মৎস্যকুমারী: অর্ধেক তার নারী
ফেনার কান্তারে
"পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ কোথাও বসত গড়ি না আমরা, ফিরে আসি কূলে, আমাদের খালি নৌকো ভরে থাকে চন্দ্রালোকে।" (এহায় ডোগেন, তের শতকের জেন সন্ন্যাসী)
সাগরমুদ্রা সমাধি—সন্ন্যাসীর এমন এক ধ্যান যেখানে তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে হৃদয়ের আয়নায় বাত্যাহীন সমুদ্রের মতো ধারণ করেন... অবাধ-অসীম এ সমুদ্র...পাবলো নেরুদা যার তরঙ্গসমষ্টিকে ডেকেছেন 'ইউনিভার্সিটি অভ ওয়েভস', "তোমার সবুজ পেটিকা খোলো আর আমাদের হাতে দাও রোজকার রুপালি মোহর—মাছ!" সমুদ্রের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ অত্যন্ত জটিল, প্রপঞ্চময়। কখনো কালাপানি পার হবার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে জাত্যাভিমানীর জাত খোয়ানোর ভয়। কখনো ভূপর্যটক স্কার্ভি আর বেরিবেরি রোগে পড়েও সমুদ্রের রহস্যময় হাতছানি উপেক্ষা করতে পারেনি—খাদ্যের অভাবে ইঁদুর ধরে খেয়েছে। কখনো অনুকূল হাওয়ার অভাবে অশ্ব অক্ষাংশে ঘোড়াদের ভাসিয়ে দিয়েছে সমুদ্র-নিষাদ পশ্চিমারা। কখনো সামুদ্রিক বাতাসে পেয়েছে আমিষ গন্ধ (শক্তি চট্টোপাধ্যায়)। কখনো আনমনা, কখনো চপল, আর সবসময়ই বিরাট আর ভয়ালৃ সৈকত খানিকটা ছাড়ালেই এমন এক উন্মুক্ত সমুদ্রজগৎ- ভূপৃষ্ঠের ৭০% তার দখলে, ৯৯% প্রাণসম্ভব স্থান তার উদরে। সসীম ও সংসারলিপ্ত মানুষ একে ধারণ করতে পারেনি, সমুদ্রতীরে এসেও বরং সঞ্চয়ের মনোভাব নিয়ে ঝিনুক কুড়িয়েছে; তার সন্দিগ্ধ সাগ্রহ চোখ চিরদিন খুঁজতে চেয়েছে সমুদ্রের মানে। এ সমুদ্রে যারা অনায়াসে চরে বেড়ায় তারা কে কেমন? যার অর্ধেকটা পুরুষ বোঝে, আর বাকি অর্ধেক সে হাজার ভোগে-অন্বেষণেও হৃদয়ঙ্গম করতে অপারগ— পুরুষের পৃথিবী তাকে নারী বলেই চিহ্নিত করেছে। নদী তার কল্পনায় নারী, বন-বনানীও তার কাছে নারী। পুরুষের কল্পনায় সমুদ্রেরও আছে তেমনি এক জলচরী নারী। সসাগরা ধরিত্রীর বাকি সব প্রাণীর মতো সেও নগ্না, মাথায় সমুদ্রশৈবালের মতো দীর্ঘ চুল, গলায় ঝিনুকমালা, কানে গোঁজা শ্বেতশালুক, কটিদেশ থেকে বাকি শরীর মাছের মতো- ঝকমকে আঁশে ঢাকা। নাম তার মৎস্যকুমারী/কন্যা।
কে যেন দূর হতে আমারে ডেকে ডেকে যায়- আয় আয়
মারমেইড বা মারম্যানের আদি উদ্ধৃতি মেলে ব্যাবিলনীয় সভ্যতায়, ৩০০০ বছর আগে। সে মূলত পুরুষ, সমুদ্রদেবতা, নাম ইয়া। মেসোপটেমীয় সভ্যতায় নোনাজলের সর্বনাশিনী অধীশ্বরী দেবী তিয়ামাত আর আব্জু মিঠেপানির, এদের সুসঙ্গতি রাখবার ভার ইয়ার। আক্কাদীয় হয়ে নব-সুমেরীয় থেকে হেলেনিস্টিক আমল অব্দি মৎস্যপুরুষের দেখা মেলে। আদি মৎস্যনারীর গল্প ফেঁদেছিল অ্যাসিরীয়রা, খ্রিষ্টের জন্মের ১০০০ বছর আগে। প্রাচীন সিরীয় দেবী আতরগাতিস, ইউফ্রেটিসের এক মাছের ডিমে ঘুঘু তা দেবার পর তিনি জন্মান। এক রাখালের প্রেমে পড়েন তিনি, গর্ভাধান ঘটে দেবীর। সেই লজ্জায়-ক্ষোভে রাখালবালককে হত্যা করেন তিনি, অথবা অনবধানে রাখালকে হত্যা করে লজ্জায় জলে ঝাঁপ দেন। লজ্জা আগে না হত্যা আগে, তা সঠিক জানা যায় না। কিন্তু জলে ঝাঁপ দিলেই কি আর হয়, জল কি দেবরূপ লুকিয়ে রাখতে পারে? তাই তিনি পরিণত হন আধেক-মাছে, উর্বরতার দেবী।
গ্রিক মিথে সাইরেনরা ছিল আধা-পক্ষী আধা-নারী। কারা এই সাইরেন? নহে দেবী, নহে সামান্যা দানবী। আসঙ্গলিপ্সা আর ভোগবাসনার চিহ্ন তারা, সুন্দরের রূপ ধরে আসে- সংহার করে ছাড়ে। কেউ বলে এরা নদীদেবতার কন্যা। কেউ বলে এরা পার্সিফনির সখী, পার্সিফনিকে পাতালের অধীশ্বর হেডিস তুলে নিয়ে যাবার পর এরা পৃথিবীময় পার্সিফনিকে খুঁজে ফিরেছে, না পেয়ে সমুদ্রতীরে বসে গেয়েছে শোকগাঁথা। হোমারের অডিসিউসকে সমুদ্রের সাইরেনদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন জাদুকরী সার্সি। সাইরেনদের পার হয়ে অডিসিউসের জাহাজকে যেতে হবে। এই নগ্ন জলপরীদের উত্তাল আহ্বানমূলক গান শুনে জাহাজীরা সুর অনুসরণ করে পাষাণপ্রাচীরে জাহাজ ঘোরায় অথবা পাগল হয়ে স্বেচ্ছায় সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়। সাইরেনদের নাবিক-ভুলানিয়া গান থেকে রক্ষা করতে নিজের জাহাজীদের কান নরম মোম দিয়ে ভরাট করে দিয়েছিলেন অডিসিউস,...কিন্তু তিনি নিজে কী করলেন? উৎসুক বীর ভাবলেন- গানটা আসলে কেমন শুনেই দেখা যাক না, বেঁচে থাকলে অভিজ্ঞতার গল্প তো করা যাবে! সঙ্গীদের সহায়তায় মাস্তুলের সঙ্গে নিজেকে বাঁধলেন আর হুকুম করলেন- কোনো অবস্থাতেই যেন সাইরেনদের পার হবার সময় এ বাঁধন তাঁরা না খোলেন, এমনকি স্বয়ং অডিসিউস আজ্ঞা দিলেও যেন না খোলা হয়। অমনি করে তিনি শুনলেন কুহকিনীদের গীত।
বাল্মিকীর সংস্কৃত রামায়ণে মৎস্যকন্যার উল্লেখ না থাকলেও থাই ও কম্বোডীয় রামায়ণে এক মৎস্যকন্যা আছে, নাম সুবর্ণমচ্ছ বা সুবর্ণমৎস্য, খোদ রাবণরাজার মহা-রূপবতী কন্যা তিনি, নিম্নাঙ্গে সোনার আঁশে ঢাকা মৎস্যপুচ্ছ। রামচন্দ্র সীতা-উদ্ধারকল্পে লঙ্কা যাবেন, বানরসেনারা দিনরাত খেটে রাম-সেতু নির্মাণ করছে। রাবণ সুবর্ণমৎস্যকে নির্দেশ দিলেন- সেতু যেন ধ্বংস করা হয়। বাপের হুকুম। কন্যা সমুদ্রের শত শত জলজ প্রাণীকে জুটিয়ে দিলেন, সেতুর পাথর সরিয়ে ফেলতে লাগল তারা। বানরসেনাপতি হনুমান জলের তলায় খতিয়ে দেখতে গেলেন- কেন সেতু তৈরিতে বিঘ্ন ঘটছে। সাক্ষাৎ পেলেন জলকন্যার, প্রেমে পড়লেন। হনুমান প্রেমিকাকে বুঝিয়ে বললেন- রামের যুদ্ধ কেন ন্যায়সঙ্গত। সেতু তৈরি হতে আর বাধা রইল না। হনুমান আর সুবর্ণমৎস্যের মিলনে জন্মাল পুত্র মচ্ছাণু, ওপরের শরীর বানরের, বাকিটা মাছের।
মহাভারতের উলুপী গঙ্গাগর্ভের নাগকন্যা। অমর চিত্রকথায় উলুপী অবশ্য অর্ধেক নারী অর্ধেক কুমীর। অর্জুনের রূপে মোহিত হয়ে তিনি অর্জুনকে জলের তলায় নাগলোকে টেনে এনেছিলেন। পরপূর্বা অথবা বিধবা—এই উলুপীই অর্জুনকে জানিয়েছিলেন- অর্জুনের ব্রহ্মচর্য কেবল দ্রৌপদীর জন্য প্রযোজ্য, অন্য নারীর জন্য নয়। অর্জুন তাঁকে বিয়ে করেছিলেন।
পৃথিবীর দিকে দিকে ছড়ায়েছি মনোবীজ
মালির ডোগোন জাতের লোক বিশ্বাস করে তারা অন্য ভূবনের কোনো মৎস্যকন্যার বংশধর, সেই কন্যার নাম নোম্মো। আমাজনের মিঠাপানিতেও আছে নিজস্ব মৎস্যকন্যা। চীনা মৎস্যকন্যারা মুক্তোর অশ্রু বর্ষণ করে, কোরীয় মৎস্যকুমারীরা ঝড়ের পুর্বাভাস জানাতে পারে। আরবরা এদের ডাকত বানাত আল-বাহার। পারস্যের দরিয়া-পরীরা অবশ্য ইউরোপীয় মৎস্যকন্যাদের মতো দুর্বৃত্ত নয়, তারা মানুষের প্রতি সদয়। স্লাভিক রুসাল্কা/রুসাল্কি নীলচে সবুজচুলো দুষ্টাত্মা মৎস্যকন্যা, পানির নীচে চুবিয়ে মানুষ মারে।
ইউরোপীয় আদি লোকসাহিত্যে মৎস্যকন্যা/পুরুষের দেখা পাওয়াটা জাহাজডুবির আগামবার্তা নিয়ে আসত। আলেকজান্ডার দি গ্রেটের মৃত্যুর পর তাঁর শোকাকুলা সৎ বোন থেসালোনিকি নাকি ইজিয়ান সাগরে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, মৃত্যুর বদলে তাঁর কপালে জুটেছিল অমরত্ব। চলিষ্ণু জাহাজের নাবিককে তিনি প্রশ্ন করতেন- রাজা আলেকজান্ডার কি বেঁচে আছেন? যদি নাবিক বলত- হ্যাঁ তিনি মহাসমারোহে রাজ্যশাসন করছেন, তাহলে থেসালোনিকি সুবাতাস বইয়ে দিতেন। কিন্তু যদি সেই উত্তরের অন্যথা হতো, তিনি গর্গন হয়ে সেই জাহাজ ডুবিয়ে দিতে চেষ্টা করতেন।
নেদারল্যান্ডের লোকে ভাবত- আলভেন আর এলবা নদীর জলপুরুষ ভোঁদড়ের রূপ ধরতে পারে। স্কটিশ নীলপুরুষকে জলে ভেসে থাকতে দেখলেই সে নাবিকের কাছে আব্দার করবে- "কবিতা শোনাও", যদি সেই আজ্ঞা না শোনা হয় তবে জাহাজ ডোবাতে তাদের জুড়ি নেই। বাঙালির জাহাজ কোনো নীলপুরুষে ডোবাতে পারবে না অবশ্য, ঘরে ঘরে কবি। স্কটিশ লোকজ বিশ্বাসে আরেক মৎস্যনারীর কথা আছে- যার লেজটা স্যামন মাছের মতো ফুটকিদার, যে ধরা পড়লে তিনটে ইচ্ছে পূরণ করত। গ্রিকদের কামীনী নামের জলপরীকে পূত ঝর্ণার আশপাশে পাওয়া যেত, ভবিষ্যত বলতে পারতো তারা। ব্রিটানীর লোকে ফরাসী হলে কি হয়, তাদের আদিপুরুষরা এসেছে কেল্টিক ব্রিটনদের থেকে, যারা আদিম বিলাইতি, এরা ম্যাল ডা মার (সমুদ্রবমন) নামের দুষ্ট মৎস্যকন্যাতে বিশ্বাস করত— জাহাজডুবিতে সিদ্ধহস্ত। ব্রিটানীর লোককথায় আরেক রকম মৎস্যকন্যা ছিল- যাদের ডাকা হতো করিগান, নদী-ঝর্ণা-কূপ-ফোয়ারা এসব ছোটখাটো জলাধারে বাস করত তারা, গান গাইত, চুল আঁচড়াত, পুরুষমানুষ ভুলিয়ে সর্বনাশ করত, আর ছোট বাচ্চা চুরি করে নিয়ে আসত- মায়ের কোলে দিয়ে আসত পরীর ভয়ানক বাচ্চা (চেঞ্জলিং)...তখন আর দেখতে হতো না- মাঠে ফসল ফলত না, গাইয়ের দুধ শুকিয়ে আসত। আইরিশরা এই পরীদের সমীহ করে ডাকত- 'গুড ফোক' (আচ্ছে লোগ), মনসা-পূজা করে সাপের কামড় থেকে বাঁচার মতো খোশামুদে ব্যাপার আর কি। এসব আচ্ছে লোগ নাকি আলো-আঁধারিতে বের হতো, ভোরের আলো ফুটবার আগে বা সন্ধ্যার আলো মরে আসার সময় পরী-ভীরু আইরিশ কোথাও যাবার জন্য বের হতো না। আচ্ছা, এরা মানুষের বাচ্চা কেন চুরি করত? বলা হয়, এরা মানুষের বাচ্চার রূপে মোহিত হয়ে তাদের পালতে নিয়ে যেত...হায়, আজ যদি যুদ্ধরত দেশগুলোর হৃদয়ে এমন দুষ্ট মৎস্যকন্যাদের মতো মানবশিশুপ্রীতিও থাকত, তবু তো কত শিশু বেঁচে রইত! ফরাসীরা ড্রাক রোন নদীর একরকম জলসর্পিনীতেও বিশ্বাস করত—এরা বেশ বদলাতে ওস্তাদ, সোনার পানপাত্র হয়ে জলে ভেসে থাকত- জলের ধারে গিয়ে যেই লুব্ধ হাত বাড়াত কেউ- ড্রাক তাকে টেনে নিত। রোনপাড়ে লোকালয়ে এরাও নাকি কমবয়স্ক ছেলেপুলে চুরি করত। আইরিশ মেরো নারীরা গান গেয়ে আকর্ষণ করত- আর পুরুষরা জাহাজীদের আত্মা চুরি করে জলের তলায় টেনে এনে একখানা পাত্রে আটকে রাখত। গান গেয়ে জলে ডোবাত স্ক্যান্ডিনেভীয় নক আর জার্মান নিক্সি মৎস্যকন্যারা। কোন গানটির কথা ভাবছেন? "শুধু গান গেয়ে পরিচয়/ চলার পথে ক্ষণিক দেখা/ এ কি শুধু অভিনয়?"
মোর পানিতে ঘর বন্দরে আসি তর লাইগ্যা
নীল কোলাহলময় সামুদ্রিক জগতের বাসিন্দারা ডাঙার মানুষের আহ্বানে ধরা দিত কি? নোনা হৃদয়ে কে রুইতো ধান, কে দিত পাকা ধানে মই? চলুন দেখি। ইউরোপীয় মিথলজিতে মেলুসিনের কথা আছে, যে মায়ের অভিশাপে প্রতি শনিবার সমুদ্রসর্পিনীতে পরিণত হতো, আমৃত্যু। মেলুসিন প্রেমে পড়েছিল রেমন্ডের, খুব টাকাকড়ি নেই- তবে বংশমর্যাদা আছে। বিয়ে করার সময় মেলুসিন কথা আদায় করেছিল— শুধু শনিবার রেমন্ড কখনো মেলুসিনকে খুঁজবে না। একে একে দশটি সন্তান হলো তাদের। প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করে রেমন্ড তাকে এক শনিবার খুঁজতে বের হলো। মেলুসিন বিরলে সাঁতার কাটছিল—পায়ের বদলে নিম্নাঙ্গে সাপের লেজ। দেখে আকাশ ভেঙে পড়ল রেমন্ডের মাথায়- নাগিনী বলে কটুকাটব্য করল। ক্রুদ্ধ মেলুসিন ড্রাগনের পাখনা মেলে উড়ে গেল চিরতরে, শুধু মাঝে মাঝে সে সন্তানদের দেখতে এসে চক্কর খেতো স্বামীর দুর্গের চারদিকে। চিমনির ভেতর যে ঝোড়ো বাতাসের শব্দ হয় তা নাকি মেলুসিনের হাহাকার।
হেব্রিডিজ বা অর্কনী দ্বীপে সেল্কিকে কল্পনা করা হতো- অর্ধেক নরদেহ আর অর্ধেক সীলমাছ এমনি এক প্রাণী হিসেবে। সেল্কি নারীরা কখনো জালে ধরা দিত, মনেপ্রাণে মানুষের ঘর করতো তখন—স্বামী তাকে ডাঙার সংসারডোরে আটকে রাখবে বলে ঐ সীলমাছের মায়াচামড়াটা লুকিয়ে রাখতো। বেচারা স্বামী! শয়নে স্বপনে শঙ্খের ভিতর অবিরাম সমুদ্রসঙ্গীতের মতো সেল্কি নারীর হৃদয়ে শোঁ শোঁ করতো সমুদ্রের আহ্বান, কিছুতেই সেই তৃষ্ণা মিটতো না। একদিন বৌটি সীলের চামড়াটা খুঁজে পেলে ওটা পরে ঊর্ধ্বশ্বাসে চলে যেত জলে, আর কোনোদিন তাকে খুঁজে পাওয়া যেত না। সেল্কি জলপুরুষ ভারী রূপবান হতো। লোকালয় থেকে সমুদ্রে এসে মেয়েরা যদি সাত ফোঁটা অশ্রু সমুদ্রে ফেলতো- তখুনি উদয় হতো সেল্কি পুরুষ। তবে সেল্কি হলেও সে তো পুরুষ, অতএব মিলনোত্তর অশ্রুপাতের বৃহত্তর অধ্যায় শুরু হতো, সেল্কি তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে জলের তলায় নিয়ে মারতো। অবশ্য সেল্কি পুরুষ কখনো ডুবন্ত মানুষকে উদ্ধার করেছে এমনও শোনা যায়। অর্কনী দ্বীপের লোকে ফিনমেন আর ফিনওয়াইফে বিশ্বাস করতো। ফিনওয়াইফরা ছিল রূপবতী, মাথায় দীঘল কেশ, জলের তলায় চমৎকার বাগান করতো তারা (এখানে আমার মনে পড়ে গেলো- বেলিয়ায়েভের 'উভচর মানুষ' ইকথিয়ান্ডরের সমুদ্রের নিচে বসার ঘর আর বাগান সাজাবার কথা), মানুষ এদের কখনো জোর করে তুলে এনে বিয়ে করতো। ফিনমেন বা ফিনপুরুষরা অবশ্য কু-স্বভাবের, এরা জাহাজ ডোবাতো। স্কটিশ জলমানব কেল্পিকে ধরে তার রুপোর লাগাম খুলে নিলে সে ডাঙায় থাকতে বাধ্য হতো, মনিবকে বিয়েও করতো। আইরিশরা মেরো নামের একরকম কুশ্রী মৎস্যমানবে বিশ্বাস করতো, গায়ের চামড়া সবুজাভ, হাতপায়ের আঙুল হাঁসের আঙুলের মতো জুড়ে থাকা, মাথায় শৈবালদামের মতো সবুজ চুল আর লাল ক্যাপ...ওয়েলশরা একই মৎস্যমানবকে ডাকতো মুর্গা। লাল ক্যাপটা খোয়া গেলে এরা আর বরুণরাজ্যে ফেরত যেতে পারতো না। উনিশ শতকের আয়ারল্যান্ডে একবার এক স্থানীয় খবরের কাগজে এলো- ঝড়ের পর উপকূলে দুটি মেরো ধরা পড়েছে, একটি মারাত্মক আহত পুরুষ, অপরটি মৃত। আহতটিকে লোকে বাড়িতে এনে জলের পিপেয় ভরে রেখেছে- সে চিংড়িমাছ আর দুধ ছাড়া কিছু মুখে তুলছে না। তা আইরিশ মেরোরা নাকি অর্কনীজ ফিনওয়াইফদের মতোই মানুষের সংস্পর্শে আসতো, ছেলেমেয়েও হতো তাদের। পুরনো জার্মান লোককথায় আছে- এক মরণশীল মানুষকে ভালোবেসে জলকন্যা তার সন্তান প্রসব করেছিল বলে নিজের অমরত্ব হারিয়ে ফেলে সে, চিরযৌবনা থাকতে পারে না। পুরুষ প্রবৃত্তিবশে সেই নারীর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, নারী তাকে মনে করিয়ে দেয়- পুরুষ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে আজীবন প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে সে তাকে নতুন করে ভালোবাসবে, তারপর তাকে খুন করে। এমনিতে মৎস্যকন্যারা অমর ও চিরযৌবনা, শেটল্যান্ডের মৎস্যকন্যারা অবশ্য অমর ছিল না, মাথায় তাদের সুন্দর সবুজ কেশ, জোছনার রাতে ভেসে উঠতো জলের ওপর।
তারে যে দেখেছে সে মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে!
১৪৯৩এ ক্রিস্টোফার কলম্বাস অবশ্য অ্যাডমিরাল রিও ডেল অরোর দিকে যাবার সময় তিনটে মারমেইড দেখতে পেয়েছিলেন। মোটেই দেখতে ভালো নয়, ব্যাটাছেলের মতো চেহারা। আসলে ওসব সমুদ্রের তৃণভোজী প্রাণী- ম্যানাটী, কলম্বাস আগে দেখেননি। লোকটা বড্ড গোলমেলে, আমেরিকায় গিয়ে বলেন ওটা ভারতবর্ষ, সমুদ্রের স্তন্যপায়ীকে দেখে বলেন ওটা মৎস্যকন্যা! অবশ্য এরপরেও ডুগং বা সমুদ্রগাভীকে লোকে মৎস্যকন্যা বলে ভুল করেছে।
১৬১৯ সালে নরওয়ে থেকে ফিরবার পথে রাজা চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ানের দুই সভাসদের জাহাজে একটি জলমানব ওঠানো হয়। তা শুকনো ডেকে জলমানব আকুলিবিকুলি করছিল- সভাসদরা বলছিল- "স্রষ্টার কীর্তি কি মহান, যিনি জলের তলায়ও এমন মানুষ সৃষ্টি করে রেখেছেন!" মুমুর্ষু জলমানব বলেছিল- "এই মুহূর্তে যদি তুমি আমায় জলে ছেড়ে না দাও, তবে তুমি বা তোমার জাহাজ কেউ ডাঙা অব্দি পৌঁছবে না মনে রেখো!" ভেবে দেখুন, সেকালে জলপরী-জলমানবরা শুধু জালে ধরা পড়তো তাই নয়, তারা স্থানীয় লোকেদের ভাষায় কথাও কইতো। সতের শতকের হল্যান্ডে নাকি সত্যি ধরা পড়েছিল আহত মৎস্যকন্যা, শুশ্রূষার পর স্থানীয়দের কাছেই থেকে যায় সে। সেখানেই অনেক বাচ্চাকাচ্চা হয় তার। সে জমানায় প্রায়ই খবরের কাগজে এসব সমুদ্রচররা শিরোনাম হতো। একবার এক মৎস্যকন্যা শেটল্যান্ডের এক রাখালকে বিয়ে করে ডাঙায় থেকে গেছে- সে গোরু চরাতে গেছে। লোভী পড়শির দল তাকে কোণঠাসা করেছে- হয় গোরু দাও, নয় তোমায় দাও। অবশেষে মৎস্যকন্যা তার কোমরের মুক্তোর মেখলা খুলে দিয়ে পালিয়েছে- গিয়ে তার সবচেয়ে বড় ষাঁড়টার কানে শুধু বলেছে- মাটিতে মই দে বাছা! সেই ষাঁড় বেলাভূমির মাটিতে খুর দাবিয়ে এমন মায়াঝড় তুলেছে যে ধুলোয় ঢেকে গেছে জনপদ। পড়শির দল প্রাণ নিয়ে বেঁচে ঘরে ফিরে দ্যাখে- মেখলার মণিমুক্তো কিছুই নেই—ফঙ্গবেনে জিনিস।
কলম্বাস না হয় আগের জমানার লোক, ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়াতে ফেরি পারাপারের সময় কিছু যাত্রী দেখতে পায়- পরপারে এক মৎস্যকন্যা বসে তারিয়ে তারিয়ে কাঁচা কোহো স্যামন চিবিয়ে খাচ্ছে। বুকে কাপড় নেই। একমাথা রুপালি চুল। কিছুকাল আগে (২০০৭) জাপানীরা বলতে শুরু করলো- জাপানী জেলেনৌকো থেকে তারা তিমির মতো দীর্ঘ অথচ মানুষের মতো হাত-পা এমন নিঞ্জেনদের অ্যান্টার্কটিকার কাছে সাঁতরাতে দেখেছে। এর নাম দেয়া হলো- অ্যান্টার্কটিক মারমেইড।
ভুবনজোড়া আসনখানি
এক ভূখণ্ডের লোকের যখনই আরেক ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযোগ ঘটে, তখন অনেকগুলো ঘটনা ঘটে। অনাবিষ্কৃত আর রহস্যময় কৃষ্টি জন্ম দেয় মিথের। এক লোকাচার মেলে আরেক অভ্যাসে। মানুষে-মানুষে শুধু সংঘর্ষ আর সঙ্গম ঘটে না, দেবদেবীতেও ঘটে লেনদেন। তেমনি কাণ্ড হলো মৎস্যকন্যার বেলায়ও। পনেরো শতকের দিকে ইউরোপীয়দের সঙ্গে পশ্চিম আফ্রিকী যোগাযোগ স্থাপিত হবার সময় পুর্ব-পশ্চিম-দক্ষিণ আফ্রিকার লোকসাহিত্যে এক মৎস্যকন্যা দেবীরূপে আবির্ভূত হলেন- কোমরে জড়ানো সাপ, দীর্ঘকেশিনী বাদামীবর্ণা নারী, কখনো হাতে আরশি আর কাঁকই। তাঁর নাম মামি ওয়াতা (জলমাতা), ট্রান্স-আটলান্টিক ক্রীতদাসপ্রথার কারণে তিনি ছড়িয়ে পড়লেন ক্যারিবীয়-ব্রাজিলীয়-উত্তর আমেরিকীয়দের ভিতর। একদিকে তিনি সম্পদ সম্ভার আর উর্বরতার প্রতীক- আরেকদিকে ধ্বংসের। ভুডু সংস্কৃতির সঙ্গে ইউরোপীয় সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন। জলে যে পুরুষ নামে, তরী বায় অথবা বালুকাবেলায় চরে বেড়ায়—তিনি তাদের সমুদ্রতলার জগতে নিয়ে আসেন। কখনো মানুষ দেখলে ত্বরিত নেমে যান জলে, ফেলে আসেন হাতের আয়না-চিরুনি। তারপর স্বপ্নে এসে দাবী করেন সেই আয়না আর চিরুনি। যদি পুরুষ তা ফিরিয়ে দেয় তবে তিনি তাকে ধনদৌলত দেন, আর না ফিরিয়ে দিলে দেন দুর্ভাগ্য আর মৃত্যু। খেয়ালের বশে কখনো মানুষের সমাজেও সুন্দরী কন্যার বেশে তিনি ঘুরে বেড়ান। জল আর জলচরী রূপসী...এই তাঁর চিহ্ন।
জেকব গ্রিম (গ্রিম ভ্রার্তৃদ্বয়ের বড়জন) বের করেছিলেন আরেক সংযোগসূত্র, ইংরেজ আর জার্মান দুই যুযুধান জাত একই ওয়াটার-স্পিরিট বা জলের আলেয়াতে বিশ্বাস করত। ইংরেজ তাকে ডাকে শেলীকোট, জার্মান ডাকে শেলেনরক। এদের দুষ্ট স্বভাব, ছিঁচকে বদমায়েসি করতে ওস্তাদ। মাথার লম্বা চুলে সমুদ্রের হাবিজাবি ভাসমান ময়লা জড়ানো। ঝিনুকের পিরান গায়ে ঘুরে বেড়াতো- ঝুনঝুন করে শব্দ হতো তাতে। ডুবন্ত মানুষের বাঁচার আহাজারি করতো এরা, তারপর লোকজন ডুবন্ত মানুষকে বাঁচাতে ছুটে এলে ঠা ঠা করে হেসে অদৃশ্য হয়ে যেত। ফারো আইল্যান্ডের মৎস্যকন্যারা ধরতো ঘোড়ার বেশ, যে সেই ঘোড়সওয়ার হতে চাইবে তাকে সেই দরিয়ার শাদা তাজী সমুদ্রে চুবিয়ে মারবে; বৃটিশ-আইরিশ-স্কটিশ-ওয়েলস লোককথার কেল্পিদের সঙ্গে তাদের কি ভীষণ মিল। কেল্পিরা মনুষ্যমূর্তি ধারণ করলেও তাদের অশ্বখুর বজায় থাকতো- এটা পড়বার পর মনে পড়েছিল শৈশবে এক কোচোয়ানের গল্প শুনেছিলাম- সারারাত ঘোড়ার গাড়ি চালাবার পর যে ভাড়া নেবার সময় হাত বাড়িয়ে দিলে দেখা গেল- ওখানে খুর।
স্তব্ধচিত্তে শুনেছিনু গর্জন তোমার
মৎস্যকন্যা সাহিত্যের কোথায় নেই! ক্লেমেন্স ব্রেন্টানোর আর গ্যেটের ব্যালাডে- হাইনরিখ হাইনে আর টেনিসনের কবিতায়- অস্কার ওয়াইল্ডের রূপকথায়- মধ্যযুগের আলিফ লায়লা ওয়া লায়লায়। তের শতকের জাকারিয়া আল-কাজউইনির আজাইব আল-মাখলুকাত ওয়া গারাইব আল-মাওজুদাত নামক বিশ্বকোষে ইনসান আল-মা (জলমানব) উল্লেখিত আছে- বাগদাদের খলিফার দরবারে একবার এক জলপরীকে আনা হয়, চাঁদের মতো মুখ আর লম্বা চুল তার, এক মরমানুষের সঙ্গেই তাকে বিয়ে দেয়া হয়, সেই ঘরে সন্তানও হয়। উনিশ শতকীয় মৎস্যকন্যা পেল এক আশ্চর্য স্রষ্টা পিতার সন্ধান, তাঁর নাম হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন, গল্পের নাম- 'লিটল মারমেইড'। সর্বনাশী কামাতুরা মৎস্যনারী নয়, কমনীয়-বিষণ্ন-নিরুপায়-প্রেমময়ী নারী সে, শৈশবপাঠ্য হাসিখুশি সব কাহিনীর ভিতর একফোঁটা লোনাজল। ডাইনির কাছে গিয়ে জিভের বদলে পা পেলো সে, মরমানুষের দুনিয়াতে প্রিয়পুরুষের সান্নিধ্যেও এলো, কিন্তু প্রেম পেল না। ক্লেয়ার ব্লুম তাঁর স্মৃতিকথায় সেই গল্প শুনে ব্যথিত হবার কথা শোনান। অ্যালিস মানরো কিন্তু এতোই ব্যথিত হন- যে তিনি মৎস্যকন্যার গল্পে নতুন সমাপ্তি লেখেন, সুখসমাপ্তি। ওয়াইল্ডের 'দ্য ফিশারম্যান অ্যান্ড হিজ সোল' ব্যক্তিগতভাবে আমার ভারী প্রিয়। জেলের জালে ধরা পড়েছিল মৎস্যকন্যা- কথা দিয়েছিল সমুদ্রের মাছ থরে থরে এনে দেবে তাকে। এদিকে জেলে প্রেমে পড়লো তার, কিন্তু মানুষের আত্মা নিয়ে তো আর জলের রাজ্যে বাস করা যাবে না, মৎস্যকন্যারা যে আত্মাহীন। ডাইনির ছুরি দিয়ে গোড়ালির পেছন থেকে ছায়া কেটে ফেললো জেলে, আত্মা কত অনুনয়বিনয় করলো- প্রেমিকপুরুষ শুনলে তো! বছর যায়- হৃদয়হীন সেই আত্মা বারবার এসে জেলেকে প্রলুব্ধ করে- একবার তাকে শরীরে ফিরিয়ে নেয়া হোক, জ্ঞানমুকুর এনে দেবে তাকে, জেলে বলে- প্রেম শ্রেয়। পরের বছর আত্মা লোভ দেখায় জাদুর আংটির, জেলে রাজি হয় না। তৃতীয় বছর আত্মা বলে- চলো সরাইখানার এক নর্তকী এসেছে- পা প্রায় মাটিতে পড়ে না এমন করে নাচে! এবার জেলে রাজি হলো, তার জলকুমারীর যে নৃত্যপর পা নেই। মনে পড়ে বেলিয়ায়েভের উভচরমানব ইকথিয়ান্ডরকে, তার প্রেমে পড়েনি এমন কিশোরী আমি দেখিনি। রবীন্দ্রনাথের 'পরীর পরিচয়' গল্পটার কথাও মনে পড়ে—উদাসঝোরার পার থেকে কাজরীকে রাজপুত্র জলপরী ভেবে সংগ্রহ করে আনে- দিন যায়, পরী তো আর স্বমূর্তিতে ধরা দেয় না! একদিন কাজরী চলে যায়, রাজপুত্র ভাবে- চলে গিয়ে পরী তার আপন পরিচয় দিয়ে গেছে।
ডাইনিরা আধুনিক সাহিত্যে আর ভয়ানক ডাকিনী নয়, বিদ্যাবতী শক্তিমতি নারী; ঠিক তেমনি মৎস্যকন্যারাও আর স্বৈরিণী সর্বনাশিনী নয়। পাবলো নেরুদার পথভোলা মৎস্যকন্যা একালে সত্য, মাতালদের থুতু তার টোপাজের মতো উজ্জ্বল মাংসে লাগে না, সে বসন চেনে না বলে নির্বসনা, দুঃখ জানে না বলে অশ্রুহীন, চোখে তার দূরায়ত প্রেমের রঙ, সে এমনি এসে ভেসে যায়। ইমোজেন হার্মিস গাওয়ারের উপন্যাসে (দ্য মারমেইড অ্যান্ড মিসেস হ্যানকক) জর্জিয়ান ইংল্যান্ডের এক ব্যাবসায়ী জাহাজের বদলে এক মৃতা মৎস্যকন্যাকে পায়। একই বছর কার্স্টি লোকান লেখেন 'দ্য গ্লোমিং'। ২০১৮তে মেলিসা ব্রডার নিয়ে আসেন মৎস্যমানবের কাহিনী (দ্য পিসেস)। রিভার সলোমন (দ্য ডিপ) এবং মনিক রোফে (দ্য মারমেইড অভ ব্ল্যাক কঞ্চ) লোককথার মৎস্যকন্যাকে দেখেছেন নতুন আলোয়। রিভার সলোমন দাসব্যবসায়ীদের জাহাজ থেকে আটলান্টিক মহাসাগরে ছুড়ে ফেলা গর্ভবতী ক্রীতদাসীদের সঙ্গে জলমানবদের সম্পর্ক থেকে একটি আলাদা প্রজন্ম সৃষ্টি করেছেন, নাম তাদের ওয়াজিনরু। গর্ভে যারা জলীয় আহার গ্রহণ করে, নোনাজলে তারা বাঁচতে পারবে না কেন? মনিক রোফের মৎস্যকন্যা আইকায়্যা শতবর্ষী রূপসী অভিশপ্ত নারী, আদিবাসীদের মতো সে গাছপালা-পশুপাখির ভাষা বোঝে। পুরুষের সঙ্গীতে মুগ্ধ হয়ে সে কাছে আসে।
কিসের অশান্তি এই মহাপারাবারে
আল-কাজউইনির ইনসান আল-মা তথা জলমানবী ১৮ শতকের যে ভারতীয় প্রতিলিপিতে অঙ্কিত আছে- সেখানে সে অর্ধেক মাছ অর্ধেক নারী নয়- বরং বিশাল এক মাছের পিঠে আসীন যেন, গলায় শালুকের মালা, চুলগুলো দুহাতে উঁচু করে ধরা। মধ্যযুগ থেকে ইউরোপীয় পেন্টিং-এ পক্ষিণী সাইরেন ল্যাজাযুক্ত নারীতে বিবর্তিত হতে থাকলেন, রেনেসাঁ আমলে সেই বিবর্তন সম্পুর্ণ হলো—সাগরজলে সিনান করে উপল উপকূলে বসে থাকাই হলো মুক্তবক্ষা মৎস্যকন্যাদের মোদ্দা কাজ। প্রির্যাফায়ালাইট ওয়াটারহাউজের মৎস্যকন্যা ও সাইরেন লালচুলো, বিষাদময়ী। হারবার্ট জেমস ড্রেপার অডিসিউস আর সাইরেনদের দুর্দান্ত নাটকীয় ছবি এঁকেছিলেন। হাওয়ার্ড পাইলের অসম্পূর্ণ মৎস্যকন্যা (১৯১০) মোহাচ্ছন্ন জেলেকে টেনে নিচ্ছে সফেন সমুদ্রে। হোকুসাইয়ের 'দ্য ড্রিম অভ দ্য ফিশারম্যানস ওয়াইফ'-এর আশ্লেষমগ্না জেলেনীকে মনে পড়ে গেল এখানে, নির্লজ্জ স্বৈর বিভোর নারী, "ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে"র দিন ফুরিয়েছে কবে!
সিনেমার মৎস্যকন্যার কথায় মনে পড়ছে- আশির দশকে টম হ্যাঙ্কসের একটা মুভি এসেছিল- 'স্প্ল্যাশ', নব্বইয়ে 'দ্য সিক্রেট অভ রোয়ান ইনিশ'; ২০০৪ এ 'হোয়েল রাইডার' ঠিক মৎস্যকন্যার গল্প নয়- তবে আধুনিক মৎস্যকন্যার পুরুষতন্ত্রবিরোধী উত্থানের সঙ্গে এর ভারী আত্মার যোগ; 'সং অভ দ্য সী' (২০১৪) গা-ছমছমে সুন্দর। মৎস্যমানব নিয়ে একটি অসামান্য কাজ 'দ্য শেপ অভ ওয়াটার', চমৎকার লেগেছিল দেখে।
মৎস্যকন্যা/পুত্র সন্দেহে বিকলাঙ্গ শিশু আর রোগিনীর উপর অত্যাচারের গল্পও আছে অসংখ্য। উনিশ শতকের মাইকেল ক্লিয়ারির ঘটনা মনে পড়ছে এখানে, অসুস্থ স্ত্রী ব্রিজেতকে পরী-তাড়িত ভেবে যে পুড়িয়ে ফেলেছিল—পরে ঘটনাটি আইরিশ রাইমসেও স্থান পায়। প্রি-ফেমিনিস্ট জমানার সাইরেন থেকে করুণ শঙ্খমালা হয়ে জেলের বাথটাবে নিজের লেজ খসিয়ে ফেলা রোফের আধুনিক মৎস্যকন্যার যে যাত্রা, তা বাসনা-পুতুল হবার অভিশাপ খসিয়ে ফেলার যাত্রা, নারীচরিতের বিবর্তন।