এসএমএপি ঋণে দারিদ্র্য ঠেলে নতুন জীবনে পাঁচ লাখ কৃষক পরিবার
পাবনার চাটমোরের দারিদ্র আজিজুল হকের সঙ্গে বিয়ে হয় সালমা খাতুনের। অন্যের জমিতে কাজ করা আজিজুলের সম্বল বলতে দৈনিক মজুরি ছাড়া কিছু পাননি সালমা। অভাবের সংসারে দুই সন্তান জন্ম নেওয়ার পর চোখে সরষে ফুল দেখেন তিনি।
প্রতিবেশির পরামর্শে ২০১৬ সালে সিদীপ নামে একটি এনজিও থেকে ৪০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ নিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন সালমা খাতুন। মাত্র পাঁচ বছরে শূন্য থেকে ২৩টি গরুর মালিক সালমা। রয়েছে কৃষি খামারও। সিদীপের সদস্য হওয়ার মাধ্যমে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তায় স্বাবলম্বী হয়ে এখন গ্রামের উদাহরণ তিনি।
শুধু সালমা কিংবা নাসিমা নয় কৃষি কাজে এমন ভাগ্য বদলের গল্প প্রায় ৫ লাখ কৃষক পরিবারের। এসএমএপি থেকে ঋণ নিয়ে জীবন পাল্টিয়েছেন ৪ লাখ ৮৪ হাজার কৃষক। এক সময় অভাবে ধুকতে থাকা মানুষগুলো এখন ভোরের আলো ফোটার আগেই লেগে যান জমিতে ফসল ফলাতে। কৃষিকাজ ছাড়াও জলাশয়ে মাছচাষে, গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি পোষা, নকশিকাঁথার শৈল্পিক কারুকাজে ও ইমারত বানানোর মতো কাজও করছেন তারা। এখন আর কারো অনুকম্পার ধার ধারে না তারা।
সালমা খাতুন তার কাজের ব্যাপারে জানান, প্রতি সপ্তাহে তার গাভীর দুধ বিক্রি থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। এবার ঈদে ৪ টি ষাঁড় গরু বিক্রি করে ৫,৫০ লাখ টাকা আয় করেন তিনি।
সিদীপের উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা জাহিদ হাসান বলেন, জাপানী দাতা সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্বাবধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্মল অ্যান্ড মার্জিনাল সাইজড ফার্মারস এগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টিভিটি ইমপ্রোভমেন্ট অ্যান্ড ডাইভার্সিফিকেশন ফাইন্যান্সিং (এসএমএপি)প্রজেক্ট থেকে ঋণ নিয়ে ভাগ্য বদলেছেন সালমা খাতুন।
তিনি বলেন, "এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালে সাপ্তাহিক কিস্তিতে প্রথমে ৪০,০০০ টাকা জাগরণ ঋণ এবং পরে ছয় মাসের কিস্তিতে আরও ১.৩ লাখ টাকা ঋণ নেন সালমা খাতুন। সব ঋণ পরিশোধ করে এখন তিনি নিজে একটি খামারের মালিক। হাস মুরগীসহ কৃষি কাজেও দারুণ সফল তিনি। এলাকার মানুষকে নিজেই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন এ নারী।"
বিয়ের পর নতুন সংসারে সালমা খাতুনের মতোই কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েন মুন্সিগঞ্জ সদরের শোল্লাপাড়ার নাছিমা বেগম। ভীষণ কষ্টে চলছিল নাছিমার সংসার। স্বামী মহিউদ্দিন সামান্য কয়েক শতক জমিতে চাষাবাদে নিয়মিত তিনবেলা খাবার জুটতো না।
এমএমএপির কার্যক্রম নতুন প্রাণ দেয় নাছিমার সংসারেও। ৫০ হাজার টাকার এসএমএপি ঋণ এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে গরু পালন ও চাষাবাদ শুরু করেন নাছিমা নিজে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে নাছিমার এখন ৩০টি গরু। দৈনিক ৫০-৬০ লিটার দুধ পান। কৃষি কাজ থেকেও মাসে ১০-১২ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করেন।
নাছিমা এখন পুরো এলাকার মানুষের কাছে এক প্রেরণার নাম। নিজের ও দেশের আর্থিক উন্নয়নের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
নিজের সাফল্য নিয়ে কিছু বলার অনুরোধ করলে এই প্রতিবেদকের কাছে তিনি বলেন, "সিদীপের এই ঋণ আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে। কষ্টকে জয় করে আমি এখন সবার আপা।"
প্রশিক্ষণ পেয়েছে ৬.১৪ লাখ কৃষক
এসএমএপি প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটের মো. আমজাদ হোসেন বলেন, প্রায় ৫ লাখ কৃষক পরিবারকে ঋণ সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে ৬ লাখ ১৪ হাজার কৃষককে। কৃষিকাজ, চাষাবাদ, পশু পালন, গরু মোটাতাজাকরণ ও পশুর স্বাস্থ্য চিকিৎসা বিষয়ে হাতে কলমে শিখেছেন এসব কৃষক। সারাদেশের প্রান্তিক কৃষকরা এ সুবিধা পেয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশের কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তার মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে ২০১৪ সালে প্রকল্পটি হাতে নেয় জাইকা। ২০১৫ সালের শেষ দিকে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে সিদীপ, আশা, সাজেদা ফাউন্ডেশন, উদ্দীপন, বার্কসহ মোট ১১টি মাইক্রো ফিন্যান্স প্রতিষ্ঠানের দুই হাজার শাখার মাধ্যমে কাজ পরিচালনা হয়েছে।
২০১৫ সালে ৬০০ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে শুরু হয় প্রকল্প থেকে পূনস্কিম ও রিফাইন্যান্সিসিংয়ের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ঋণ বিতরণ ২৩৯১ কোটি টাকা। ২০২৯ সাল পর্যন্ত তা ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে বলে আশাবাদী প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের।
প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা বলেন, জাইকার মাত্র ০.০১ শতাংশ সুদের এ অর্থায়ন কৃষকদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশীয় এমএফএসগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রতিটি এমএফএসকে কৃষি কর্মকতা নিয়োগ দিতে হয়েছে। তাদের জন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে এসব কর্মকর্তাকে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্ট দেওয়া হয়েছে।
কম সুদ ও সহজ কিস্তিতে আগ্রহ
২০১০ সালে একটি মাইক্রোফাইন্যান্স থেকে ২৯ শতাংশ সুদহারে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন রাজশাহীর মোহনপুরের তফাজ্জল হোসেন। নিজের ২১০ একর জমিতে চাষাবাদ করার জন্য এ ঋণ নিলেও স্বাবলম্বী হওয়ার পরিবর্তে উল্টো ঋণের জালে জড়িয়েছেন তিনি।
প্রতি সপ্তাহে কিস্তি পরিশোধ ও উচ্চসুদের কারণে ২০ হাজার টাকার ঋন বেড়ে কয়েকগুণে উন্নীত হয়। প্রতি সপ্তাহে ঋণ পরিশোধে জমি বিক্রির উপক্রম হয় এই কৃষকের। এর মধ্যেই ২০১৮ সালের শুরুতে জাইকা-বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমএপি ঋণের সন্ধান পান তিনি।
১ লাখ টাকা ঋণের সঙ্গে উন্নত জাতের ধান ও আলু চাষের প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুন জীবন শুরু তফাজ্জলের। এই ঋণে ১৯ শতাংশ সুদ দিতে হলেও ৬ মাসের কিস্তি পরিশোধের সুযোগ ভাগ্য বদলে দেয় তার। হাইব্রিড আলু চাষ করে ফসল তুলে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেও ৫০ হাজার টাকার বেশি লাভ দেখেন তিনি।
তফাজ্জল হোসেন বলেন, এসএমএপি থেকে দুইবার ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করে সফল হয়েছি। আগের এনজিও ঋণও পরিশোধ করেছি। এখন নিজের হাতেই যথেষ্ট ক্যাপিটাল রয়েছে।
স্বল্প সুদ ও সহজ কিন্তির সুবিধায় ভাগ্য বদলেছে তফাজ্জলের মতোই চট্টগ্রামের পুরস্কার বিজয়ী রাশেদা বেগমের। চাষাবাদের পাশাপাশি তিনি এখন প্রশিক্ষকও।
তিনি বলেন, ১১০০০০ টাকা ঋণ নিয়ে ৩০ শতক জমি লিজ নিয়ে শিম চাষ শুরু করে চার বছরে আমি সব ঋণ পরিশোধ করেছি। সেরা সিম চাষি হিসাবে ২০২০ সালে পুরস্কারও জিতেছি।
প্রকল্প পরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, জাইকা থেকে কম সুদে এ আর্থি সহায়তা পেলেও সরকারের নির্দেশনা ও দেশীয় আইন-কানুনের কারণে চূড়ান্ত পর্যায়ে সুদহার ১৯ শতাংশ। সাধারণ মাইক্রো ফিন্যান্সে যা ২৭ শতাংশের ওপরে। তবে কৃষক পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ ফ্রি হওয়ায় অনেক লাভবান কৃষকরা। সবচেয়ে বেশি সুবিধা প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দেওয়া লাগছে না।
৮৩.৭ শতাংশই নারী
জাতীয় শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী কৃষিখাতে এখনো পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ কম। তবে ব্যতিক্রম জাইকা-বাংলাদেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমএটি প্রকল্প। এ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত প্রশিক্ষণ পাওয়া ৬.১৫ লাখ মানুষের ৮৩.৭ শতাংশ নারী। ঋণ সুবিধা নেওয়া নারীর হারও একই রকম।
প্রকল্পের উপ পরিচালক মোর্শেদ আলম বলেন, প্রকল্পে নারীদের অর্থায়নের মাধ্যমে তাদের শুধু স্বাবলম্বীই করা হয়নি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের দক্ষ করে গড়ে তুলা হয়েছে। গ্রামের গরীব পরিবারের অবহেলিত নারীরা এখন সম্মানের আসনে বসেছেন।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্রতামুক্তি ও খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে এসডিজির তিনটি লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়েছে বলেও জানান তিনি।
