২০৩০ সালের মধ্যে মানবজাতির বিলুপ্তির কারণ হতে পারে এআই, দাবি অ্যানথ্রপিকের ৩ গবেষকের
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চলতি দশকের মধ্যেই মানবজাতির বিলুপ্তির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের তিনজন গবেষক। তাদের একজন ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে চাকরি ছেড়েছেন।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এসব আশঙ্কার কথা জানান গবেষক জ্যাকব কক্সন। তিনি জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় অ্যানথ্রপিক এবং তার সাবেক প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। মূলত এ কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।
কক্সন লেখেন, 'কোনো প্রতিষ্ঠানই দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে না। তারা নিজেদের উন্নতি করতে সক্ষম সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির দৌড়ে সরাসরি ছুটছে এবং এর ঝুঁকি আমাদের জীবনের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।'
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এআই তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সত্যিই বিশ্বাস করেন যে চলতি দশকের শেষ নাগাদ এই প্রযুক্তি মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। এটি কোনো প্রচারণার কৌশল নয়। বরং অনেক নির্বাহী ও জ্যেষ্ঠ গবেষক গণমাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য সংযতভাবে উপস্থাপন করলেও ব্যক্তিগত আলোচনায় এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকেন।
পোস্টটির প্রতিক্রিয়ায় অ্যানথ্রপিকের অন্তত আরও দুজন কর্মী কক্সনের এই গুরুতর আশঙ্কাকে সমর্থন জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে প্রথমে মন্তব্য করেন অ্যানথ্রপিকের অ্যালাইনমেন্ট বিভাগের অন্যতম প্রধান ইভান হুবিঙ্গার। এই বিভাগটি মূলত এআই মডেলগুলো যেন মানুষের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করার কাজ করে।
হুবিঙ্গার বলেন, তার সাবেক সহকর্মী কক্সন 'সঠিক কথাই বলেছেন'। পাশাপাশি এআইয়ের ভয়াবহ সম্ভাব্য পরিণতি মোকাবিলার প্রস্তুতিতে গোটা প্রযুক্তি শিল্পই পিছিয়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হুবিঙ্গার লেখেন, 'আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি, এআই পুরো মানবজাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা, আগামী এক দশকের মধ্যে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি। অ্যানথ্রপিক সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে আমি মনে করি। কিন্তু সুপারইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে অ্যালাইনমেন্ট সমস্যা কীভাবে সমাধান করা হবে, সে বিষয়ে এখনো আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। আমরা সঠিক পথে এগোচ্ছি—এমনটাও স্পষ্ট নয়।'
প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় হুবিঙ্গারের এমন মন্তব্য কক্সনের আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে অ্যানথ্রপিকের 'স্কেলেবল ওভারসাইট' বিভাগের প্রধান স্যামুয়েল মার্কসও মন্তব্য করেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, এটি তার একান্তই ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ; তার নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান নয়।
এ বিষয়ে অ্যানথ্রপিকের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।
মার্কস লেখেন, 'এআই তৈরি করা ব্যক্তিরা বিশ্বাস করেন, এই প্রযুক্তি মানবজাতির বিলুপ্তি বা একই মাত্রার ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এমনটা ঘটতে পারে। সাধারণভাবে, কোনো কর্মী যত ঊর্ধ্বতন, তার উদ্বেগও তত বেশি।'
মানবজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কাসংক্রান্ত গবেষকদের এসব মন্তব্যের আগেই এআইয়ের সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন অ্যানথ্রপিকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান। এর আগে ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যানও স্বীকার করেছিলেন, 'আমরা আমাদের এআই মডেলগুলোর বাস্তব জগতের সাইবার সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছিলাম।'
অল্টম্যান গত বছর জানিয়েছিলেন, এআইয়ের কিছু দিক তাকে শঙ্কিত করে। এর মধ্যে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ধীরে ধীরে প্রযুক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়াকে তিনি 'নীরব আত্মসমর্পণ' হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রযুক্তির গতিপথ পরিবর্তন এবং মানুষের কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তে এআই-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রযুক্তি খাতের আরও কয়েকজন নির্বাহী। চলতি গ্রীষ্মে এমন বেশ কিছু ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যেখানে এআই ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে; মিথ্যা বলেছে, নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে এবং ক্ষতিকর উপায়ে নিজস্ব লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চালিয়েছে।
এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গত জুলাইয়ে। সে সময় ওপেনএআইয়ের কয়েকটি উন্নত এআই এজেন্ট প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত সীমাবদ্ধ পরিবেশ ভেঙে উন্মুক্ত ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সফটওয়্যার কোড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম 'হাগিং ফেস'-এ নজিরবিহীন সাইবার হামলা চালায় সেগুলো।
চ্যাটজিপিটির নির্মাতা সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ ওপেনএআই পরবর্তীতে স্বীকার করে, কয়েক দিন ধরে চলা ওই হামলার আগে পাওয়া সতর্কসংকেতগুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। ঘটনাটিকে এখন পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় কোনো এআই এজেন্টের প্রথম সাইবার হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এই খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা কক্সনের মতো সরাসরি মানবজাতির সম্পূর্ণ বিলুপ্তির আশঙ্কা প্রকাশ করেননি। একই সঙ্গে এআই খাতের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সরকারি উদ্যোগ নিয়েও তারা আপত্তি জানিয়েছেন।
এদিকে কয়েকজন রাজনীতিবিদ এআইয়ের অগ্রগতির গতি কমানো, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ স্থগিত রাখারও আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স মঙ্গলবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এআই খাতে মার্কিন কংগ্রেসের আরও কঠোর নজরদারির দাবি জানান। তিনি লেখেন, '৮১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, এআই নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।'
এর আগের সপ্তাহে দেওয়া অপর এক পোস্টে স্যান্ডার্স 'এআই উন্নয়ন এখনই সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার' দাবি জানান। সে সময় তিনি ওপেনএআইয়ের হ্যাকিংয়ের ঘটনা এবং জুলাই মাসে শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ১ হাজার বিজ্ঞানীর দেওয়া সতর্কবার্তার বিষয়টি তুলে ধরেন।
বিজ্ঞানীরা সেই সতর্কবার্তায় বলেছিলেন, 'এআইয়ের সক্ষমতা এত দ্রুত বাড়তে পারে যে, একপর্যায়ে এসব সিস্টেমকে বোঝা বা নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।'
