অর্থবছরের প্রথমার্ধে রাজস্ব আদায় ১৪% বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে ঘাটতি ৬৯ হাজার কোটি টাকা
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে—জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত—জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
তবে আদায় বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি হয়েছে ৬৮ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫৭ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা।
এনবিআর কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণই এই বড় ঘাটতির অন্যতম কারণ। পাশাপাশি অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি না থাকা এবং মাঠপর্যায়ে ফাঁকি ঠেকিয়ে রাজস্ব আদায়ে কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত উদ্যমের অভাবও ঘাটতির পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
এনবিআরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে রাজস্ব আদায় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য বেশি, অর্থাৎ ১০ শতাংশের কিছু বেশি বেড়েছে। এর আগের মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি ছিল। ডিসেম্বর মাসেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছিল ১২ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ২১০ কোটি টাকা। এ সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আদায় বেড়েছে ১৪ শতাংশের কিছু বেশি।
তবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৩ শতাংশ বেশি হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বেশি হারে রাজস্ব আদায়ের কোনো নজির নেই।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, গত বাজেট ঘোষণার সময়ই তারা এই লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব বলে উল্লেখ করেছিলেন। এর পর নতুন করে আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রায় যুক্ত করা হয়েছে। ফলে মোট লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার মতে, এতে বছর শেষে বড় ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "কী ভিত্তিতে সরকার নতুন করে ৫৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা এনবিআরকে দিয়েছে, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এটি হয়তো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা, তবে বাস্তবে এটি 'আইওয়াশ' ছাড়া কিছু নয়।"
এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আগামী ছয় মাসেও অর্থনীতিতে এমন কোনো গতি আসার সম্ভাবনা নেই, যাতে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এর অর্থ হলো, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতির দিকেই যাচ্ছে সংস্থাটি।
তিনি বলেন, ২০১৬–১৭ অর্থবছর থেকেই সরকার বড় আকারের ব্যয় বাজেট দিয়ে আসছে, ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চ রাখা হচ্ছে। এ কারণেই প্রতি বছর ঘাটতি দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় এই রাজস্ব আদায় অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় বড় আকারের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি আনুষ্ঠানিক খাতে আনা যাচ্ছে না এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ও সম্ভব হচ্ছে না।"
এনবিআরের একটি ট্যাক্স জোনের এক কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "অর্থবছরের শুরুতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাই বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্জন করা কঠিন ছিল। এর পর আবার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোয় তা বাস্তবে অর্জন করা সম্ভব হবে না।"
প্রসঙ্গত, অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। গত মাসে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৩ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, "এনবিআরের ইতিহাসে এত বেশি হারে রাজস্ব আদায়ের উদাহরণ নেই। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন থাকায় এর পর অর্থনীতিতে হঠাৎ গতি আসার লক্ষণও নেই। গতি এলেও এত বড় হারে রাজস্ব আদায় কার্যত বাড়বে না।"
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথমার্ধে আয়কর আদায় বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ভ্যাটে প্রায় ২০ শতাংশ এবং আমদানি শুল্কে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ শতাংশের কম।
