নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্পগুলোর অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করবে সরকার
পাইপলাইনে থাকা বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্পগুলোর নতুন অগ্রাধিকার তালিকা করছে সরকার। নতুন সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে মিলিয়ে এই অগ্রাধিকার তালিকা পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা।
১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নিজেদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এরইমধ্যে তারা ফ্যামিলি কার্ড চালু এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সরকারের এই উন্নয়ন অগ্রাধিকারগুলোর প্রতিফলন ঘটবে। এটিই হতে যাচ্ছে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, অগ্রাধিকার পাওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সরকারি তহবিলের বরাদ্দের পাশাপাশি বিদেশি অর্থায়নও নিশ্চিত করবে সরকার। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্তমানে পাইপলাইনে থাকা বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্পগুলো নতুন করে রিভিউ করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে এ বিষয়ে তাদের প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছে।
ইআরডির হালনাগাদ তথ্যানুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি পর্যন্ত) ২.২৭ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ঋণ চুক্তি সই হয়েছে।
বিগত কয়েক বছর ধরে নিজেদের অগ্রাধিকারমূলক উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোতে অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ সাধারণত প্রতি বছর ৯ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি সই করে আসছে।
তবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদে খুব বেশি ঋণ চুক্তি সই হয়নি। কারণ সে সময়ে প্রশাসন নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার চেয়ে বিদেশি ঋণের ঝুঁকি কমানোকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল।
ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশোধিত অগ্রাধিকার তালিকার খসড়া তৈরি করতে শুরু করেছে ইআরডি। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতি বছরের শেষ প্রান্তিক এবং আগামী জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন অর্থবছরের জন্য তালিকাটি করা হচ্ছে।
জানুয়ারি মাস পর্যন্ত পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলোর জন্য ঋণ প্রস্তাবের পরিমাণ ছিল ৪৬.৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১৮.৭ বিলিয়ন, বিশ্বব্যাংক থেকে ১.৮ বিলিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১৫.২ বিলিয়ন, চীন থেকে ৩.৮ বিলিয়ন ও জাপান থেকে ৯১১ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি), নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ঋণ প্রস্তাবও এই তালিকায় রয়েছে।
অগ্রাধিকার পরিবর্তন
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, 'বর্তমানে পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলো নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে।'
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বিশদ আলোচনার পরই প্রকল্পগুলোকে নিয়মিত ঋণ কর্মসূচির পাইপলাইনে তালিকাভুক্ত করা হয়। এরপর এই তালিকা থেকেই প্রতি বছর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঋণ চুক্তি সই করে সরকার।
ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন সরকার আগের আমলে পাইপলাইনে অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি প্রকল্প তালিকা থেকে বাদ দিতে পারে। তবে ঢালাওভাবে প্রকল্প বাতিল হওয়ার সুযোগ কম। কারণ খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসাবে প্রকল্পগুলো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যেমন এডিবির অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন সাসেক ধীরাশ্রম ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো (আইসিডি) প্রকল্প। এরকম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সরকার বাদ দেবে না বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
নজরে থাকা বড় প্রকল্পগুলো
ইআরডির অধীনে বিশ্বব্যাংকের পাইপলাইনে মোট ছয়টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাত উন্নয়ন কর্মসূচি নামক প্রকল্পটিকে 'হাইলি প্রোবাবল' ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে।
ইআরডির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ঋণ কর্মসূচিতে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে ৪৩টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু বড় ও প্রভাবশালী অবকাঠামো প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত আছে। যেমন শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়কে মেঘনা সেতু নির্মাণ, পতেঙ্গায় চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনালের সঙ্গে রেলসংযোগ স্থাপন, এমআরটি লাইন-৪ এবং এডিবির সঙ্গে যৌথ অর্থায়নে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট প্রকল্প।
ইআরডির তথ্যমতে, বর্তমানে পাইপলাইনে চীনের অর্থায়নে ৯টি প্রকল্প রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—আখাউড়া-সিলেট রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর রেল করিডোরের সম্প্রসারণ, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের আধুনিকায়ন।
বড় ঋণদাতাদের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থারও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে এআইআইবির ১৫টি প্রকল্পে ৩.৫৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে এনডিবি ছয়টি প্রকল্পের জন্য ১.০৬ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছে।
এছাড়া চলতি অর্থবছরে জাপানের অর্থায়নে পাঁচটি প্রকল্পের ঋণ চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ ৯১১ মিলিয়ন ডলার।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন টিবিএসকে বলেন, সরকারকে এখন দুটি বিষয় মূল্যায়ন করতে হবে। প্রথমত, কোন খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত এবং দ্বিতীয়ত, ওই খাতগুলোর অধীনে থাকা নির্দিষ্ট প্রকল্পগুলোর মধ্যে কোনগুলো সবচেয়ে জরুরি।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তাসহ বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। 'এ কারণেই খাদ্য নিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।'
তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'এছাড়া বন্দর ব্যবস্থার সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। আর টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।'
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ-এর (পিইবি) চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমান সরকারের নিজস্ব উন্নয়ন ও প্রকল্প অর্থায়ন কৌশল থাকবে—সেটাই স্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, অগ্রাধিকারের তালিকা পুনর্নির্ধারণ হওয়া স্বাভাবিক। তবে আগের সরকারে কিছু প্রকল্প, যেগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয় অথবা সামাজিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশের জন্য ভালো হবে, সেগুলো যাতে অগ্রাধিকার থেকে যেন বাদ না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
পিইবি চেয়ারম্যান বলেন, 'শুধু অগ্রাধিকার তালিকা করলেই হবে না। উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন সঠিক হতে হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে হবে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে। এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।'
