জানালার ওপারে নতুন পৃথিবী
আমার জানালা গলে একটা সাদা মালবেরি গাছ দেখতে পাই, যাকে দেখে আমি বরাবর মুগ্ধ হই-যেখানে থাকি সেখানটায় বসবাসের সিদ্ধান্তের পিছনে অনেক কারণের মধ্যে ওই গাছ একটি কারণ। মালবেরি বিশাল এক গাছ; সারা বসন্ত আর গ্রীস্মজুড়ে অগুনতি পাখি-পরিবারের জন্য মিষ্টি আর স্বাস্থ্যকর ফল জুগিয়ে যায়। এই সময়টাতে মালবেরি গাছে নতুন পাতা গজায়নি, তাই সেদিকে তাকালে বিস্তৃত সুনসান রাস্তা শুধু। পার্কের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়া কেউ কালেভদ্রে রাস্তাটা ধরে হেঁটে যায়। ভ্রাথ্সওয়াফ শহরে এখনকার আবহাওয়া গ্রীষ্মের মতোই, চোখধাঁধানো সূর্যের আলো, নীল আকাশ আর পরিষ্কার বাতাস। আজ যখন আমি আমার কুকুরটাকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম, দেখলাম দুটো ম্যাগপাই একটা প্যাঁচাকে তার বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে ধাওয়া করছে। মাত্র কয়েক ফুট দূরত্বে ওই প্যাঁচাটার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হলো। আমার মনে হলো, জীবজন্তুরাও কোনো একটা আশা নিয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে এই নিয়ে চিন্তায় হাবুডুবু খাচ্ছে।
এখন বলা যায় সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে আমি পৃথিবীর উপরে বিচিত্র অতিশয় প্রভাবের কথা ভাবছি। পৃথিবীর সবকিছুই অতিরিক্ত, অতি দ্রুততায় চলা, তীব্র শব্দময়তা। তাই আমার মধ্যে সত্যি কোনো 'একাকীত্বের ভীতি' কাজ করছে না। মানুষের সঙ্গে দেখা না করে থাকা আমার জন্য কঠিন নয়। সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে বলে আমি মোটেও দুঃখিত নই। এমনকি বিপণিবিতান, দোকানপাট বন্ধ শুনলেও আমার কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। তবে আমি অবশ্যই চিন্তিত হয়ে পড়ি যখন চাকুরিচ্যুত মানুষের কথা ভাবি। তবে যখন জানতে পারলাম জবরদস্তি সঙ্গনিরোধের ব্যাপারটা ধেয়ে আসছে, আমার কেমন যেন শান্তি লাগল। আমি জানি বহু মানুষ আমার মতো করেই ভেবেছে আর ভিতরে ভিতরে ভাবনার জন্য লজ্জিতও হয়েছে। আমার ভিতরের মত্ত থাকার স্বভাব যা দীর্ঘদিন ধরে অতি ব্যস্ত বহির্মুখিতায় বাধাগ্রস্ত আর বিলম্বিত হয়, যেন তখন মনের বদ্ধ কুঠুরি থেকে গা ঝাড়া দিয়ে বেরিয়ে এল।
জানালা দিয়ে প্রতিবেশিদের দেখি। কাজপাগল এক উকিলকে সকাল সকাল ঘাড়ের দুদিকে কোর্টে পরার লম্বা গাউন ঝুলিয়ে অফিসে যেতে দেখলাম। আবার এখন তিনি ঢোলাঢালা ব্যায়ামের কাপড় পরে উঠোনের একটা গাছের ডালকে বাগে আনার চেষ্টা করছেন। তিনি হয়ত বাসাবাড়ির জিনিসগুলো গোছানোতে ব্যস্ত। কয়েকজন অল্প বয়সের মানুষকে একসঙ্গে হেঁটে যেতেও দেখলাম। তারা একটা বয়স্ক কুকুরকে নিয়ে হাঁটে যেটা গত শীতের পর থেকে আর সেভাবে হাঁটতে পারে না। কুকুরটা হাঁটতে গিয়ে গড়িমশি করে তখন তারা ধৈর্য নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে, কিংবা সবচেয়ে কম গতিবেগে সামান্য আগায়। পাশেই হুলুস্থুল শব্দ করতে করতে ময়লা সংগ্রহ করার ট্রাকটা এখানে ওখানে থেমে ময়লা জোগাড় করে।
জীবন এভাবেই কেটে যায় তবে কাটে আগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছন্দে। আমি শেলফ গুছিয়ে বেশ আগে পড়ে ফেলা খবরের কাগজগুলোকে ফেলনা জিনিসের ঝুড়িতে রাখি। ফুলগাছ ছোটো টব থেকে সরিয়ে বড়ো টবে বসাই। বাইসাইকেল যে দোকানে সারাতে দিয়েছিলাম সেখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসি। রান্নাবান্না করতে ইদানীং আমার বেশ লাগে।
শৈশব-কৈশোরের নানান দৃশ্য বহুকাল বাদে চোখের সামনে আনাগোনা করে। তখন হাতে এত সময় থাকত যে হেলায় হারানো যেত, ইচ্ছেমতো নষ্ট করা যেত, এমনকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু জানালা দিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে পার করা যেত। ক্ষুদ্র একটা পিপড়ের নড়াচড়া দেখে দিন শেষ করা যেত, কিংবা টেবিলের নীচে আত্মগোপন করে মাথার উপরে দূর্গের ছাদ কল্পনা করেও কাটানো যেত। অথবা কাটানো যেত কেবল এনসাইক্লোপিডিয়া পড়ে।
আমরা কি আর কখনো জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারব? কিন্তু বিষয়টা কি আসলে সেরকম নয় যে আমরা যখন ভাবছি ভাইরাসটা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে, সত্যিকার অর্থে বিষয়টা কিন্তু হতেও পারে ঠিক উলটো; ভাইরাস আসার আগে দ্রুতগামী পৃথিবীটাই কি চলতে চলতে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পৌঁছায়নি?
ভাইরাসের আবির্ভাব আমাদের অন্তত কয়েকটি বিষয় উপলব্ধিতে আনতে সাহায্য করেছে যা আমরা দীর্ঘদিন ধরে যত্ন করে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম, যেমন, আমরা ভারি আলতো এক জীব যা নানান ভঙ্গুর উপাদানে তৈরি। ভুলে থাকতে চেয়েছিলাম যে আমরা একদিন মরে যাব- আমরা মরণশীল। বিস্মৃত হতে চেয়েছিলাম যে 'মানবিকতা'-র প্রয়োজনে আমরা কেউ বাকি পৃথিবীর থেকে পৃথক নই, আমাদের কারো অস্তিত্বের ভিন্নতা নেই। বরং সমগ্র পৃথিবী অবিচ্ছেদ্য এক জালের মাধ্যমে যুক্ত যার ভিতরে আমরা বসবাস করি, আর সে কারণেই আমরা নির্ভরতা আর প্রভাবের অদৃশ্য সুতোয় একে অন্যের সঙ্গে বাঁধা। এমনকি কোনো মাপকাঠি ছাড়া, মানে, যত দূরবর্তী দেশের বাসিন্দাই হই না কেন, যে ভাষায়ই কথা বলি না কেন, আমাদের চামড়ার রঙ যা-ই হোক না কেন, একই অসুখে অসুস্থ হই, একই ভয়ে ভীত হই; একই মৃত্যু বরণ করি।
ভাইরাসটা আমাদেরকে অন্তত এটুকু শেখাতে পেরেছে যে বিপদ এলে আমরা নিজেদেরকে যতই দুর্বল আর নড়বড়ে ভাবি না কেন, আমাদের আশেপাশেই এমন মানুষ আছে যে আমাদের চেয়েও দুস্থ, আমাদের চেয়েও বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে আছে, আমাদের সাহায্য যার খুব প্রয়োজন। ভাইরাসটা আমাদের এ-ও মনে করিয়ে দিলো যে আমাদের বয়স্ক বাবা-মা ও দাদা-দাদি-নানা-নানি আমাদের চেয়েও বিপদগ্রস্ত অবস্থায় আছেন, আর তাদের এই মুহূর্তে শুশ্রুষার দরকার। ভাইরাসটা আরো একটা প্রশ্ন আমাদের মনে জাগিয়ে তুলেছে যা নিজেদের জিজ্ঞাসা করার সাহস আমাদের কখনোই হয়নি: প্রকৃতপক্ষে আমরা ঠিক কীসের পিছনে ছুটি? কী খুঁজে মরি?
অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয় আমাদেরকে ঘরের কথা মনে করিয়ে দিলো যেখানে আমরা বেড়ে উঠি, নিরাপদ বোধ করি। এই অবস্থায় এমনকি সবচেয়ে চঞ্চল পরিব্রাজকও নিজের বাড়িতে স্থির হলো। দুঃখজনক সত্য আমাদের সামনে প্রকাশিত হলো যে বিপদের আবির্ভাবে আমাদেরকে কেবল নিজের দেশের সীমানার মধ্যে বেঁধে ফেলতে হবে। এই কঠিন সময়ে দেখা গেল যে ইউরোপিয়ান সংহতির ধারণা কতটা দুর্বল। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তাই ওসব খেলা বন্ধ করে সংকটকালীন সমস্ত সিদ্ধান্ত নিজ নিজ দেশকে নিতে প্রস্তাব দিলো। পুরোনো নিয়মকানুন ফিরে এল, আবারো 'নিজস্ব' আর 'বিদেশি' নামে ভাগাভাগির স্বভাব খোলাসা হয়ে পড়ল- অন্য কথায়, যার বিরুদ্ধে গত একটা যুগ আমরা সংগ্রাম করে গেছি, ভেবেছিলাম আমাদের মানসিকতাকে আর কখনো আগের নিয়মে ফিরতে দেবো না।
ভাইরাসের আতঙ্ক আমাদেরকে প্রাচীন স্বভাবে ফেরত নিয়ে গেছে যখন প্রতিকূল সমস্ত কিছুর জন্য আমরা বিদেশিদেরকে দোষ দিতাম, যে কোনো হুমকির মুখে আমরা বরাবর ভাবতাম এ নিশ্চয় বিদেশিদেরই কাজ। ইউরোপে প্রত্যেকে মনে করে ভাইরাসটি এসেছে 'অন্য কোনো জায়গা' থেকে। পোল্যান্ডে দেশের বাইরে থেকে যত মানুষ এসেছে তারা প্রত্যেকে সন্দেহভাজন। ভাইরাস আমাদেরকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে দেশের সীমানার অস্তিত্ব আছে এবং আছে বলেই বাঁচা গেল।
এটা সত্যিই ভীতিকর যে ভাইরাস আমাদেরকে প্রাচীন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: আমাদের মধ্যে সমতা নেই। যেখানে আমাদের কেউ নিজস্ব উড়োজাহাজে কোনো দূর দ্বীপে নিজের বাড়িতে বা জঙ্গলের ভিতরে সঙ্গনিরোধে চলে গেল সেখানে আমাদেরই কেউ কেউ শহরে পড়ে থাকল, বাড়িতে বাড়িতে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করল, লোকালয়ে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করল। কেউবা দোকানপাট বা হাসপাতালে কাজ করার জন্য নিজের জীবন বাজি রাখল। কেউ সর্বস্ব খোয়াল, কেউ আবার অতিমারির সুযোগে দুর্নীতি করে যতটা পারে আখের গুছিয়ে নিল। আসন্ন সংকট আমাদের বহুদিনের লালিত বহু আদর্শকে উড়িয়ে দেবে। পৃথিবীর বহু দেশ হয়ত ধাক্কাটা ভালোমতো কাটিয়ে উঠতে পারবে না। তাদের পতনের মধ্যে দিয়ে আনকোরা ক্ষমতার জন্ম হতে পারে। পৃথিবীতে সংকটের পরে বরাবর নতুন উত্থানের ঘটনা ঘটে।
আমরা মনে করছি যে বাড়িতে থেকে, বইপত্র পড়ে, টেলিভিশন দেখে আমরা দিন পার করছি কিন্তু সত্যি বলতে কী, কল্পনার অতীত কোনো ভবিষ্যতের জন্য ভিতরে ভিতরে আমরা নিজেদের তৈরি করছি। ধীরে ধীরে আমরা বুঝে নিচ্ছি যে সামনের দিনগুলোয় কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। বাধ্যগতভাবে একাকী থাকা, গৃহবন্দি থাকা, পরিবারবেষ্টিত থাকা হয়ত অনেক কিছুকেই আমাদের সামনে উদোম করে তুলতে পারে যার মুখোমুখি হবার বা স্বীকার করার ইচ্ছে আমাদের কখনো ছিল না। আমরা হয়ত মেনে নিতে চাইনি যে পরিবারের কাছে আমরা মূল্যহীন হয়ে পড়েছি, আমাদের বিবাহিত সম্পর্কে বহু আগেই চির ধরেছে। গৃহবন্দিত্বের কাল আমাদের সন্তানদের ইন্টারনেটে আসক্তি বাড়িয়ে দেবে। আমাদের মধ্যে অনেকে অহেতুক বিষয়ে কেবল লোকদেখানো মেতে থাকার অভ্যাসের ব্যাপারে সতর্ক হবে। এরপরে কী হবে যদি খুন, আত্মহত্যা, মানসিক অসুস্থতা দিনের পর দিন বাড়তে থাকে?
দু'শ বছর ধরে যা আমাদেরকে গঠন করেছে, আমাদের চোখের সামনে সভ্যতা নামের সেই ইমারত পুড়ে যথেচ্ছা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়বে। ভেঙে পড়বে সেই বিশ্বাস যা ধারণা দিয়েছিল, আমরাই সৃষ্টিকর্তা, আমরা যা খুশি তাই করতে পারি, সমস্ত পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয়। নতুন দিন ক্রমশ কাছে আসছে।
অনুবাদ: আফসানা বেগম
(পোলিশ থেকে ইংরেজি অনুবাদ: জেনিফার ক্রফট)
ওলগা তোকারচুক: ২০১৯ সালে সাহিত্যে নোবেল জয়ী পোলিশ লেখক
