যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের নতুন শর্ত, খুলে দিতে পারে শত শত কোটি ডলার আয়ের পথ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে শুরু হওয়া যুদ্ধের ইতি টানতে ইরান যেসব শর্ত দিয়েছে, চলতি সপ্তাহে তাতে নতুন এক শর্ত জুড়ে দিয়েছেন ইরানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। এই শর্ত আগে তেহরানের দাবিদাওয়ার তালিকাতেও ছিল না। আর সেটা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালির সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। হরমুজই এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একই সঙ্গে এটি বছরে সম্ভাব্য শত শত কোটি ডলার আয়ের উৎস এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে তেহরান।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই তার ওপর হামলার ক্ষেত্রে এই প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়ে এসেছে। তবে বাস্তবে আক্রান্ত হলে সত্যিই সেটা কার্যকর করবে—বা বৈশ্বিক বাণিজ্যে তা এত বড় প্রভাব ফেলবে—এমনটি খুব কমই প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু এর প্রভাবের ব্যাপ্তি তেহরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, এবং নতুন দাবিগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই প্রভাবকে আরও স্থায়ী সুবিধায় রূপ দিতে চায় তারা।
মাত্র ২৪ মাইল প্রস্থের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ
সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে হরমুজ প্রণালি-এর প্রস্থ মাত্র ২৪ মাইল। এটি ইরান ও ওমানের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত, যেখানে দুই দেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড) মাঝামাঝি এসে মিলিত হয়েছে। জলপথটি সরু হওয়ায় জাহাজের চলাচলের সুযোগ সীমিত, ফলে আক্রমণের ক্ষেত্রে জাহাজগুলোর পক্ষে দ্রুত দিক পরিবর্তন বা পালানোর সুযোগ কম থাকে—যা ইরানের জন্য সুবিধাজনক।
ইরানের হামলার কারণে এই সংকীর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এমনকি পারস্য উপসাগরের বাইরের দেশগুলোকেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান দীনা এসফানদিয়ারি বলেন, "হরমুজ কৌশল কতটা সফল হয়েছে—এটি কতটা কম খরচে এবং তুলনামূলকভাবে সহজে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করে রাখতে পারে—তা দেখে ইরান নিজেও কিছুটা বিস্মিত হয়েছে।"
তিনি বলেন, "এই যুদ্ধ থেকে তারা একটি বড় শিক্ষা পেয়েছে—নতুন ধরনের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা আবিষ্কার করেছে, যা ভবিষ্যতেও ব্যবহার করতে পারে। আর এই ক্ষমতাকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোও সেই উপলব্ধির অংশ।"
এই ঝুঁকি সম্পর্কে ওয়াশিংটনও সচেতন। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের টোল আরোপের চেষ্টা।
ফ্রান্সে জি-৭ জটের বৈঠক শেষে তিনি বলেন, "এটি শুধু অবৈধই নয়, বরং অগ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিপূর্ণ। এর মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রস্তুতি থাকা জরুরি।"
জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও নিরাপদ ও টোলমুক্ত নৌ-চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠার "চূড়ান্ত প্রয়োজনীয়তা" তুলে ধরেন।
ইরানের নতুন কৌশল
হরমুজ প্রণালির বাড়তে থাকা কৌশলগত গুরুত্বের ইঙ্গিত দিয়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রথম ভাষণে মোজতবা খামেনি বলেন, এই জলপথ বন্ধের মাধ্যমে অর্জিত প্রভাব "অব্যাহতভাবে ব্যবহার করতে হবে।"
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরান মূলত দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানালেও—হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো দাবি ছিল না।
বর্তমানে ইরান এই প্রভাবকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশটির আইনপ্রণেতারা এমন একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছেন, যাতে প্রণালি ব্যবহার করে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনকারী দেশগুলোকে টোল দিতে হবে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতার এক উপদেষ্টা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে "হরমুজ প্রণালির জন্য নতুন ব্যবস্থা" চালুর কথাও বলেছেন।
এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে তেহরান প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ওপর সামুদ্রিক বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহারের বিষয়টি তার ভূরাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক আইন ও বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ওয়ার কলেজের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞ জেমস ক্রাস্কা বলেন, "যাতায়াতের ওপর ফি আরোপ করা ট্রানজিট প্যাসেজের নিয়মের লঙ্ঘন।"
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় হরমুজের মতো আন্তর্জাতিক প্রণালিতে উপকূলীয় রাষ্ট্রের ফি আরোপের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
তিনি আরও বলেন, "হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য ব্যবহৃত একটি জলপথ, যেখানে ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা রয়েছে… তবে এটি আন্তর্জাতিক প্রণালি হওয়ায় সব দেশের জন্য বাধাহীন যাতায়াতের অধিকার প্রযোজ্য।"
এই নিয়মগুলো জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (ইউএনসিএলওএস)-এ নির্ধারিত। যদিও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কেউই এই সনদের সদস্য নয়, তবুও এর অনেক মূলনীতি আন্তর্জাতিক প্রচলিত আইনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ইরান তার সদস্য না হওয়াকে নিজের অবস্থান জোরদারে ব্যবহার করতে পারে।
সুয়েজ খালের সমান আয়?
এত বিতর্কের মধ্যেও ইরান সম্ভাব্য টোল ব্যবস্থা কেমন হতে পারে এবং তা থেকে কত আয় হতে পারে—তা নিয়ে পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য টোল ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হলেও—সফল হলে এর আয় সুয়েজ খালের সমপর্যায়ের হতে পারে।
সাধারণ সময়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা প্রায় ১০টি বৃহৎ তেলবাহী জাহাজের সমান। প্রতি ট্যাংকারে যদি ২০ লাখ ডলার ফি নেওয়া হয়, তবে দৈনিক আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ কোটি ডলার এবং মাসিক আয় প্রায় ৬০ কোটি ডলার।
এর সঙ্গে এলএনজিবাহী জাহাজ থেকে নেওয়া টোল যুক্ত হলে মাসিক আয় ৮০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ২০২৪ সালে ইরানের মাসিক তেল রপ্তানি আয়ের ১৫-২০ শতাংশের সমান।
তুলনামূলকভাবে, মিশর বছরে সুয়েজ খাল থেকে মাসে ৭০-৮০ কোটি ডলার আয় করে। তবে লোহিত সাগরের অস্থিরতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এই আয় কমে গেছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও বাস্তব প্রয়োগ
ইরানের ওপর আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে, হরমুজ প্রণালি থেকে আয় করার পরিকল্পনা ইরানের অর্থনৈতিক চাপ কমানোর একটি উপায় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এসফানদিয়ারি বলেন, এটি "সহজ" ও "কম খরচের" একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে ইরানের সীমিত প্রবেশাধিকারের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।
রাশিয়ার পরেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে ইরান দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
ইরান বারবার বলছে, হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে—তবে এখান দিয়ে জাহাজের চলাচল শর্তহীন নয়। "শত্রুভাবাপন্ন নয়" এমন দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে তেহরান। এই অবস্থান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনকেও জানিয়েছে দেশটি।
একই সময়ে বাস্তবে নিয়ন্ত্রিত চলাচল ব্যবস্থা কেমন হতে পারে, তা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে তেহরান। জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, কিছু ট্যাংকার হরমুজ পারি দেওয়ার সময় ইরানের উপকূলঘেঁষা রুট ব্যবহার করছে এবং নিরাপদ যাতায়াতের জন্য কিছু অপারেটর অর্থ পরিশোধ করেছে বলেও খবর রয়েছে।
যদিও কোনো দেশ বা জাহাজের পরিচালক সংস্থা প্রকাশ্যে অর্থ প্রদানের কথা স্বীকার করেনি। তবে লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে, ২০টির বেশি জাহাজ নতুন একটি করিডোর ব্যবহার করেছে এবং অন্তত দুটি জাহাজ নিরাপদ যাতায়াতের জন্য অর্থ দিয়েছে। এরমধ্যে একটি জাহাজ দিয়েছে প্রায় ২০ লাখ ডলার।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর অনুমোদিত জাহাজের জন্য একটি নিবন্ধন ব্যবস্থাও চালু করেছে। পাশাপাশি কিছু দেশ তাদের ট্যাংকারের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সরাসরি তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
লয়েডস লিস্টের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মীড সিএনএনকে বলেন, "এটি ইতোমধ্যেই ঘটছে। (ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক) আলোচনায় অগ্রগতি না হলে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে। এই মুহূর্তে বৈশ্বিক শিপিং শিল্প কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে।"
