কেপ ভার্দের এই ডিফেন্ডারের জন্ম ডাবলিনে, করতেন ‘নীরস’ ব্যাংকের চাকরি, দলে ডাক পেয়েছেন লিঙ্কডইনে
জন্মস্থান থেকে ৩ হাজার মাইল দূরের ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্রের হয়ে খেলার ডাক পেয়েছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। ডাবলিনের একসময়ের সেই ব্যাংককর্মীই বিশ্বকাপে খেলছেন কেপ ভার্দের হয়ে, স্পেনের বিপক্ষে ড্র করতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
রবার্তো লোপেসের জীবনের গল্পটা এতটাই অবিশ্বাস্য যে, হলিউডের ডাকসাইটে চিত্রনাট্যকাররাও হয়তো একে গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দেবেন!
'চাকরিটা একদমই ভালো লাগছিল না,' নিজের ডেস্ক জব নিয়ে বলছিলেন ৩৩ বছর বয়সি এই ফুটবলার। আয়ারল্যান্ডের এক হোয়াইট-কলার চাকরিজীবী থেকে কেপ ভার্দের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপে মাঠে নামার যাত্রার স্মৃতিচারণ করছিলেন তিনি।
ডাকনাম 'পিকো'। ১০ বছর আগেও এই ডিফেন্ডারের জীবন ছিল অন্যরকম। মর্টগেজ অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করতেন, আর ফাঁকে ফাঁকে পার্ট-টাইম ফুটবল খেলতেন লিগ অভ আয়ারল্যান্ড-এর ক্লাব বোহেমিয়ান্সের হয়ে।
এরপর জীবনের মোড় ঘুরে গেল ২০১৭ সালে। ডাবলিনেরই আরেক ক্লাব শ্যামরক রোভারস লোপেসকে দলে ডাকে। ব্যস, চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি পেশাদার ফুটবলে খেলার সুযোগ পেয়ে যান তিনি।
এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
আয়ারল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সাবেক এই খেলোয়াড় 'ব্লু শার্কস'দের (কেপ ভার্দে) জার্সিতে প্রথম মাঠে নামেন ২০১৯ সালে। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা ১০টি দ্বীপের ছোট্ট এক দেশ কেপ ভার্দে।
ওই সময় দলের কোচ ছিলেন রুই আগুয়াস। তিনি যখন জানতে পারলেন লোপেসের বাবা কার্লোস কেপ ভার্দের নাগরিক, তখন বিজনেস নেটওয়ার্কিং সাইট লিঙ্কডইনের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন তিনি।
সাবেক বেনফিকা স্ট্রাইকারের প্রথম মেসেজটি লেখা ছিল পর্তুগিজ ভাষায়। শ্যামরক রোভারসের হয়ে খেলা লোপেস না বুঝেই মেসেজটি এড়িয়ে যান।
বিবিসি স্পোর্টকে লোপেস বলেন, 'ভেবেছিলাম ওটা স্প্যাম মেসেজ হবে, তাই পাত্তা দিইনি। এর নয় মাস পর উনি আমাকে আবারও মেসেজ করেন। লিখলেন: "হাই, রবার্তো, তোমাকে যে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, সেটা নিয়ে কি ভেবে দেখার সুযোগ পেয়েছ?"
'এত মাস ধরে কোনো উত্তর না দেওয়ায় নিজেকে খুব অভদ্র মনে হচ্ছিল।
'আমি তাড়াতাড়ি মেসেজটা কপি করে গুগল ট্রান্সলেটে ফেলে দেখলাম, ওতে বলা হয়েছে: "আমরা কেপ ভার্দে স্কোয়াডের জন্য নতুন খেলোয়াড় খুঁজছি। তুমি কি কেপ ভার্দের হয়ে খেলতে আগ্রহী?"
'ওটা পড়ে আমি উত্তেজনায় কাঁপছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠি, "অবশ্যই! একশোভাগ! আমি এই স্কোয়াডের অংশ হতে পারলে খুব খুশি হব!"'
গত সাত বছর ধরে ব্লু শার্কসদের নিয়মিত খেলোয়াড় লোপেস। তবে তার গত কয়েকটা মাস কেটেছে রীতিমতো ঘোরের মধ্যে, প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের মতো।
কেপ ভার্দেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে তোলার ঠিক কদিন পরেই স্ত্রী লিয়া জন্ম দেন ছেলে ডিয়েগোর, প্রথমবারের মতো বাবা হওয়ার স্বাদ পান লোপেস।
'ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার। আমি নিশ্চিত, বড় হওয়ার পথে প্রত্যেক ফুটবলারই এই স্বপ্নটা দেখে। আর আমার কাছে বিশ্বকাপের চেয়ে বড় কোনো মঞ্চ হতেই পারে না,' বলেন লোপেস।
'জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করা, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া আসরে নিজেদের পদবিকে তুলে ধরতে পারার এই অনুভূতিটা আমাকে গর্বে ভাসিয়ে দিচ্ছে।'
'আমাদের দেশের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত'
ব্লু শার্কসরা সৌদি আরব ও উরুগুয়েরও মুখোমুখি হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ২০২৬ বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের এই উত্থান টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা 'ফিল-গুড' গল্প হতে যাচ্ছে। আন্ডারডগদের উত্থানের এই এক রূপকথা মানুষ মনে রাখবে যুগের পর যুগ।
আনসেলমো 'জাইর' রিবেইরো যখন ব্লু শার্কসের হয়ে খেলতেন, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থান ছিল ১৮২। বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন তখন আক্ষরিক অর্থেই অলীক কল্পনা ছিল।
২০০০ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর আঞ্চলিক টুর্নামেন্ট অ্যামিলকার ক্যাব্রাল কাপ জিতেছিল কেপ ভার্দে। সেই জয়ে বড় ভূমিকা ছিল জাইরের। বিবিসি স্পোর্টকে তিনি বলেন, 'আগে মানুষকে যখন আমার দেশের নাম বলতাম, তারা অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করত— 'সেটা আবার কোথায়?"'
সেই দিনগুলোতে সাবেক এই মিডফিল্ডার ও ফরোয়ার্ডকে নিজের পকেটের টাকায় বিমানের টিকিট কেটে দেশের হয়ে খেলতে আসতে হতো। সেই কেপ ভার্দে এখন বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে উঠে এসেছে ৬৭ নম্বরে।
সাকুল্যে ৫ লাখ ২৫ হাজার মানুষের এই দ্বীপরাষ্ট্রের এই উত্থান রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। অথচ ফিফার সদস্যপদই তারা পেয়েছে এই সেদিন—১৯৮৬ সালে।
এরপর থেকে এ পর্যন্ত চারবার আফ্রিকা কাপ অভ নেশনসের মূল পর্বে খেলেছে কেপ ভার্দে। আর এবার জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখা ক্ষুদ্রতম দেশগুলোর একটি তারা।
সাবেক এই পর্তুগিজ উপনিবেশ ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই স্বাধীনতা লাভ করে। স্থানীয়দের অনেকের চোখেই স্বাধীনতার পর কেপ ভার্দের ইতিহাসে এই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়াই সবচেয়ে বড় ঘটনা।
ফুটবলই এদেশের এক নম্বর খেলা। অথচ কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশনের পূর্ণকালীন কর্মী মাত্র সাতজন। ঘরের মাঠে আন্তর্জাতিক ম্যাচের টিকিট আজও বিক্রি হয় পাড়ার বেকারি কিংবা পেট্রোল পাম্প থেকে।
৫১ বছর বয়সি জাইর বলেন, 'এই মুহূর্তের জন্য আমরা বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে নিজেদের গড়ে তুলেছি। আজ আমার দাদা-দাদির কথা খুব মনে পড়ছে। কথাটা বলতেই আমার চোখে পানি চলে আসছে, কারণ আমাদের দেশের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটা দেখে যেতে পারেননি তারা।'
'বাকি দুনিয়া বলেছিল: কোনো সুযোগ নেই, অসম্ভব'
ডাউনটাউন বোস্টন থেকে গাড়িতে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ। তারপরই ডরচেস্টারের প্রাণবন্ত ও বৈচিত্র্যময় এলাকা। সেখানেই থনিস বারবারশপ'। সেলুনের ছাদ থেকে ঝুলছে বাতাস ভরা পেল্লায় এক নীল-সাদা হাঙর।
হেভিওয়েটদের পাশে এই বিশ্বকাপে ব্লু শার্কসদের নেহাতই চুনোপুঁটি মনে হতে পারে। কিন্তু তাতে ম্যাসাচুসেটসের এই তল্লাটে এখন বড় স্বপ্নের জাল বোনায় বাধা পড়েনি। কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে দলসংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করেছে ফিফা।
চারদিকে শোভা পাচ্ছে নীল, সাদা আর লাল রঙের স্কার্ফ। একপাশের দেয়ালে টাঙানো পেনান্টে জ্বলজ্বল করছে একটা লেখা—'ফেদেরাসাও কাবো ভেরদিয়ানা দে ফুতবল' (কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন)।
'আমার গ্রাহকরা এখানে শুধু চুল কাটতেই আসেন না, আসেন আড্ডা দিতেও,' বিবিসি স্পোর্টকে বললেন সেলুনের মালিক আন্তোনিও আলভেস। 'আমরা সবাই মিলে একটা বড় পরিবার। জীবন, রাজনীতি, খেলাধুলা—সব নিয়েই আমাদের আড্ডা জমে।'
গত অক্টোবরে কেপ ভার্দে বিশ্বকাপের মূল পর্বে ওঠার পর থেকে আড্ডার বিষয় কেবল একটাই।
'যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে খেলবে, এর চেয়ে বড় পাওয়া আমাদের কাছে আর কিছু হতে পারে না,' বললেন আলভেস। ১৮ বছর বয়সে জন্মভূমি ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি, পরে বাবার ব্যবসার হাল ধরেন।
১৮৫০-এর দশক থেকেই ম্যাসাচুসেটসে কেপ ভার্দের বাসিন্দাদের আগমন। মূলত তিমিশিকারি আর নাবিক হিসেবেই দলে দলে এখানে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কেপ ভার্দেনিয়ান কমিউনিটি এই অঙ্গরাজ্যেই। ধারণা করা হয়, এখানে বসবাসকারী কেপ ভার্দের মানুষের সংখ্যা ৭০ থেকে ৯০ হাজার।
দলকে সমর্থন দিতে আলভেস নিয়মিত জন্মভূমিতে ছুটে যান। ইসওয়াতিনিকে হারিয়ে যেদিন বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিয়েছিল ব্লু শার্কসরা, সেদিন রাজধানী প্রাইয়া-র ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার জাতীয় স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন তিনিও। আনন্দে কেঁদে ভাসিয়েছিলেন গ্যালারির সমর্থকরা।
আলভেস বলেন, 'বাকি দুনিয়া বলেছিল, "কোনো সুযোগ নেই, অসম্ভব! কেপ ভার্দে এতদূর আসতেই পারবে না।" কিন্তু আজ আমরা ঠিকই এখানে।'
প্রাইয়ার আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে কেপ ভার্দের নানা প্রান্তের শিশুরা যাতে মাঠে বসে খেলা দেখার সুযোগ পায়, সেজন্য আলভেস আর তার স্ত্রী নিউজা নিজেদের টাকায় অনেক টিকিট কিনে দিয়েছেন।
আলভেস বলেন, 'কেপ ভার্দেতে ফুটবল খেলা প্রত্যেক বাচ্চারই স্বপ্ন থাকে পেশাদার খেলোয়াড় হওয়ার। যে দ্বীপেই যান না কেন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখবেন বাচ্চারা খেলছে। অনেকের পায়ে জুতোও নেই। ওরা শুধু খেলতে চায়।'
স্থানীয়দের জন্য থনিস বারবারশপের বিশাল টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। সেখানে বিনামূল্যে নাস্তা আর পানীয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
আলভেস বলেন, 'এই কমিউনিটিতে এমন অনেকেই আছেন যারা ফুটবলের তেমন একটা খোঁজখবর রাখেন না। অথচ তারাও এখন সেলুনে এসে নানা প্রশ্ন করছেন।
'খেলা কবে? কোথায় হবে? আমিও কি দেখতে পারব? আমি কি যেতে পারব? খেলা দেখতে আমি কি দোকানে আসব?
'এটাই খেলাধুলার শক্তি—সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলা।'
