এপ্রিলে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াচ্ছে সরকার
সরকারের নেওয়া ঋণের সুদ ও ভর্তুকিসহ পরিচালন ব্যয় মেটানোর চাপ বেড়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত মেনে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১৬% বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য ৭.৬ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে, চলতি অর্থবছরের এপ্রিলে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি পেয়েছে এনবিআর।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এপ্রিলে সার্বিক রাজস্ব আদায় ২.২৯% কমেছে। ২০২১ সালের জুলাইতে রাজস্ব বৃদ্ধি মাত্র ৪% ছিল যা গত বছরের এপ্রিলে ২২.৮% পর্যন্ত বেড়েছে।
স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয় ২০১৯-২০ অর্থবছরে কোভিডের সময়টায়।
পরের অর্থবছর থেকেই তা আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসে। এরপর রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবারের এপ্রিলেই প্রথম।
স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট আদায় ১৫% এর বেশি হলেও, এপ্রিলে আমদানিখাত এবং আয়কর ও ভ্রমণ করখাত থেকে রাজস্ব আদায়ে দুই অংকের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আগামী অর্থবছরে বাজেটের অর্থ সংস্থান করতে গিয়ে আইএমএফ এর শর্ত অনুযায়ী কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৪.৩০ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
সরকারি ঋণ পরিশোধের চাপ, ব্যাপক ভর্তুকি এবং অধিকতর সামাজিক নিরাপত্তার চাহিদা পূরণের চাপের মধ্যেই আগামীকাল প্রস্তাবিত হতে যাচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৭,৬১,৭৮৫ কোটি টাকার বাজেট।
চলতি অর্থবছর এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩,৭০,০০০ কোটি টাকা। অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ লক্ষমাত্রার তুলনায় ১২.১৫% কম হয়েছে।
এনবিআর এর সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন টিবিএসকে বলেন, "অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি না থাকা এবং আমদানি কম হওয়ায় রাজস্ব আদায়ে গতি মন্থরতা রয়েছে।"
মে ও জুন মাসে উন্নয়নমূলক কাজ বেশি হয় ফলে ওই সময়ে সরকারের রাজস্ব আদায় কিছুটা বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
কিন্তু ওই সময় লক্ষ্যমাত্রাও বেশি থাকবে।
"সব মিলিয়ে এই বছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ঘাটতি থাকবে রাজস্ব আদায়ে," বলেন ফরিদ উদ্দিন।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "অর্থনীতিতে বিশেষ কোন গতি আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আবার ডলার ক্রাইসিস আছে, নন পারফর্মিং লোন বাড়ছে। ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরে গতি বাড়ার লক্ষণ নেই। অর্থনীতিতে গতি না আসলে রাজস্ব আদায়েও গতি আসবে না।"
ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন টিবিএসকে বলেন, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা থেকে এনবিআরের অর্জন ৬০,০০০-৭০,০০০ কোটি টাকা কম হতে পারে। তবে আগামী অর্থবছর সিগোরেট, মোবাইল ফোনসেটসহ মানুষ নিয়মিত ব্যবহার করে এমন সব পণ্যে শুল্ককর বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
"নতুন অর্থবছর এনবিআরকে যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, অর্থনীতির স্বাভাবিক সময়েও তা অর্জন করা কঠিন। এখন তো অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। ডলার সংকট না কাটলে আমদানি স্বাভাবিক হবে না। আর আমদানি স্বাভাবিক না হলে প্রবৃদ্ধিও ৭.৫% অর্জন সম্ভব হবে না, রাজস্বও বাড়বে না," বলেন তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের রিসার্চ ডিরেক্টর তৌফিকুল ইসলাম খান টিবিএসকে বলেন, "চলতি বছর এনবিআর ও অন্যান্য মিলিয়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় মোট ৭৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে। আগামী বছর যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হচ্ছে, তা চলতি অর্থবছরের আদায়ের থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অতীতে কখনো অর্জন হয়নি।"
"অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী বছরও তা সম্ভব নয়। আলাদা কোনো আদায়ের সোর্স না থাকলে ১৩.৫% গ্রোথ হতে পারে আগামী অর্থবছরে," বলেন তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা থেকে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ৭০,০০০ কোটি টাকা কম হতে পারে। আর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এর হিসাবে, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এনবিআরের রাজস্ব আদায় কম হবে ৫০,০০০-৬০,০০০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ কোটি টাকা।
এর মধ্যে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের বাইরে রাজস্ব বোর্ড বহির্ভূত করখাত থেকে ২০,০০০ কোটি টাকা এবং কর বহির্ভূত রাজস্ব খাত থেকে ৫০,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এবারের তুলনায় আগামী অর্থবছর এনবিআরকে অন্তত এক লাখ কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে হবে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে এবং তা মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও বাড়বে। না হলে উন্নয়ন ব্যয়ে বরাদ্দ কমাতে হবে।
সরকারের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের চাপ বেশি হওয়ায় গত দুই অর্থবছর ধরে এডিপির অর্থ ব্যয়ে শর্তারোপ করে নিম্ন অগ্রাধিকার প্রকল্পে অর্থ ছাড় বন্ধ করে রাখছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২,৬১,৭৮৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫.২%। আর এই ঘাটতি অর্থায়নের অর্ধেকেরও বেশি ঋণ নেওয়া হবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে।
আগামী অর্থবছর ১,৩২,৩৯৫ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নেওয়ার প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এটি চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৫% বেশি।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল ১,০৬,৩৩৪ কোটি টাকা। কিন্তু রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি সুদ ও ভর্তুকিতে বাড়তি ব্যায়ের চাপ থাকায় সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ১,১৫,৪২৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ৮২,০৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু এপ্রিল মাসেই ঋণ নিয়েছে ২৯,৬৯৭ কোটি টাকা।
ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধেও আগামী বাজেটে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দ ছিল ৭৩,১৭৫ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৮০,৬৯১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আর আগামী অর্থবছর এ খাতে বরাদ্দ আরও বাড়িয়ে ৮২,০০০ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের মধ্যে ব্যাংক ঋণের সুদ ছাড়াও সঞ্চয়পত্রের সুদও রয়েছে।
তবে উচ্চ সুদ ব্যয়ের কারণে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের ভরসাস্থল সঞ্চয়পত্র কেনা আগামী বছর আরও বেশি কঠিন করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। মানুষ যাতে সহজে সঞ্চয়পত্র কিনতে না পারে, সেজন্য নতুন নিয়ম-কানুনের ঘোষণা থাকছে বাজেটে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারিখাত চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পায় না; যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে। ফলে আগামী বাজেটে বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ৩৩.৮% এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। আর কাক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ না হলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৭.৫% প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না।
তবে ব্যাংকাররা বলছেন, এই মুহূর্তে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট পরিস্থিতি কাটতে শুরু করেছে এবং বেসরকারিখাতে ঋণের চাহিদা কমে গেছে। তাই সরকার স্বল্পমেয়াদে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ব্যাংকঋণের পরিমাণ বাড়ালে বেসরকারিখাতে ঋণ বিতরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে তার প্রভাব বেসরকারি খাতে পড়বে। মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হবে। ব্যাংকে আবার তারল্য সংকট দেখা দেবে। এতে ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরি হবে।"
তিনি বলেন, "ব্যাংক থেকে অধিক পরিমাণ ঋণ নেওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো না। সরকার বেশি সুদে ঋণ নিচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে নিরুৎসাহিত হচ্ছে, যা কাম্য নয়।"
সরকারের সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে ও আইএমএফ এর শর্তের কারণে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ১৮,০০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক। চলতি অর্থবছর সঞ্চয়পত্র থেকে ৩৫,০০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ২০,০০০ কোটি করা হয়েছে।
ঘাটতি অর্থায়ন মেটাতে আগামী অর্থবছর বিদেশি উৎস থেকে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষমাত্রার তুলনায় ১৯,০০০ কোটি টাকারও বেশি।
আগামী অর্থবছর বিদেশি উৎস থেকে ১,০২,৪৯০ কোটি টাকা ঋণ নেবে সরকার। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৯৫,৪৫৮ কোটি টাকা। তবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি থাকায় চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত বিদেশি অর্থায়নের পরিমাণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২১% কমেছে।
ফলে আগামী অর্থবছর বিদেশি উৎস থেকে যে পরিমাণ অর্থায়নের প্রাক্কলন করা হয়েছে, তা অর্জন করা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিদেশি উৎস থেকে বাজেট সাপোর্ট পাওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
"সরকার পাইপলাইনে থাকা বিদেশি সহায়তা ও বাজেট সাপোর্ট কাজে লাগাতে পারলে বিদেশি অর্থায়ন পাওয়া সম্ভব হবে," বলেন তিনি।
আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৫% বাড়লেও সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক উন্নয়ন ব্যয় একই হারে বাড়ছে না।
নতুন বাজেটে সার্বিক উন্নয়নখাতে বরাদ্দ থাকছে ২,৭৭,৫৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২,৬৩,০০০ কোটি টাকা এবং এডিপির বাইরে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭,৯৮৬ কোটি টাকা।
