মহামারি মোকাবিলায় ব্যর্থতা যে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে মোদি সরকারকে
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ও সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত এখন বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের নতুন হটস্পট। ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ভারতভূমিতে গত এক সপ্তাহ যাবত প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি মানুষের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। গত চারদিনে তা ছাড়িয়েছে সাড়ে তিন হাজারের সীমা। এসময়ে দেশটিতে প্রতিদিনই প্রাণঘাতি এই ভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষের দেহে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অনেকটাই ভেঙে পড়ায় মৃত্যু আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে ভারতের কোভিড হাসপাতালগুলোর পরিবেশ। আর পুরো বিষয়টি মোদি সরকারের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, দক্ষতা ও সুনামের ভিতকে দেশে ও বিদেশে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গতবছর মহামারির প্রথম ধাক্কায় সারা বিশ্বের মতোই ভারতের অর্থনীতিও যে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতির মধ্য দিয়ে গেছে, তা কোনো রকমে সামলিয়ে উঠতে পারলেও মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবকাঠামোগত ত্রুটিকে জনসম্মুখে স্পষ্ট করে দিয়েছে। হাসপাতালে জায়গা সংকট, অক্সিজেনের অভাব, অপ্রতুল চিকিৎসা সামগ্রী এসব কিছুই মোদি সরকারের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতিহীনতাকেই নির্দেশ করছে। স্বাধীনতার পর এটিই সম্ভবত ভারতীয়দের সামনে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়। আর এই সংকটের সিংহভাগ দায় জনগণ মোদির সরকারের উপরেই দিচ্ছে। কেনোনা সরকারের একের পর এক অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত দেশটিকে আজ এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন করছে।
গতমাসেই দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন ঘোষণা দিয়েছিলেন, ভারতে করোনা মহামারী প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। অথচ তার ঠিক একমাসের মাথায় প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ মানুষের নতুন করে আক্রান্ত হওয়া শুরু হয় এবং মৃত্যুও ছাড়িয়ে যায় দেড় হাজারের উপরে। মহামারি পরিস্থিতিতেই গত ২৭ মার্চ পশ্চিমবঙ্গসহ মোট ৫ টি রাজ্যে শুরু হয়েছিলো নির্বাচন, যেখানে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮৬ মিলিয়ন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপি হাজার হাজার মানুষ নিয়ে তাদের সভা, প্রচারণা চালিয়েছে বিভিন্ন স্থানে।
এছাড়া বছরের শুরু থেকেই সরকার ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের উপর থেকে সকল বিধি-নিষেধ তুলে নেয়। এর ফলে উত্তরাখণ্ডের হরিদুয়ারে ১১ই মার্চ থেকে শুরু হওয়া কুম্ভমেলায় দশ হাজার হিন্দু পুণ্যার্থী অংশগ্রহণ করে। এরপরে কয়েক লাখ পুণ্যার্থী একত্রিত হয়েছে সপ্তাহব্যাপী এই মেলায়।
মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড প্রায় একলাখ ত্রিশ হাজার দর্শককে দুইটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ উপভোগ করার অনুমতি দেয়, যেখানে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। আবার এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় চলেছে আইপিএলের ক্রিকেট ম্যাচ। এত সব অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত এবং করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ধাক্কা সামাল দেয়ার কোনো শক্ত পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি না থাকায় বিজেপির পূর্বতন সমর্থকেরাও এবার ক্ষুব্ধ হয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে।
ভ্যাকসিন নিয়ে ব্যবসা করারও অভিযোগ এসেছে সরকারের উপর। দেশের চাহিদা পূরণ না করেই বিদেশে ভ্যাকসিন বিক্রয়ের জন্য দেশের মানুষ সরকারের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করছে। এছাড়া প্রথমে ভ্যাকসিন বিনামূল্যে দেয়ার ঘোষণা দিলেও পরবর্তিতে প্রতি ডোজ ভ্যাকসিনের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩০০ রুপি। এক সমীক্ষায় দেখানো হয়, মোট জনসংখ্যার ৬০-৬৫ শতাংশ (১৮ বছরের বেশি) অর্থ্যাৎ ৮০০ মিলিয়ন মানুষ ভ্যাকসিন নেয়ার যোগ্য। সে হিসেবে ১৬০০ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন ৩০০ রুপি করে মোট খরচ দেখানো হয় ৪৮০০ কোটি রুপি, যা ভারতের মোট জিডিপির মাত্র ০.৩২ শতাংশ। অথচ সরকার এই অর্থের যোগান সময়মত ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউটকে না দেওয়ায় অর্থ সংকটে পড়ে অনেক অঞ্চলে ভ্যাকসিন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
ব্যাপক জনপ্রিয়তার পরেও মোদি সরকারের বিরুদ্ধে পূর্বেই ব্যবসায়ী-বান্ধব নীতি প্রণয়নের অভিযোগ ছিলো, যা ভ্যাকসিন পলিসি আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।
ভারতের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই হিন্দু। হিন্দু জাতীয়তাবাদী কট্টরপন্থী নেতা নরেন্দ্র মোদি মূলত ধর্মকে কাজে লাগিয়েছেন তার প্রতিবারের নির্বাচনী প্রচারণায়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, নতুন কৃষি আইন, জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল, চীন-ভারত দ্বন্দ্বে গালওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় সেনাদের মৃত্যু, নেপালের সঙ্গে সীমান্ত দ্বন্দ্ব, কোভিড-১৯ এর প্রথম ধাক্কায় ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি, বেকারত্ব বৃদ্ধি, নিম্নগামী জিডিপি এত সবকিছুর পরেও ভারতের জনগণ মোদি সরকারকে ধর্মীয় আবেগের জায়গা থেকে সমর্থন দিয়ে আসছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় ধাক্কা সব তছনছ করে দিয়েছে।
হাসপাতালগুলোয় জায়গা সংকটের ফলে বড় বড় মন্দির, মসজিদে তৈরি হয়েছে সাময়িক চিকিৎসা কেন্দ্র। অক্সিজেনের তীব্র সংকটে চির প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ পাকিস্তান পর্যন্ত পাঠিয়েছে সাহায্য। বাংলাদেশও জরুরি ঔষধ ও চিকিৎসা উপকরণ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
২৮ টি প্রদেশ ও ৮ টি ইউনিয়ন অঞ্চলের মধ্যে মহারাষ্ট্র ও দিল্লির অবস্থা সবচেয়ে বেশি শোচনীয়। সরকার দিল্লিতে প্রতিদিন ৪৮০ টন অক্সিজেন সরবরাহের ঘোষণা দিলেও সেটা এখনও কার্যকর করতে পারেনি। ৩৮০ বা কখনও মাত্র ৩০০ টন অক্সিজেন সরবরাহ হচ্ছে দৈনিক। ফলে অক্সিজেনের অভাবে হাসপাতালগুলোয় চলছে হাহাকার। গত সপ্তাহে মহারাষ্ট্রে অক্সিজেনের অভাবে ২২ জন এবং গুজরাটে ২ জন রোগী মারা যাওয়ার সংবাদ দেশে বিদেশে মোদি সরকারকে আরও বেশি নিন্দনীয় করে তুলেছে।
এমনকি অক্সিজেন নিয়ে বিভিন্ন রাজ্য সরকারের মধ্যেও শুরু হয়েছে দ্বন্দ্ব। হরিয়ানা প্রদেশের এক মন্ত্রী দিল্লির সরকারের বিরুদ্ধে তার প্রদেশের অক্সিজেনের চালান রাস্তা থেকে চুরির অভিযোগ করেন। তিনি পরবর্তিতে অক্সিজেন সরবরাহের ট্রাকে পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন, যেনো রাস্তা থেকে অন্য প্রদেশ কর্তৃক অক্সিজেন চুরির ঘটনা আর না ঘটে। ভাবা যায় কতটা দুরবস্থা হলে একই দেশের দুই প্রদেশের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে!
সরকার মৃত্যুর সংখ্যা লুকাচ্ছে এমন অভিযোগও উঠেছে। টাইমস নাউ এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্য প্রদেশের একটি কবরস্থানে একদিনে ৯৪ টি লাশ দাফন করা হয়েছিল । কিন্তু ঐদিন সরকারি হিসাবে সেখানে মৃতের সংখ্যা দেখানো হয় মাত্র তিনজন।
এসব ঘটনা জনগণের মনে সরকারের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড রকম অসন্তোষ তৈরি করেছে এবং ভারতের অবস্থা বিবেচনায় বলা যায়, এই অসন্তোষের ধারা সামনে আরও মারাত্মক হতে পারে। কারণ ভারত এখন করোনার দ্বিতীয় ধাক্কার প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে ভারতবাসীকে আরও কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হবে সেটা জানার জন্য আরও বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এরপরে আবার আছে তৃতীয় ধাক্কা সামলানোর প্রস্তুতি। সেখানে মোদি সরকার তার ভুলগুলো শুধরে কতটা যৌক্তিক পরিকল্পনা ও শক্ত প্রস্তুতি নিতে পারে সেটার উপরেও সরকারে ভাবমূর্তি আগের অবস্থায় ফিরে আসা নির্ভর করবে।
হিন্দু জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে টানা দুইবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া বিজেপির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্তদের মাঝে। মূলত এই শ্রেণীর ভোটই বিজেপির ক্ষমতায় আসার পিছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু করোনা মহামারি মহারাষ্ট্র ও দিল্লিতে সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে এই শ্রেণীর উপরেই। তাই বলার অপেক্ষা রাখেনা পরবর্তিতে বিজেপির নিজের গদি বাঁচাতে হলে এখনই নড়েচড়ে বসতে হবে। কেনোনা সামনের দিনগুলো নিঃসন্দেহে মোদি সরকারের জন্য আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং।
- লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- ইমেইল: trisha.jannat1112@gmail.com
