অর্থঋণ আদালত: যখন ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ চলে কচ্ছপগতিতে
২০০৩ সালের অর্থঋণ আদালত আইন— খেলাপি ব্যাংক ঋণ দ্রুত আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যেখানে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু এই আইনের আওতায়, দেশের ইতিহাসে দায়ের করা একদম প্রথম মামলাটির বর্তমান পরিস্থিতিই সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরছে।
গ্রিন ট্যানারি নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে— ১৮ কোটি টাকা আদায়ের জন্য ২০০৪ সালের শুরুর দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের দায়ের করা সেই মামলাটি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে ঝুলে আছে। এই দীর্ঘ সময়ে ১০৪টি শুনানির তারিখ পার হলেও—মামলাটি এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।
জনতা ব্যাংকের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী আইয়ুব হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এই মামলাটি দায়ের হওয়ার পর সমন জারি করা হয়। সমনের জবাব দিতে বিবাদী পক্ষ বা অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান বারবার সময় নেয়াসহ নানা কৌশলে ৮ বছর পার করে। প্রথম সাড়ে নয় বছরে মামলার তারিখ পরে অন্তত ৬৪ বার। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে বিবাদী পক্ষ হাইকোর্টে মামলার পুরো কার্যধারাকে চ্যালেঞ্জ করে। হাইকোর্ট মামলাটির বিচারকাজ ৬ মাসের জন্য স্থগিত করলেও—আমলাতান্ত্রিক ও আইনি মারপ্যাঁচে কার্যত সেই স্থগিতাদেশ কার্যকর ছিল প্রায় ৮ বছর। হাইকোর্ট শুনানি নিয়ে স্থাগিতাদেশ বাতিল করলে মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়। এরপর ২০২২ সালের আগস্ট মাসে একজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত। তবে আজ পর্যন্ত ওই ঋণের কোনো টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এই প্রথম মামলাটিই বাংলাদেশের ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার গভীর পদ্ধতিগত সংকটের চিত্রটি নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের গতির সাথে তাল মেলাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত সারা দেশের ৬৮টি অর্থঋণ আদালতে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ সংশ্লিষ্ট ৭৪,৬৭৯টি মামলা ঝুলে ছিল।
গড়ে দেশের প্রতিটি অর্থঋণ আদালতের বিচারক ১,০৫০টিরও বেশি মামলা পরিচালনা করছেন, যেখানে ঢাকার বিচারকদের কাজের চাপ সামগ্রিক গড়ের চেয়ে প্রায় দশ গুণ বেশি। গত কয়েক বছরে মামলা নিষ্পত্তির সার্বিক হার ১০ শতাংশেরও কম হওয়ায়—প্রতি বছরই মামলার এই জট আরও বেড়েই চলেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে, সরকার অর্থঋণ আদালতগুলোর কার্যক্রম দ্রুততর বা 'ফাস্ট-ট্র্যাক' করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে। গত ১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক এ বছরের জুলাই–ডিসেম্বরের জন্য মুদ্রানীতি বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে খেলাপী ঋণ আদায় ব্যবস্থার উন্নতির জন্য ৭টি বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। যার মধ্যে অর্থঋণ আদালতগুলোকে দ্রুত বিচার আদালত বা ফাস্ট-ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল হিসেবে কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ. (রুমী) আলী টিবিএসকে বলেন, অর্থঋণ আদালত আইন হলো একটি বিশেষ আইন। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় দ্রুত করার জন্যই এই আইনটি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের উদ্দেশ্য হোঁচট খেয়েছে।
তিনি বলেন, "১০ বছরের কম সময়ে মামলার তেমন নিষ্পত্তি হয় না। আবার নিষ্পত্তি হলেও—ঋণগ্রহীতারা সেটির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নেয়। আমরা বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, প্রায় নিয়মিতভাবে বিচারক থাকেন না, জনবলের অভাব রয়েছে। ফলে মামলার দীর্ঘসূত্রতাও বাড়ে। শুনানির জন্য কোনো কার্যকর সময়সীমা থাকে না। এসব কারণে দিনের পর দিন ধরে মামলা চলতে থাকে। তার সঙ্গে নতুন নতুন মামলা এসে যোগ হতে থাকে।"
আইন বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকারদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নতুন পদক্ষেপটি সঠিক দিশায় একটি উদ্যোগ হলেও—এজন্য আরও বিচারক নিয়োগ করা, অতিরিক্ত আদালত প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস ও সম্পদ বাড়ানো অপরিহার্য। এমনকি এগুলো করার পরও, আদালতের মূল কার্যপ্রণালী বা প্রক্রিয়াকে যদি আরও দ্রুত, দক্ষ এবং কঠোরভাবে সময়াবদ্ধ করা না যায়, তবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা কেবল সুদূর পরাহতই রয়ে যাবে।
মামলার বিশাল জট
ঢাকায় বর্তমানে চারটি অর্থঋণ আদালত রয়েছে।
গত ৩০ মে পর্যন্ত ঢাকার প্রথম অর্থঋণ আদালতে ৬,৮৩৫টি মামলা বিচারাধীন ছিল, যার মধ্যে আরও ৮৫৬টি মামলা হাইকোর্ট কর্তৃক স্থগিত রয়েছে। এই আদালতে ২০ বছরেরও বেশি পুরনো ১২৩টি মামলা রয়েছে; ৭৬৪টি মামলা ১০ বছরের বেশি ও ২,৩৪৮টি মামলা ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। এই মামলাগুলোর সাথে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ জড়িত।
বিগত ২০২৫ সালে এই আদালতটি ১,১০৮টি নতুন মামলা গ্রহণ করলেও নিষ্পত্তি করতে পেরেছে মাত্র ৯৬টি। ২০২৪ সালে এটি ১,৩৪৫টি মামলা পেয়েছিল এবং নিষ্পত্তি হয়েছিল মাত্র ১০৮টি। তার ওপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত আদালতে কোনো বিচারক ছিল না।
ঢাকার দ্বিতীয় অর্থঋণ আদালতে সর্বাধিক ১৪,৩৪২টি মামলা মামলা ঝুলে আছে, যার সাথে জড়িত প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এই আদালতে ২০ বছরে বেশি পুরাতন মামলা রয়েছে ৩০৬টি।
তৃতীয় অর্থঋণ আদালতে ঝুলে আছে ১২,১০৩ টি মামলা, যার সাথে জড়িত প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। চতুর্থ অর্থঋণ আদালতে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ৮,৫৩৪টি, যার সাথে জড়িত প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে ঢাকার এই চারটি আদালত প্রায় ১.৩২ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ সংশ্লিষ্ট ৪১,৮১৪টি মামলা পরিচালনা করছে—যা বিচারক প্রতি গড়ে ১০,৫৫৩টি মামলার বিশাল চাপ তৈরি করেছে।
নিষ্পত্তির হার এত কম কেন?
বাংলাদেশ ব্যাংক, সুপ্রিম কোর্ট এবং অর্থঋণ আদালতের পরিসংখ্যান অনুসারে, গত ৩০ মে পর্যন্ত দেশের ৬৮টি অর্থঋণ আদালত—যার মধ্যে চারটি ঢাকায়, দুটি চট্টগ্রামে এবং প্রতিটি জেলায় একটি করে রয়েছে—২০২৫ সালে ১৪,২০৮টি নতুন মামলা গ্রহণ করে, তবে নিষ্পত্তি করতে পেরেছিল মাত্র ২,৪৯৬টি। এর আগে ২০২৪ সালে ১৬,৩৪৫টিরও বেশি মামলা দায়ের হয়েছিল এবং নিষ্পত্তি হয়েছিল মাত্র ১,৬০৬টি।
সুপ্রিম কোর্টের একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশের ৬৮টি অর্থঋণ আদালতের মধ্যে ১১টি'তে বিচারক নেই প্রায় এক বছর ধরে। এতে করে, এসব আদালতের বিচারিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে অর্থঋণ আদালতের বিচারকদের পারিবারিক বিরোধ, অর্থ মামলা, ডিক্লারেশনের মামলা এবং অন্যান্য দেওয়ানী মামলারও নিয়মিত শুনানি করতে হয়, যা ঋণ পুনরুদ্ধারের মামলার জন্য বরাদ্দ সময়কে আরও কমিয়ে দেয়। আইনজীবীরা বলছেন, এই বন্টিত এক্তিয়ারের (শেয়ার্ড জুরিসডিকশন) কারণে খেলাপি ঋণের মামলা নিষ্পত্তির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে যায়।
ব্যাংক ও কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মো. মোস্তাফিজুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলার প্রধান কারণ বিচারক ও আদালতের লোকবল সংকট। ফলে মামলা হলেও সেখানে কোন গতি থাকে না। বিচারক না থাকায় হয়তো ঠিকমতো শুনানি হয় না। অনেক সময় বিবাদী পলাতক থাকে, হয়তো দেশের বাইরে চলে গেছে। তখন মামলাগুলো ঝুলে থাকে।"
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো নিজেরাও ঋণ অনুমোদনের আগে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই বা ডিউ ডিলিজেন্স না করার মাধ্যমে প্রায়শই এই সমস্যার সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখে।
"অনেক ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার সময় বন্ধকী বা মর্টগেজের নথিপত্র অসম্পূর্ণ থাকে কিংবা সম্পত্তির মূল্য বহুগুণ বাড়িয়ে বা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়। ফলে নিলাম হলেও দেখা যায়, ঋণ পুনরুদ্ধারের মতো টাকা উঠে আসে না। ফলে তৎপরভাবে লোন রিকভারি করা নিয়েও অনেক সময় ব্যাংকের ভেতরে অনীহা থাকে।"
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, ব্যাংক তার পক্ষে আদেশ পাওয়ার পরও অনেক সময় ঋণগ্রহীতারা উচ্চ আদালতে গিয়ে ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিট করেন। ফলে রায়ের বাস্তবায়নকে বছরের পর বছর পিছিয়ে দেয়।
'ফাস্ট-ট্র্যাক' আদালত গঠনে কী প্রয়োজন?
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট বা দ্রুত বিচার আদালত হলো এমন বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল, যা দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরির মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়।
তিনি বলেন, সরকারকে একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই আদালতগুলোকে মনোনীত করতে হবে এবং আইনগত বা সংবিধিবদ্ধ সময়সীমা সংক্ষিপ্ত করার জন্য বিদ্যমান মূল আইন সংশোধন করতে হবে।
"এই আদালতগুলোকে কেবল ঋণ পুনরুদ্ধারের মামলার ওপর একক এক্তিয়ার দিতে হবে। একই সাথে আদালতের সংখ্যাও দ্রুত বাড়াতে হবে। যেখানে বর্তমান কাঠামোতে প্রত্যেক বিচারক ইতোমধ্যেই এক-দেড় হাজারেরও বেশি মামলা পরিচালনা করছেন—এবং ঢাকায় প্রতি বিচারকের বিপরীতে ১০ হাজারেও বেশি মামলা রয়েছে—সেখানে দ্রুত নিষ্পত্তি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।"
তিনি মনে করেন, মামলার এই বিশাল চাপ সামাল দিতে কেবল ঢাকাতেই অন্তত ১০টি অতিরিক্ত বিশেষায়িত অর্থঋণ আদালত প্রয়োজন। শাহদীন মালিক আরও বলেন, ফাস্ট-ট্র্যাক বা দ্রুত বিচার আদালত প্রতিষ্ঠা ও সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য বিচার বিভাগের জন্য সরকারের বর্তমান বরাদ্দ একেবারেই অপ্রতুল।
"ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন করা অত্যন্ত জরুরি, তবে এর জন্য সরকার এবং ব্যাংকিং খাত—উভয় পক্ষের কাছ থেকেই আন্তরিক ও প্রকৃত নীতিগত প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন," যোগ করেন তিনি।
সহায়ক হতে পারে নতুন আইনি বিধান
ব্যাংকিং আইন বিশেষজ্ঞ ইমরান আহমেদ ভূঁইয়া মামলা ব্যবস্থাপনার জন্য 'রকেট ডকেট' (কঠোর সময়সীমার মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি) পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করেছেন, যার অধীনে বিচারকরা মামলা পরিচালনার জন্য কঠোর সময়সীমা আরোপ করবেন, সেই সাথে সংক্ষিপ্ত রায় (সামারি জাজমেন্ট) এবং দ্রুততর বিচারিক প্রক্রিয়া চালু করার কথা বলেছেন তিনি।
তিনি বলেন, যেখানে মামলার তথ্য-উপাত্ত বা ঋণের ঘটনা নিয়ে কোনো প্রকৃত বিতর্ক বা সন্দেহ থাকে না, সেখানে পূর্ণাঙ্গ বিচারিক ট্রায়াল না করেই সরাসরি রায় দেওয়ার ক্ষমতা থাকা উচিৎ আদালতের; এটি ব্যাংকগুলোকে অনেক দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করবে।
তিনি আরও পরামর্শ দেন যে, অর্থঋণ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করার আগে ঋণগ্রহীতাদের বকেয়া ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ নগদ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা উচিত। তিনি যুক্তি দেন, এর ফলে কেবল ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করার হাতিয়ার হিসেবে উচ্চ আদালতে মামলা-মোকদ্দমা ব্যবহার করার প্রবণতা থেকে বড় খেলাপিরা নিরুৎসাহিত হবেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ব্যাংকগুলোকে ঋণ অনুমোদনের আগে অবশ্যই ঋণগ্রহীতা যাচাই-বাছাই এবং বন্ধকী সম্পত্তির সঠিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার আমূল উন্নতি করতে হবে। একই সাথে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঋণ প্রদান ও ঋণ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সব ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অবসান ঘটাতে হবে।
