ইরান যুদ্ধের প্রভাব: কেন ভারতীয়দের বিদেশ ভ্রমণ ও স্বর্ণ কেনা কমাতে বলছেন মোদি?
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে চাপে পড়েছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এই পরিস্থিতিতে দেশটির নাগরিকদের বিদেশ সফর কমানো, স্বর্ণ কেনা থেকে বিরত থাকা এবং ওয়ার্ক ফ্রম হোম করার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
গত রোববার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হায়দরাবাদে এক জনসভায় তিনি এসব আহ্বান জানান।
মোদি কী বলেন?
মোদি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় যেভাবে বিশ্বজুড়ে 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' বা বাসা থেকে কাজের ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতেও মানুষকে সেই পদ্ধতিতে ফিরতে হবে।
তিনি বলেন, সরাসরি বৈঠকের বদলে অনলাইন মিটিং বাড়ালে জ্বালানির ব্যবহার কমবে।
এ ছাড়া জনগণকে গণপরিবহন ব্যবহার ও কারপুলিংয়ের [গাড়ি ভাগাভাগি] মাধ্যমে যাতায়াত করার আহ্বান জানান তিনি। রান্নার তেলের ব্যবহার কমানোরও পরামর্শ দেন মোদি।
তার ভাষায়, এটি যেমন স্বাস্থ্যকর, তেমনি দেশপ্রেমেরও অংশ।
ভারতের নাগরিকদের অন্তত এক বছর অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ এবং স্বর্ণ কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে কৃষকদের সার ব্যবহারের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনারও অনুরোধ করেন তিনি।
এই আহ্বানের ব্যাখ্যায় মোদি বলেন, 'বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।'
মোদি যে 'বর্তমান পরিস্থিতি'র কথা বলেছেন
মোদি যে 'বর্তমান পরিস্থিতি'র কথা বলেছেন, তা মূলত ইরান যুদ্ধ এবং এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাবকে নির্দেশ করে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের প্রতি ব্যারেলের দাম ছিল ৭২ দশমিক ৮৭ ডলার। সোমবার সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৫ দশমিক ৪৫ ডলারে, যা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি।
যুদ্ধের শুরুর দিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস স্থাপনায় ইরানের হামলার কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। মার্চের শুরু থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করে তেহরান। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
বর্তমানে কেবল নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে। যাত্রার আগে এসব জাহাজকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কাছ থেকে অনুমতি নিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, গত এপ্রিল মাসে ইরানের বন্দরে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজগুলোর ওপর নৌ অবরোধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে আরও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বিমান ভাড়াতেও। ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইট কায়াকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক গন্তব্যে গড় বিমানভাড়া ছিল ১ হাজার ১০১ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।
বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে লেনদেন হওয়া ইউরিয়ার প্রায় অর্ধেক এবং অন্যান্য বিপুল পরিমাণ সার উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে রপ্তানি হয়। যুদ্ধের কারণে সেই সরবরাহও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
মোদি বলেন, 'দেশপ্রেম শুধু সীমান্তে জীবন উৎসর্গের মানসিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই সময়ে দায়িত্বশীলভাবে জীবনযাপন করা এবং প্রতিদিন দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করাও দেশপ্রেমের অংশ।'
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেই দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষা।
ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কত?
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে পর্যন্ত দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৬৯০ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারে। মার্চের শেষের তুলনায় এটি ৭ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ দশমিক ১২ শতাংশ কম।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭২৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালে ভারতের চলতি হিসাবের ঘাটতি (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট-সিএডি) দাঁড়াতে পারে ৮৪ বিলিয়ন ডলারে। সিএডি ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ হলো, দেশটি আয় থেকে বেশি অর্থ ব্যয় করছে।
তেল, স্বর্ণ, বিদেশ ভ্রমণ ও সারের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অর্থবছরে ভারত ১২৩ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এটি দেশটির মোট আমদানি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্বর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ৭২ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ আমদানি করেছে, যা চীনের পর বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
ভ্রমণবিমা প্রতিষ্ঠান অ্যাকোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সময়ে বিদেশ ভ্রমণে ভারতীয়রা ব্যয় করেছেন ৩১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
ভারতের ব্যুরো অব ইমিগ্রেশনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ ভারতীয় বিদেশ সফরে গেছেন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৭৯ লাখ।
ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া আমদানিকারক দেশও। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছর দেশটি প্রায় ১ কোটি টন ইউরিয়া আমদানি করেছে।
কেন এখন এটি ভারতের জন্য উদ্বেগের?
তেল, স্বর্ণ ও সার আমদানির বিপুল ব্যয় এবং বিদেশে ভারতীয়দের খরচের কারণে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমছে।
তবে এসব খরচের মধ্যে তেল ও সারের ব্যবহার কমানো ভারতের জন্য সহজ নয়। জ্বালানি আমদানি দেশটির অর্থনীতি সচল রাখার জন্য অপরিহার্য।
অন্যদিকে, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও খাদ্য সরবরাহ বজায় রাখতে সারের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে অর্ধেকের বেশি পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
ফলে সরকারের নজর এখন মূলত স্বর্ণ কেনা ও বিদেশ ভ্রমণের ব্যয় কমানোর দিকে। তবে মোদির আহ্বানে ভারতীয়রা কতটা সাড়া দেবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
