মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি ব্যয়বহুল হওয়ায় ভারতে উৎপাদিত কাঁচা খেজুরে সয়লাব দেশের বাজার
ভারতে উৎপাদিত কাঁচা খেজুর, যা বাজারে 'আরবের খেজুর' নামে পরিচিত, এখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি বিমানযোগে না এসে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ট্রাকে করে বাংলাদেশে আসছে। এতে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, দাম কমেছে এবং সারা দেশে এই ফলের সরবরাহ বেড়েছে।
হলুদাভ রঙ, টসটসে শাঁস, মিষ্টি স্বাদের সঙ্গে হালকা কষভাবের এই ফল বর্ষাকালের জনপ্রিয় মৌসুমি সুস্বাদু ফল। কয়েক বছর আগেও এ ধরনের কাঁচা খেজুর মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসর থেকে বিমানযোগে আমদানি করা হতো। উচ্চ পরিবহন ব্যয় ও কাস্টমস শুল্কের কারণে তখন এটি ছিল তুলনামূলক ব্যয়বহুল।
এখন এই কাঁচা খেজুর ভারতের স্থলবন্দর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এরপর ট্রাকে করে দেশের পাইকারি বাজারে পৌঁছানো হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, এতে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
প্রতিদিন সকালেই চট্টগ্রামের ফলের পাইকারি বাজারে কাঁচা খেজুর বোঝাই ট্রাক এসে পৌঁছায়। এরপর ভ্যান, পিকআপ ও দূরপাল্লার ট্রাকে করে দ্রুত কক্সবাজার, কুমিল্লা, ফেনী, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয় এই ফল।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু চট্টগ্রামের এই বাজারেই প্রতিদিন ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার কেস কাঁচা খেজুর বিক্রি হয়। এতে দৈনিক লেনদেন হয় প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
২১ জুলাই বাজার ঘুরে দেখা যায়, সেদিন ১১ ট্রাক কাঁচা খেজুর এসেছে। মৌসুমের চূড়ান্ত সময়ে সাধারণত প্রতিদিন ৮ থেকে ১০টি ট্রাক বাজারে পৌঁছায়।
মানভেদে ১০ কেজির প্রতি কেস কাঁচা খেজুর ১ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, কোনো দিন ট্রাক কম এলে প্রতি কেসে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে যায়।
বন্দরনগরীর কদমতলীর বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী ইশমাম উদ্দিন জানান, তিনি প্রতি বছরই এই ফল কেনেন। তিনি বলেন, 'মিষ্টির সঙ্গে হালকা কষভাব থাকায় এর স্বাদ আলাদা। বিশেষ করে শিশুরা এটি খুব পছন্দ করে।'
তিনি ২৮০ টাকা কেজি দরে দুই কেজি খেজুর কিনেছেন। মৌসুম শেষ হওয়ার আগে আরও কেনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান।
সন্দ্বীপের বাসিন্দা মো. আবুল কালামমের চট্টগ্রামের বিশ্ব কলোনি এলাকায় একটি ফলের দোকান রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, কাঁচা খেজুরের এখনো বেশ ভালো চাহিদা রয়েছে।
তিনি বলেন, 'পাইকারি বাজার থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা দরে ১০ কেজির দুটি কেস কিনেছি। খুব দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। প্রতিদিনই ক্রেতারা কাঁচা খেজুর খুঁজছেন। আগামী কয়েক সপ্তাহও বিক্রি ভালো থাকবে বলে আশা করছি।'
হবিগঞ্জের ফল ব্যবসায়ী শুক্কুর মিয়া নিজের এলাকার বাজারে সরবরাহের জন্য চার কেস কাঁচা খেজুর কিনেছেন।
তিনি বলেন, 'হবিগঞ্জেও কাঁচা খেজুরের চাহিদা বাড়ছে। বিক্রি ভালো হলে আরও অর্ডার দেব।'
খাতুনগঞ্জ ফল বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসাইন জানান, শুধু তার দোকান থেকেই প্রতিদিন প্রায় ১০০ কেস কাঁচা খেজুর বিক্রি হয়।
তিনি বলেন, 'দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা এখানে খেজুর কিনতে আসেন। সরবরাহ যতদিন থাকবে, ততদিন বাজারেও চাহিদা ভালো থাকবে।'
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম বলেন, ভারত হয়ে কাঁচা খেজুর আমদানি করায় ফলটি এখন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এসেছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'আগে কাঁচা খেজুর মূলত মিসর ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বিমানযোগে আমদানি করা হতো। বিমানভাড়া ও কাস্টমস শুল্ক মিলিয়ে প্রতি কেজিতে আমদানি ব্যয় ৫০০ টাকারও বেশি পড়ত। এখন ভারতীয় স্থলবন্দর দিয়ে আসায় পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে একই মানের খেজুর এখন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে অনেক বেশি ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এসেছে।'
তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে জুনের শেষ সপ্তাহে কাঁচা খেজুর বাজারে আসা শুরু হয়েছে এবং সাধারণত আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই মৌসুম থাকে। বেনাপোল, সোনামসজিদ, বুড়িমারী ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে খেজুর বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর ট্রাকে করে চট্টগ্রামে আনা হয় এবং সেখান থেকে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। পুরোপুরি মৌসুমি ফল হওয়ায় মৌসুম শেষ হলে বাজার থেকেও এটি চলে যায়।
