করোনা মহামারির শেষ কোথায়?
গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের কিছু অংশ ও মধ্যপ্রাচ্যে করোনা সংক্রমণের হার কমে আসছিল। তার জেরে শিথিল করে দেওয়া হচ্ছিল ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাসহ নানান সামাজিক বিধিনিষেধ। বন্ধ থাকা ব্যবসা ফের চালু হচ্ছিল। কিন্তু জুলাইয়ে আমেরিকায় টিকা দেওয়ার গতি কমে আসে—সঙ্গে সঙ্গে দেশটিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে করোনার নতুন ধরন। বাধ্য হয়ে ফের মাস্ক পরার পরামর্শ দেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
২০২০ সালের ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯-কে মহামারি ঘোষণা করে। এরপর পেরিয়ে গেছে ১৭টি মাস। মানুষের মনে এখন প্রশ্ন: এই মহামারির অবসান হবে কবে?
এ প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। গবেষকরা বলেন, মহামারির সমাপ্তি বলতে কী বোঝায়, তার সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই।
যেকোনো মহামারিই বৈশ্বিক সংকট হিসেবে বিবেচিত। আমেরিকাসহ কিছু দেশে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ফলে মানুষের কাছে বার্তা গিয়েছিল যে, মহামারির ইতি ঘটতে চলেছে। কিন্তু জুলাইয়ে ফের করোনা সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, মহামারির অবসান হতে এখনও অনেক দেরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞানুসারে, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কোনো রোগকে যদি স্থানীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়, তাহলেই কেবল মহামারির সমাপ্তি ঘটানো সম্ভব। সে পর্যায়ে বেশিরভাগ মানুষের শরীরেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় বলে ভাইরাসটি কম বিপজ্জনক হয়ে পড়ে।
পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটো রোগকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে—গুটিবসন্ত এবং গোমড়ক। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির কল্যাণে এই রোগ দুটোকে নির্মূল করা গেছে। সর্বশেষ গোমড়ক দেখা গিয়েছিল কেনিয়ায়, ২০০১ সালে। অন্যদিকে সর্বশেষ গুটিবসন্তের উপদ্রব দেখা গিয়েছিল যুক্তরাজ্যে, ১৯৭৮ সালে।
মহামারিবিদ্যার অধ্যাপক জশুয়া এপস্টিনের মতে, কোনো রোগের একেবারে নির্মূল হয়ে যাওয়ার ঘটনা খুবই দুর্লভ। তিনি বলেন, কোনো রোগই সম্পূর্ণ নির্মূল হয় না, বড়জোর তাদের পোষক প্রাণীর কাছে ফিরে যায় কিংবা খুব অল্প মাত্রায় মিউটেট হয়।
অতীতের মহামারিগুলোর জন্য যেসব রোগজীবাণু দায়ী, সেগুলোর বেশিরভাগই এখনও আমাদের সঙ্গেই আছে। বিউবনিক ও নিউমোনিক প্লেগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া আজও টিকে রয়েছে। ১৯১৮ সালের ফ্লু মহামারিতে বিশ্বজুড়ে কমপক্ষে ৫০ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। সেই মহামারির জন্য দায়ী ভাইরাসের ক্ষতি করার ক্ষমতা কালক্রমে অনেক কমে গেলেও ভাইরাসটি কিন্তু এখনও টিকেই আছে।
একইভাবে করোনাভাইরাসও খুব সম্ভব ক্রমাগত রূপ বদলাতে থাকবে। একসময় টিকা ছাড়াই মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভাইরাসটিকে পরাস্ত করার সক্ষমতা অর্জন করবে। তবে তার আগে বহু মানুষের প্রাণহরণ করবে ভাইরাসটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের বিস্তারের গতি কমানো এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এখন পর্যন্ত মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। যেমন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে প্লেগ থেকে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব। আর নতুন করে কেউ প্লেগে আক্রান্ত হলেও অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তার রোগ সারানো যায়।
ফ্লু-র মতো অন্যান্য রোগ টিকার সাহায্যে সারানো যায়। বর্তমানে যেসব কোভিড টিকা পাওয়া যায়, সেগুলো বেশ নিরাপদ ও কার্যকর। এর মানে হলো, যথেষ্ট পরিমাণ মানুষকে টিকা দিতে পারলে করোনা মহামারির সমাপ্তি দ্রুত ঘটানো সম্ভব। এতে প্রাণহানিও অনেক কম হবে।
ডব্লিউএইচও পরিচালক টেড্রস অ্যাডহ্যানম গেব্রেয়েসাস গত সপ্তাহেও জোর দিয়ে বলেছেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব দেশের ১০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনা জরুরি। তিনি আরও বলেন, এ বছরের মধ্যে বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষকে এবং ২০২২ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে বিশ্বের ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা আওতায় আনার বিকল্প নেই।
এখন পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৮ শতাংশ জনসংখ্যা টিকার অন্তত একটি ডোজ পেয়েছে। টিকা বিতরণে চরম বৈষম্য বিরাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশই অন্তত এক ডোজ টিকা পেয়েছে; যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৫০ শতাংশ জনসংখ্যা পূর্ণ ডোজ টিকার আওতায় এসেছে। অথচ দরিদ্র দেশগুলোতে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।
বহু দেশে টিকা দেওয়ার গতি অত্যন্ত ধীর। ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ আফ্রিকার অনেক দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে করোনা সংক্রমণে। দরিদ্র দেশগুলোতে টিকা সরবরাহের জন্য কোভ্যাক্স প্রোগ্রামের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোভ্যাক্স এই দেশগুলোতে প্রতিশ্রুত টিকা সরবরাহ করতে পারেনি। এ সপ্তাহেও ডব্লিউএইচও দরিদ্র দেশগুলোকে টিকা দেওয়ার অনুরোধ করেছে ধনী দেশগুলোকে।
আবার যেসব দেশে পর্যাপ্ত টিকার মজুদ রয়েছে, সেখানেও ভুল তথ্য ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের জেরে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে টিকাদানের গতি।
এই সুযোগে ভাইরাসটি ছড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে অনেক বেশি। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাসটির নতুন নতুন ধরন আবির্ভূত হচ্ছে। নতুন ধরনগুলো আগের ধরনগুলোর চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ও সংক্রমণক্ষমতা সম্পন্ন। এখন পর্যন্ত করোনার ডেল্টা ধরন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। ধরনটি প্রথমে ভারতে তাণ্ডব চালিয়েছে। এখন ইন্দোনেশিয়ার হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে ডেল্টার সংক্রমণে। জানা গেছে, জাকার্তার অর্ধেকের বেশি বাসিন্দা ডেল্টায় সংক্রমিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ল্যাম্বডা ধরনও কিছু টিকাকে ঠেকিয়ে দিতে পারে।
এই মহামারি আরও প্রলম্বিত হলে সমস্ত সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে। ১৯১৮-র ফ্লু মহামারির সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল।
বিজ্ঞানের আগে সমাজ যদি যদি মহামারির সমাপ্তি ঘোষণা করে, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে লোকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলে ভাইরাসের সংক্রমণ আরও বেড়ে যাবে, প্রাণ হারাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অতীতের মহামারিগুলোর বেলায়ও তা-ই দেখা গেছে। কাজেই অজস্র প্রাণহানি এড়ানোর এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মহামারির অবসান ঘটানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে সব দেশের যথেষ্ট পরিমাণ মানুষকে টিকার আওতায় আনা।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
