অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদ ও গণতন্ত্রের দাবিতে আরব বসন্তের সূতিকাগার তিউনিসিয়ায় বিরল বিক্ষোভ
গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার দাবিতে শনিবার তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসের রাজপথে নেমে আসেন হাজার হাজার মানুষ। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় প্রেসিডেন্ট কায়েস সাঈদ মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছেন—এমন অভিযোগ তুলে তার নীতির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই গণবিক্ষোভ হয়।
তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়ন (ইউজিটিটি) এবং মানবাধিকার লীগ, বার অ্যাসোসিয়েশন ও সাংবাদিক ইউনিয়নসহ একাধিক প্রভাবশালী সংগঠনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই প্রতিবাদ ছিল সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। বছরের পর বছর ধরে চলা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে বিরোধীরা যে দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তা কাটিয়ে উঠে সাঈদের ক্ষমতার প্রতি এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ঐক্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বছরের পর বছর ধরে বিরোধে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী দলগুলো আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, বেকার যুবক এবং সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোর সাথে এই বিক্ষোভে যোগ দেয়।
বিক্ষোভকারীরা ইউজিটিটি-র সদর দফতর মোহাম্মদ আলী স্কোয়ারে সমবেত হন এবং সেখান থেকে মিছিল নিয়ে হাবিব বোরগুইবা অ্যাভিনিউয়ের দিকে এগিয়ে যান। ১৫ বছর আগে এই হাবিব বোরগুইবা অ্যাভিনিউ থেকেই আরব বসন্তের দাবানল জ্বলে উঠেছিল।
রাজধানীর রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন এলাকায় শত শত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল এবং বেশ কিছু সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। "তিউনিসিয়া সবার আগে... জনগণের স্বার্থ সবার ওপরে" স্লোগানকে সামনে রেখে তিউনিসিয়ার জাতীয় পতাকা নেড়ে বিক্ষোভকারীরা এই সমাবেশ পালন করেন।
জনতার উদ্দেশ্যে ইউজিটিটি-র মহাসচিব সালাহ এদ্দিন সালমি বলেন, 'আজ তিউনিসিয়ার সংকটের মূল কারণ হলো এক ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত হওয়া।'
রয়টার্সের তথ্যমতে, বিক্ষোভকারীরা স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন বন্ধ করা এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারে হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিতে নানা স্লোগান দেন।
ব্যাপক বেকারত্ব, বাজে নাগরিক সেবা এবং সরকারের তথাকথিত 'ভুয়া প্রতিশ্রুতি'র বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা নানা ব্যানার বহন করেন ও স্লোগান দেন।
ব্যানারগুলোতে লেখা ছিল, 'স্বাধীনতা ছাড়া কোনো গণতন্ত্র নেই, দারিদ্র্যের মাঝে কোনো মর্যাদা নেই এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা বন্ধ করো।'
বিক্ষোভকারীরা সমস্বরে স্লোগান দেন, 'হে ব্যর্থ শাসক... পদত্যাগই একমাত্র সমাধান।'
তিউনিস থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত স্ফ্যাক্স থেকে আসা ইয়াছিন গার্সেলি নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, 'অনেক হয়েছে, আর না! দেশ ধসে পড়ছে। আমরা একের পর এক পানি ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো সংকটে ভুগছি।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি স্ফ্যাকস থেকে এসেছি আমার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াতে। আমি কোনোভাবেই দমে যাব না, এমনকি যদি আমি দেশের শেষ প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরও হই।'
তিউনিসিয়ার ন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান বুবাকের বিন থাবেত বলেন, 'আন্তর্জাতিক সনদ ও সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত নাগরিকদের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার রক্ষায় সুশীল সমাজ আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।'
বিক্ষোভকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও স্লোগান দেন, 'কোনো ভয় নেই, কোনো আতঙ্ক নেই... রাজপথ জনগণের, এবং স্বাধীনতা চাই! পুলিশি রাষ্ট্রব্যবস্থার অবসান হোক।'
তারা তিউনিসিয়ার বিপ্লবের সেই বিখ্যাত স্লোগানটি পুনরুজ্জীবিত করেন, যা পরবর্তীতে পুরো অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, 'জনগণ সরকারের পতন চায়।'
বিক্ষোভকারীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্লোগান দেন, একে "ব্যর্থতার সরকার" হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তাদের পদত্যাগ দাবি করেন।
তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং সরকারি সেবার চরম অবনতির মধ্যেই এই বিক্ষোভের সূচনা হয়। দেশটিতে ঘন ঘন পানি ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
তাছাড়া কাজের দাবিতে এবং এক দশক ধরে বেকার থাকা ব্যক্তিদের চাকরির সুযোগ দিতে এক বছর আগে পাস হওয়া আইন দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে বেকার যুবকদের ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এই মিছিলের আয়োজন করা হয়।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো কায়েস সাঈদের শাসনের বিরোধিতাকারী সেইসব ডজনখানেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মুক্তির দাবি জানাচ্ছে, যারা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দি রয়েছেন।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সাঈদের বিরুদ্ধে সুশীল সমাজের ওপর দমনপীড়ন তীব্র করা এবং সাংবাদিক ও বিরোধী নেতাদের কারারুদ্ধ করার অভিযোগ এনেছে। তাদের মতে, সাঈদ পুরো দেশটিকে একটি "উন্মুক্ত কারাগারে" পরিণত করেছেন।
তবে সাঈদ স্বৈরাচার ও দমনপীড়নের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তিনি কোনো স্বৈরাচারী শাসক নন। যাদের তিনি 'প্রতারক', 'দুর্নীতিবাজ' ও 'ষড়যন্ত্রকারী' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, তাদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সামাজিক অসন্তোষ উসকে দিতে এবং ভেতর থেকে দেশকে অস্থিতিশীল করতে তার বিরোধীরা কৃত্রিম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
২০২১ সালে কায়েস সাঈদ রাষ্ট্রের অধিকাংশ ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন। পরবর্তীতে তিনি নির্বাচিত পার্লামেন্ট ভেঙে দেন, ডিক্রির মাধ্যমে দেশ পরিচালনা শুরু করেন, জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিল করেন এবং ডজনখানেক বিচারককে বরখাস্ত করেন—যা সমালোচকদের মতে ছিল এক ধরনের 'অভ্যুত্থান'।
