশীলতা সর্বনিম্ন—শ্রম-দিবস প্রতি ১,৪৫৯ টাকা।
'সার্ভে অন ইনকাম অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি অব স্মল-স্কেল ফুড প্রডিউসার্স ২০২৫' শীর্ষক এই জরিপটি দেশের আটটি বিভাগের ফসল, বনায়ন, গবাদিপশু এবং মৎস্য চাষসহ পাঁচটি কৃষি খাতের ১২,৮৭৯টি খানার ওপর পরিচালনা করা হয়।
বিভাগীয় পর্যায়ে চট্টগ্রাম (৫৯.৮১%) এবং রংপুরে (৫৯.২৯%) ক্ষুদ্র কৃষকদের অনুপাত সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে সিলেটই (৩৯.৯৯%) একমাত্র বিভাগ, যেখানে বৃহৎ খাদ্য উৎপাদকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
জরিপটিতে কৃষি খাতের নেতৃত্বে লিঙ্গবৈষম্যের বিষয়টিও সামনে এসেছে: ক্ষুদ্র কৃষক খানাগুলোর মাত্র ১০.৭ শতাংশের প্রধান নারী, যেখানে বৃহৎ উৎপাদকদের ক্ষেত্রে নারী প্রধান খানা মাত্র ৪.৭ শতাংশ।
যেসব ক্ষেত্রে বড় কৃষকদের চেয়ে এগিয়ে ক্ষুদ্র উৎপাদকরা
কিছু কিছু নির্দিষ্ট খাতে আবার বড় কৃষকদের চেয়েও ভালো পারফর্ম করছেন ক্ষুদ্র উৎপাদকরা।
স্থায়ী বা বহুবর্ষজীবী ফসলের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উৎপাদকরা যেখানে শ্রম-দিবস প্রতি ৯,১৮২ টাকা উপার্জন করেন, সেখানে বড় উৎপাদকদের আয় ৪,৬০৩ টাকা।
বনায়ন খাতেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। যেখানে ক্ষুদ্র কৃষকদের শ্রম-দিবস প্রতি আয় ৬,৫১৮ টাকা এবং বড় কৃষকদের ক্ষেত্রে তা ৪,৬৫৬ টাকা।
আঞ্চলিক বিচারে, ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীলতা রেকর্ড করা হয়েছে রাজশাহী বিভাগে—শ্রম-দিবস প্রতি ২,০৯৩ টাকা। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ (১,১৩৫ টাকা)।
তবে আয়ের বৈষম্যের চিত্রটি আরও বেশি প্রকট।
দেশের সব ধরনের খাদ্য উৎপাদকদের গড় বার্ষিক আয় ৭৮,২৮৬ টাকা। অথচ ক্ষুদ্র কৃষকরা বছরে আয় করেন মাত্র ৩৩,৬৩৯ টাকা, যা বৃহৎ উৎপাদকদের বার্ষিক গড় আয় ১,২৯,৯৫৬ টাকার তুলনায় প্রায় চার গুণ কম।
ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে উঠে এসেছে গবাদিপশু বা প্রাণিসম্পদ খাত, যা তাঁদের মোট আয়ের ৮৪.৫ শতাংশ বা বার্ষিক ২৮,৪২১ টাকা জোগান দেয়।
সামগ্রিকভাবে সব খাদ্য উৎপাদকের ক্ষেত্রেও প্রাণিসম্পদ খাত থেকেই বার্ষিক সর্বোচ্চ আয় (৭০,৪৩২ টাকা) আসে; এর পরেই রয়েছে মৎস্য পালন ও বনায়ন।
বিভাগীয় পর্যায়ে, রাজশাহী ক্ষুদ্র উৎপাদকদের সর্বোচ্চ বার্ষিক আয়ের দিক থেকেও শীর্ষে রয়েছে, যা ৪৪,৭০৭ টাকা। অন্যদিকে সিলেট সবচেয়ে কম আয় রেকর্ড করা হয়েছে ২৪,৬৩৬ টাকা।
জরিপটি দেশের খাদ্য ব্যবস্থার সুরক্ষায় ক্ষুদ্র কৃষকদের অপরিসীম ভূমিকা এবং তাঁদের উৎপাদনশীলতা ও আয়ের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ব্যবধানকে স্পষ্ট করে তুলেছে। একইসঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে তাঁদের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে—সুনির্দিষ্ট নীতি সহায়তার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
