ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে বিভ্রান্তি, মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের
ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত।
২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের সময় ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অনুমতি ছাড়াই যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার তথ্য সংগ্রহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের অভিযোগ ছিল, ব্যবহারকারীদের তথ্য কারা দেখতে পারতেন, সে বিষয়ে মেটা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে।
রায়ের তিন সপ্তাহের বেশি সময় পর বুধবার (২১ অক্টোবর) দেওয়া আদেশে বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ লেখেন, 'বছরের পর বছর ধরে ফেসবুকের অনিয়ম হয়েছে এবং তা পরিকল্পিতভাবে জনসমক্ষে প্রচার করা হয়েছে। বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।'
অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী বিচারক মেটার বিরুদ্ধে ২১৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরিমানা করার ভিত্তি রয়েছে বলে উল্লেখ করলেও শেষ পর্যন্ত তা কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলারে নির্ধারণ করেন।
তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে তা বাতিলের বিষয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন মেটার প্রধান আইন কর্মকর্তা সি জে মাহোনি। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'এই রায় এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের পদক্ষেপের ফলে নিউ মেক্সিকোতে ব্যবসা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। মূলত এই মামলার মাধ্যমে অনলাইনে মানুষ কী বলতে পারবে, সে বিষয়ে নতুন নিয়ম কার্যকর করতে মতপ্রকাশের ওপর কর আরোপের চেষ্টা করা হচ্ছে।'
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এটি অন্যতম বড় আর্থিক জরিমানা।
ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির জেরে এর আগে ২০১৯ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) মেটাকে ৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল।
এ ছাড়া একই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় গত আগস্টে ছয়টি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে ১৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতার অংশ হিসেবে মেটা মোট ৪৫৯ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার পরিশোধে সম্মত হয়। কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার অভিযোগে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা দাবি নিষ্পত্তিতেও ওই সমঝোতা করা হয়েছিল।
পাঁচ বছর আগে করা মামলা
ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ২০২১ সালে মেটার বিরুদ্ধে মামলাটি করে নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। তাদের অভিযোগ ছিল, তৃতীয় পক্ষের একটি অ্যাপের মাধ্যমে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা সর্বোচ্চ ৮ কোটি ৭০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছিল।
মামলায় আরও বলা হয়, ব্যবহারকারীদের তথ্য কারা ব্যবহার করতে পারতেন, সে বিষয়ে মেটা মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ন্ত্রণেও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। মেটা জানত যে তৃতীয় পক্ষের হাতে ব্যবহারকারীদের তথ্য পৌঁছানোর অবাধ সুযোগ রয়েছে; কিন্তু আর্থিক লাভের আশায় তারা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও অন্যান্য ক্ষতিকর কনটেন্টের বিস্তার সহ্য করেছে।
বর্তমানে বিলুপ্ত ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে ভোটারদের প্রোফাইল তৈরি ও নির্দিষ্ট ভোটারদের লক্ষ্য করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাত।
বুধবারের রায়ের পর আলবুকার্কিতে এক সংবাদ সম্মেলনে নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ বলেন, 'বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে বাকি ছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'আজকের রায় অতীতের সেই অবস্থান থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি। প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোসহ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য এটি একটি পরিষ্কার সতর্কবার্তা। আমরা আমাদের জনগণ ও ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে চাই।'
কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের প্রভাব নিয়ে মেটা বর্তমানে হাজারো মামলার মুখোমুখি এবং এ নিয়ে আইনপ্রণেতাদের চাপও বাড়ছে। আগামী সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত আরেকটি মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
রায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আপিলের আশঙ্কা
গত সেপ্টেম্বরে বিচার চলাকালে জুরিরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তথ্যের গোপনীয়তা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে মেটা ও এর নেতৃত্ব ২৬টি বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছিল।
জুরিদের হিসাবে, এসব বক্তব্যের সম্ভাব্য শ্রোতা ও দর্শকের সংখ্যা বিবেচনায় মেটা নিউ মেক্সিকোর ভোক্তা সুরক্ষা আইন ৪ কোটি ৩০ লাখের বেশি বার লঙ্ঘন করেছে।
গত ১ অক্টোবরের শুনানিতে নিউ মেক্সিকোর আইনজীবী র্যান্ডি ম্যাকগিন বিচারক ম্যাথিউর কাছে ৩৫ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলার জরিমানার আবেদন করে বলেন, 'আদালতের উচিত মেটাকে এমন ভাষায় জবাব দেওয়া, যে ভাষা প্রতিষ্ঠানটি বোঝে। সেই ভাষা হলো অর্থ এবং শেয়ারের দামের মূল্য।'
অন্যদিকে মেটা আদালতে দেওয়া নথিতে জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে সীমিত রাখার আবেদন করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, তারা ব্যবহারকারীদের তথ্য বিক্রি করে না এবং কোনো ব্যবহারকারী বাস্তবে বিভ্রান্ত হয়েছেন—নিউ মেক্সিকো এমন কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।
