মুসলিম নারীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশ ইন: ২ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণের নির্দেশ ভারতের আদালতের
বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে এক বাঙালি-বংশোদ্ভূত মুসলিম নারীকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশ ইনের ঘটনায় এই নারীকে ২ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দিতে আসাম সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন গুয়াহাটি হাইকোর্ট।
দেশ থেকে নির্বাসন বা বহিষ্কারের নিয়ম লঙ্ঘন করে কাউকে জোর করে বাংলাদেশে পুশ ইনের ঘটনায় এই প্রথম কোনো রাজ্য সরকারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দিলেন আদালত।
ভারতীয় গণমাধ্যম স্ক্রল.ইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই নারীর নাম মুমতাজ বেগম। তার পরিবার গুয়াহাটি হাইকোর্টে 'হেবিয়াস করপাসের' (জোর করে হেফাজতে রাখা কাউকে আদালতে প্রদর্শন) আবেদন করার পর জানতে পারে যে মুমতাজকে জোর করে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
তবে রাজ্য সরকারকে ঠিক কতদিনের মধ্যে মুমতাজকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, সেই বিষয়ে প্রতিবেদনে কিছুই বলা হয়নি।
হাইকোর্ট এই মামলায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পক্ষভুক্ত করে বলেছে, মুমতাজকে বাংলাদেশে খুঁজে বের করতে এবং তাকে ভারতে ফিরিয়ে আনতে।
মুমতাজকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনায় আসামের নগাঁও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের ভূমিকারও কঠোর সমালোচনা করেছেন হাইকোর্ট।
হেবিয়াস করপাসের আবেদনের ভিত্তিতে গুয়াহাটি আদালতের বিচারপতি কল্যাণ রায় সুরানা ও বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খাউন্দের বেঞ্চ বলেছেন, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল যে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে ট্রাইব্যুনালের বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব নথিপত্রেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল হলো আসামের বিশেষ ধরনের আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠান, যা বিভিন্ন নথিপত্রের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়।
২০১৯ সালে নগাঁওয়ের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল মুমতাজকে বিদেশি নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
তবে গুয়াহাটি হাইকোর্ট মুমতাজের মামলাটি নতুন করে বিবেচনা করতে ট্রাইব্যুনালকে নির্দেশ দেন। আদালতের যুক্তি ছিল, মুমতাজ যেসব প্রমাণ হাজির করেছিলেন, সেগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল।
হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গত ৩০ মে মুমতাজ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু স্ক্রল.ইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলাটি নতুন করে বিবেচনা করার বদলে ট্রাইব্যুনালের বিচারক মুমতাজকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মুমতাজের আইনজীবীদের অভিযোগ, তাকে সেই আদেশের কোনো কপিও দেওয়া হয়নি, যেটি থাকলে তিনি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারতেন।
উল্লেখ্য, গত চার বছরে আসামের ট্রাইব্যুনালগুলো প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে ভারতীয় নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করেছে। উচ্চ আদালতগুলোও বহুবার এই প্রক্রিয়াকে স্বেচ্ছাচারী এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা করেছেন।
নাগরিকত্বের লড়াই
১৯৯৭ সালে আসামে ভোটার তালিকা সংশোধনের পর মুমতাজকে 'ডি' বা সন্দেহভাজন ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার হারান। মুমতাজের মতো তাদের অনেককেই আসামের সীমান্ত পুলিশ ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে পাঠায়।
২০১৭ সালে নগাঁওয়ের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল মুমতাজ ভারতীয় নাগরিক নন বলে রায় দেয়। পরে গুয়াহাটি হাইকোর্টে সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হলে মামলাটি নতুন করে শুনানির জন্য তোলা হয়। পরে মুমতাজ আবার ট্রাইব্যুনালে যান। কিন্তু এবারও তাকে বিদেশি নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
২০১৯ সালে মুমতাজ আবার গুয়াহাটি হাইকোর্টে সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেন। তখন আদালত উল্লেখ করেন, ট্রাইব্যুনাল তার জমা দেওয়া সব প্রমাণ পরীক্ষা করেননি। সেই সঙ্গে আদালত নতুন করে বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দেন।
কিন্তু ৩০ মে ট্রাইব্যুনাল মুমতাজকে আবারও বিদেশি নাগরিক ঘোষণা করে।
হাইকোর্ট ট্রাইব্যুনালের এই কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেন, বিচারক বিপুল কুমার নাথ "মামলাটি নতুন করে বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানোয় ব্যক্তিগত ক্ষোভ পোষণ করেছিলেন''।
আদালত আরও বলেছে, ৩০ মে-র আদেশের বিরুদ্ধে মুমতাজকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। এটি অভিবাসী আইন, ১৯৫০ এর 'সরাসরি লঙ্ঘন'। ওই আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে তখনই বহিষ্কার করা যেতে পারে, যখন তার জন্য আইনে থাকা সব ধরনের আইনি প্রতিকার গ্রহণের সুযোগ শেষ হয়ে যায়।
