যুদ্ধও নেই, চুক্তিও নেই: হরমুজ পাহারা দিয়ে জাহাজ পার করার কৌশল ধরেছেন হতাশ ট্রাম্প!
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের 'যুদ্ধও নয়, চুক্তিও নয়'—এমন স্থবিরতায় চরম বিরক্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই অচলাবস্থা ভাঙতে তিনি হরমুজ প্রণালিতে এক বিশেষ সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন, যা শেষ পর্যন্ত পুরোদস্তুর যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একজন মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম 'এক্সিওস'-কে জানিয়েছেন, 'প্রেসিডেন্ট অ্যাকশন চান। তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে রাজি নন। তিনি ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চান এবং একটি চূড়ান্ত দফায় পৌঁছাতে চান।'
'প্রজেক্ট ফ্রিডম' ও সামরিক তৎপরতা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিতে 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' শুরু করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই অভিযানে মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজগুলোকে মাইন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেবে এবং ইরান হামলা করলে তাৎক্ষণিক পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবে।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, ড্রোন এবং ১০০-এর বেশি স্থল ও নৌ-ভিত্তিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হচ্ছে। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের এই সংবেদনশীল এলাকায় ১৫,০০০ অতিরিক্ত সেনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যদিও এখনই সরাসরি প্রতিটি জাহাজকে পাহারা (ফুল-ফ্লেজড এসকর্ট) দেওয়ার পরিকল্পনা নেই, তবে মার্কিন নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী সার্বক্ষণিক 'কাছাকাছি অবস্থানে' টহল দেবে।
নেপথ্যের পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্পকে গত বৃহস্পতিবার রাতে হরমুজ প্রণালি বলপূর্বক উন্মুক্ত করার একটি পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছিল। সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন, যেখানে ইরানের যেকোনো মিসাইল বা স্পিডবোটের আক্রমণ নস্যাৎ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে ট্রাম্প শুরুতে কিছুটা সতর্ক অবস্থান বেছে নিয়েছেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের মতে, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শুরু যা সরাসরি ইরানের সঙ্গে সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সূত্রটি জানায়, 'এই মানবিক মিশনের উদ্দেশ্য হলো জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। যদি ইরানিরা কোনো বাধা দেয়, তবে তারাই অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে এবং আমাদের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বৈধতা তৈরি হবে।'
ইরানের হুঁশিয়ারি
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজে ইরান প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, 'সতর্কবার্তা! হরমুজ প্রণালির নতুন সামুদ্রিক ব্যবস্থায় যেকোনো মার্কিন হস্তক্ষেপ যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য উপসাগর ট্রাম্পের 'বিভ্রান্তিকর পোস্ট' দিয়ে পরিচালিত হবে না।'
কূটনীতির শেষ চেষ্টা?
সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনীতির পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। ট্রাম্পের দূত জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফ এখনো ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে খসড়া প্রস্তাব বিনিময় করছেন। তবে আলোচনার গতি অত্যন্ত ধীর। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, 'আলোচনা চলছে, প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমরা তাদের প্রস্তাব পছন্দ করছি না, আর তারা আমাদেরটা। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান এখনো অস্পষ্ট। বার্তা পৌঁছাতে অনেক সময় লাগছে।'
উইটকফ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদী হলেও প্রশাসনের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে চরম হতাশ।
পরিস্থিতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে হয় খুব দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে, অন্যথায় ট্রাম্পের ভাষায়—যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর 'ভয়াবহ বোমা হামলা' শুরু করবে। আগামী কয়েক দিন হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্য কি নতুন কোনো যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে কি না।
