রেমিট্যান্সের ডলারের দাম ১২২.৯০ টাকার মধ্যে রাখার মৌখিক নির্দেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ কত দরে ডলার কেনাবেচা করতে পারবে, মৌখিকভাবে তার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল (১৩ এপ্রিল) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলার বিক্রিতে সর্বোচ্চ দর ১২২.৭০ টাকা নির্ধারণের জন্য ব্যাংকগুলোকে মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো থেকে সর্বোচ্চ ১২২.৯০ টাকা দরে রেমিট্যান্স কেনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ব্যাংকগুলোকে তাদের বিসি (বিলস ক্লিন/সেলিং) রেট কমানোর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সোমবার ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলার বিক্রির দর ১২৩.২৫ থেকে ১২৩.৫০ টাকার মধ্যে ছিল।
গত সপ্তাহে অ্যাসোসিয়েশন অভ ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের আলোচনার সময় অতিরিক্ত দামে কয়েকটি ব্যাংক রেমিট্যান্স কিনেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়। ওই বৈঠকের পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ডলার মার্কেটে যে স্থিতিশীলতা এসেছে, তা কোনোরকমের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এসেছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর নিট অপেন পজিশনও (এনওপি) বেশ ভালো। তাই এমন কোনো অবস্থা ডলার মার্কেট এমন কোনো অবস্থায় পৌঁছায়নি যে দাম বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে ডলার বাজারের অস্থিরতা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কতা তৈরি করেছে। তবে বর্তমানে বাজারে পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ থাকায় নতুন করে কোনো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, কয়েকটি ব্যাংক অতিরিক্ত দামে ডলার কেনার কারণে বৈদেশিক মুদ্রাটির দাম বেড়েছিল। বাজার এমন কোনো অবস্থায় পৌঁছায়নি যে এখনই এত দামে ডলার কিনতে হবে। বাজারে যথেষ্ট পরিমাণে ডলার সরবরাহ রয়েছে, রেমিট্যান্সের প্রবাহও অনেক বেশি।
আরেকজন ব্যাংকার বলেন, যেসব ব্যাংক আগে ১২৩ টাকা দিয়ে রেমিট্যান্স কিনেছে, তারা আন্তঃব্যাংক বাজারে ১২২.৭০ টাকায় বিক্রি করতে চাইবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত আন্তঃব্যাংক লেনদেন শক্তিশালী করতে চাইছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ সবসময় সঠিক ফল না-ও আনতে পারে।
ফরোয়ার্ড বুকিং বেড়েছে, স্পট মার্কেটে চাহিদা কম
মধ্যেপ্রাচ্যতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ডলার দর বাড়ছে। তাছাড়া যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে একরকম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানো যাবে না—এমন আশঙ্কা থেকে অনেকেই সঞ্চয়ের বড় একটা অংশ দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এজন্য মার্চে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে পৌঁনে চার বিলিয়ন ডলার। যদিও এর পেছনে ডলারের দর ভালো থাকাও একটা কারণ।
তবে ব্যাংকাররা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সামনে রেমিট্যান্স প্রবাহে একটা ধাক্কা লাগতে পারে। তখন ডলার দর বাড়ার আশঙ্কা থেকে অনেক ব্যাংক ফরওয়ার্ড বুকিং দেওয়া বাড়িয়েছে।
ফরওয়ার্ড বুকিং হলো ভবিষ্যতের কোনো নির্দিষ্ট তারিখের পণ্য, সেবা বা বিদেশি মুদ্রার দাম বর্তমান সময়েই চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত লক-ইন বা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া। এটি মূলত ব্যবসায়িক ঝুঁকি (যেমন মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা) কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়, যেখানে চুক্তির সময় নির্ধারিত মূল্যে ভবিষ্যতে লেনদেন সম্পন্ন হয়। বর্তমান দরের চাইতে কিছুটা বেশি দামে ফরওয়ার্ড ডলার কিনতে হয়।
ব্যাংকাররা বলছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফরওয়ার্ড বুকিং নেওয়া বেড়েছে ব্যাংকগুলোতে। মূলত ছয় মাস পর যেসব এলসির নিষ্পত্তি করতে হবে, সে সময় ডলারের দাম বাড়লে খরচ বেশি পড়বে। তাই সে সময় ডলার দর বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিংবা আশঙ্কা থেকে আগেই বর্তমান দামে ডলার বুকিং কিংবা লক করে ফেলছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘ হলে রেমিট্যান্স কমার সম্ভবনা রয়েছে, আবার তেলের দামও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত ফরওয়ার্ড বুকিং করতে নিরুৎসাহিত করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিশেষত স্পট মার্কেট থেকে ডলার কিনে তা ফরওয়ার্ড করতে নিষেধ করছে।
কর্মকর্তারা বলেন, তিন-চার মাস আগেও ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের চাহিদা বেশি ছিল না। মূলত যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের চাহিদা বেড়েছে এবং স্পট মার্কেটের চাহিদা কমেছে।
একজন সিনিয়র ব্যাংকার বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে। এজন্য ডলারের দর আবার কিছুটা কমিয়ে আনতে চাচ্ছে। ডলার প্রবাহ যেহেতু ভালো রয়েছে, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইছে একটা সহনীয় পর্যায় ধরে রাখার জন্য। কারণ তেলের দাম বাড়লেও যেন মূল্যস্ফীতি একটা সহনীয় পর্যায় ধরে রাখা যায়, এমন একটা প্রত্যাশা তাদের রয়েছে। রেমিট্যান্স ও আন্তঃব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের যে দর নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেটা একটা 'ভার্বাল ইন্টারভেনশন' বলা যায়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু ডলারের দরে একটা মৌখিক সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেক্ষেত্রে যেসব ব্যাংক আগে বেশি দামে ডলার কিনেছে তারা লোকসান দিয়ে আন্তঃব্যাংকে ডলার লেনদেন করতে চাইবে না।
