উপহার দেওয়ার বেলায় কিছু মানুষ কেন এত আনাড়ি ?
উপহার দেওয়ার কাজটা খুব একটা সহজ নয়। অনেকেই মনে করেন, কিছু একটা কিনে নিয়ে গেলেই উপহারের দায়িত্ব সারা যায়। কিন্তু, ভালো উপহার দিতে হলে অনেক মনোযোগ দিয়ে ভাবনাচিন্তা করে উপহার বাছতে হয়। আপনি এমন উপহার দিলেন যে তা দেখে উপহার গ্রহণকারী আপনার সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করে ফেললেন- এমনটা ঘটা মোটেই বাঞ্চনীয় নয়। তারপরও অনেকেই উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেন না। কিছু লোক কেন উপহার দেওয়ায় এত ব্যর্থতার পরিচয় দেন, তা নিয়ে জানিয়েছে স্প্যানিশ গণমাধ্যম এল পাইস।
৩৯ বছর বয়সী রোসিও এখনো মনে করতে পারেন, তার শাশুড়ী একবার তাকে একটি স্পোর্টস জ্যাকেট দিয়েছিলেন। 'তিনি জানতেন আমি খেলাধুলা পছন্দ করি না,' হাসতে হাসতে বলেন রোশিও।
একই ঘটনা আদ্রিয়ানারও। ২৫ বছর বয়সে তার মা তাকে একটা প্রেশার কুকার দিয়েছিলেন। 'আমি তখন একা থাকতাম। অনেক ভ্রমণ করতাম। সবসময় বাইরে খাওয়া হতো। আমার দ্বারা তো ওই কুকারে কিছু রান্না করা সম্ভব ছিল না,' বলেন তিনি।
মায়ের কাছ থেকে এমন উপহার পেয়ে খুশির বদলে দুঃখ পেয়েছিলেন আদ্রিয়ানা। তার মনে হয়েছিল, তার মা হয় তার জীবনযাত্রার সমালোচনা করেছিলেন অথবা নিজের মেয়ের পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি নিয়ে তার কোনো ধারণা ছিল না। 'কোনটা যে বেশি বাজে, সেটা আমি জানি না,' বলেন বর্তমানে ৪০ বছর বয়সী আদ্রিয়ানা।
'একটা ভালো উপহার দিতে হলে আপনাকে ব্যক্তি সম্পর্কে, তার রুচিবোধ ও ইচ্ছা-অনিচ্ছা নিয়ে ধারণা রাখতে হবে,' ব্যাখ্যা করেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রোসিও মানরয়। ব্যাপারটা স্বাভাবিক মনে হলেও ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন ভার্জিনিয়া'র জন চেম্বারস কলেজ অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে– যারা উপহার দেন, তারা প্রায়ই যাকে দিচ্ছেন তার বিষয়ে চিন্তা না করে নিজের কথা আগে ভাবেন।
মনরয়ের মতে, অনেকে নিজেকে জাহির করার জন্য উপহার কেনেন। ফলে গ্রহীতার কথা ভাবেন না তারা। একজন 'নার্সিসিস্ট' ব্যক্তি এমন উপহার দিতে চাইবেন যা তাকে অন্য উপহারদাতাদের চেয়ে আলাদা করে তুলবে। অন্যদের চেয়ে নিজেকে শ্রেয় ভাবতে তারা বড় ও জাঁকালো উপহার খোঁজেন।
উপহার দেওয়ার সঙ্গে অনেক আবেগ জড়িত থাকে। 'উপহার দেওয়ার কাজটার সঙ্গে ভালোবাসা, সম্মান, প্রশংসা, স্বীকৃতি ইত্যাদি যুক্ত হয়ে পড়ে। সেজন্য উপহার বাছাটা অনেকের জন্য চাপের কাজ হয়ে পড়ে,' বলেন মনরয়।
আমাদের উপহার অন্যের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককেও প্রতিফলিত করে। আর এটিও চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 'কোনো ব্যক্তি যদি তার পাওয়া উপহারকে বেশি ছোট মনে করেন বা অপছন্দ করেন, তাহলে তার জেরে সম্পর্কও খারাপ হয়ে যেতে পারে'- সতর্ক করে দিয়ে বলেন মনরয়।
কিন্তু, সঠিক উপহার করতে পারে বিপরীত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি । এর ফল ব্যক্তির মধ্যে ইতিবাচক ও ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি হয়। তবে উপহার দিতে গিয়ে যাতে কারও পকেট গড়ের মাঠ হয়ে না যায়, সেদিকটাও মাথায় রাখার পরামর্শ দেন এ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট।
আর উপহার পাওয়ার পর, পছন্দ না হলে সে উপহার দেওয়ার তরিকা কী? মারিয়ানা ফার্নান্দেজ নামক একজন উপহার বিশেষজ্ঞ বলেন, অপছন্দের উপহার ফেলে না রেখে উপহারদাতাকে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করতে হবে সেটি বদলে দেওয়া যায় কিনা।
"আপনি একটু ব্যাখ্যাও দিতে পারেন। যেমন বলতে পারেন, 'আমার এটা পছন্দ হয়েছে, কিন্তু আমার জন্য জামাটা খুব ছোট হয়ে গেছে,' অথবা 'এটা খুব সুন্দর, কিন্তু আমার কাছে এরকম একটা আগে থেকেই আছে'। মূল বিষয়টি হলো, যিনি এত কষ্ট করে আমাদের জন্য উপহারের ব্যবস্থা করেছেন, তাকে কোনোভাবে অপমানিত বোধ করানো যাবে না," বলেন ফার্নান্দেজ।
উপহার দেওয়া প্রসঙ্গে মনে রাখার মতো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মোড়ক। যুক্তরাজ্যের একজন উপহার-মোড়ক বিশেষজ্ঞ জেন মিনসের মতে, মোড়ক পুরো হিসাবনিকাশ বদলে দিতে পারে।
'আমার ক্যারিয়ারে আমি এটা বুঝতে পেরেছি যে ছোট ছোট বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর প্রথমবারের ইমপ্রেসনও ভূমিকা রাখে। আপনি যখন যত্ন নিয়ে উপহারকে মোড়াবেন, ব্যক্তি তা খেয়াল করবেনই,' মিনস বলেন।
উপহারকে মোড়কে বাঁধাার জন্য কিছু পরামর্শও বাতলে দিয়েছেন জেন মিনস। ব্যক্তির পছন্দের রংয়ের মোড়ক, তাদের পছন্দের কোনো একটা ছোটখাটো বস্তুকে সেই মোড়কের ভেতর দিয়ে দেওয়া ইত্যাদি করলে উপহারের আনন্দ দ্বিগুণ ছড়াবে।
ফার্নান্দেজ বলেন, 'কারও জন্য সঠিক উপহার খুঁজে পাওয়ার চাবিকাঠি হলো নিজেকে ওই ব্যক্তির স্থানে কল্পনা করা। এক্ষেত্রে তাদের রুচির পাশাপাশি কোন পরিস্থিতিতে বা কী উপলক্ষে তারা উপহারটি পেতে যাচ্ছেন তাও চিন্তা করতে হবে।'
