করোনা, বন্যায় উত্তরাঞ্চলের মানুষের ঈদ নেই!
''কোরবানি-তো দূরের কথা, জীবনেও ভাবতে পারি নাই- আমাদের রাস্তায় ঈদ করতে হবে। বাড়িতে ধরলা নদীর বন্যার পানি ঢোকাতে আজ প্রায় একমাস যাবৎ কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কের পাশে পলিথিনের ছাউনির নিচে পরিবারসহ বসবাস করছি। বাড়িতে এখনও এক কোমর পানি। একবেলা খাই তো আর একবেলা খাবার নাই''- কথাগুলো অতিদুঃখের সঙ্গে বলছিলেন আজ (১ আগস্ট) চরমাধবরাম গ্রামের ফাতেমা বেগম। কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কের পাশে পলিথিন ছাউনির নিচে বসে আছেন অসহায় ভাবে পঞ্চান্ন বছর বয়সী ফাতেমা বেগম, তার বাড়ি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের।
কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কের পাশে ফাতেমা বেগমের মতো এরকম অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছে প্রায় শতাধিক পরিবার। তাদের সবার অবস্থা একই। তারা কেউই এবার কোরবানিতে অংশ নিতে পারে নাই। শেষ বেলা পর্যন্ত কেউ কোরবানির মাংস দিবে কি-না তাও জানা নাই।
এই মহাসড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছেন, একই চরমাধবরাম গ্রামের ছত্রিশ বছর বয়সী হাইনুল ইসলাম, তিনি জানান, 'আমি একজন কসমেটিক ফেরিওয়ালা, গ্রামে গ্রামে ঘুরে ফেরি করে বিভিন্ন কসমেটিক সামগ্রী বিক্রি করি, তাই দিয়েই সংসার চালাই। একে করোনা আতংক, তার ওপর আবার এই বন্যা। মালামাল বিক্রি তো দুরের কথা, কোনো বাড়িওয়ারা তার বাড়ির কারো কাছে বসতেও দেয় না। এবার আমার পরিবারে ঈদ বলতে কিছু নাই। মাংস তো দুরের কথা ভালোমত খেতেও পাচ্ছি না।'
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের উত্তর নওয়াবশ (ছড়ারপাড়) গ্রামের আব্দুল কাদের (৬০) জানান, 'প্রায় একমাস যাবৎ বন্যায় পানিবন্দি। গ্রামের জামে-মসজিদটিতে বন্যার পানি ওঠে নাই। নৌকা দিয়ে যেয়ে ঈদের নামাজ পড়ে এসেছি। গ্রামের বাড়িগুলোতে এখনও এক কোমর পানি। আমার গ্রামে প্রায় একহাজার লোকের বাস। এবার পানিবন্দি থাকায় আমরা কোরবানি দিতে পারি নাই। কোনো রকমে আমি নৌকা চালিয়ে জীবন চালাচ্ছি। আজ ঈদের দিন পেটের দায়ে নৌকা নিয়ে বের হয়েছি, দেখি কয় টাকা পাই।'
কুড়িগ্রাম জেলায় প্রায় চার শতাধিক চর এবং নিন্মাঞ্চল বন্যায় আক্রান্ত হওয়ায়, প্রায় তিন শতাধিক লোক একমাস যাবৎ বন্যায় দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে প্রায় ২,৫২,৫২০ জন লোক নদী ভাঙ্গন ও পানিবন্দির শিকার হয়েছে এবং জেলায় ৬৪ টি আশ্রয়কেন্দ্র ও বিভিন্ন বাঁধে আশ্রয় গ্রহনকারী বন্যাকবলিত পরিবারের সংখ্যা ১,১৬০। বন্যাকবলিত প্রায় সবাই এবার নিরানন্দ ঈদ পালন করছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দেরওয়ার হোসেন জানান, 'আমার ইউনিয়নে প্রায় ৪৫ হাজার পরিবারের বাস। এবারের বন্যায় এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার পরিবার বন্যাকবলিত। এরা যে যেখানে পেরেছে কোনো রকমে ঈদের নামাজ আদায় করেছে। সর্বত্র বন্যার পানি বিরাজ করায় অধিকাংশ কোরবানি দেওয়া সামর্থবানরা এবার কোরবানি দিতে পারে নাই। আর গরীব লোকের তো প্রশ্নই ওঠে না।'
কুড়িগ্রামে বন্যার দুর্ভোগ এখনও শেষ হয়নি।পানি কিছুটা কমে ছিল, কিন্তু আবার ভারি বর্ষণ আর ভারত থেকে নেমে আসা উজানি ঢলের কারণে জেলার সব নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে এবং তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হতে প্রাপ্ত অনুযায়ী- আজ (১ আগস্ট) দুপুর ১২ টায় গত ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ধরলা ব্রিজ পয়েন্টে ধরলার পানি ১০ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪৬ সে.মি. ওপর দিয়ে, সদর উপজেলার নুনখাওয়া পয়েন্টে দুধকুমারের পানি ১৭ বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩ সে.মি. ওপর দিয়ে এবং এবং চিলমারী উপজেলার চিলমারী ঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ১২ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৭ সে.মি. ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া, রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার কাউনিয়া ঘাট পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি ২৪ ঘন্টায় ১ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২২ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
'গত বছর ১৩ হাজার টাকা দিয়ে ভাগে কোরবানি করেছিলাম, এবার আশা ছিলো একাই একটি গরু দেবো কিন্ত তা হয়নি, বন্যার কারনে,' বললেন কৃষক মো: আনিস সরকার।
সাম্প্রতিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত উত্তরের আরেকটি জেলা- বগুড়া। সেখানেও, মহামারির মাঝে জনজীবন থেকে ঈদের খুশি কেড়েছে বন্যা।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার 'পাকের দহ' গ্রামের চাষী মো: আনিস সরদার আশা করেছিলেন, ৯ বিঘা জমির পাট থেকে যে আয় হবে- তা দিয়েই তিনি এবার গরু কোরবানি করবেন। কিন্ত বন্যায় সব পাট নষ্ট হওয়ায়, তার সে আশা আর পূরন হয়নি।
'গ্রামে, শরিকদের মধ্যে যারা কোরবানি করেছেন, তারা মাংস দিলেই ৪ সদস্যের পরিবারে মাংস খাওয়া হবে,' জানান তিনি।
বন্যাদুর্গত সারিয়াকান্দি উপজেলার কাজলা ইউনিয়নে সাড়ে ৫ হাজার পরিবার থাকলে এবার কোরবানি দিয়েছে ৩শ' পরিবার; জানালেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রাশেদ সরকার।
তিনি জানান, বন্যার কারনে কাজলা ইউনিয়নের প্রায় পুরোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে আছেন প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। এদের মধ্যে যারা গত বছর গরু কোরবানি করেছেন তাদের অনেকেরই অবস্থা এবার মো: আনিস সরকারের মতোই।
একই উপজেলার চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নেও অনেক মানুষ এবার কোরবানি দিতে পারেননি- বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায়। আর্থিক সংকটে থাকা প্রায় ৫ হাজার পরিবারের অনেকের ঘরে এখনো পানি আছে। কোরবানি দেয়া তো দূরের কথা- এলাকার মানুষ মাংস দিলে তা রান্না করে খাওয়াও কঠিন হবে।
'গত বছর বাড়িতে পোষা একটি ছাগল কোরবানি করেছিলাম আর এবার ভাগে গরু দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্ত তা হয়নি, বানে ফসল নষ্ট হওয়ায়,' বললেন চাষী মোয়াজ্জেম হোসেন ব্যাপারী।
চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের গ্রাম পাঁচগাছি। এ গ্রামে এবার কোরবানি হয়েছে মাত্র ৫/৬টি পরিবারে- জানালেন মোয়াজ্জেম। কিন্তু ওই গ্রামে আছে অন্তত ১শ' পরিবার।
ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো: শওকত আলী জানান, ৪৮শ' পরিবারের মধ্যে কোরবানি করতেই পারেনি অন্তত ২ হাজার ৯শ' পরিবার। এসব পরিবারের অধিকাংশ মানুষই খুশির এ দিনে চেয়ে থাকবেন প্রতিবেশিদের দিকে।
সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে, বন্যায় এবার বগুড়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে- প্রায় ৩২ হাজার পরিবারের দেড় লাখ মানুষ।
বাধে, স্কুলে, আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষের আনন্দে ঈদ উদযাপনের অবস্থা নেই।
