ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে পুতিনকে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত
ইউরোপের বুকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী রণাঙ্গনে রূপ নিয়েছে ইউক্রেন। এই সংঘাতের অবসানে ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। উইটকফের রাশিয়া সফরকালে আজ বুধবার (২১ অক্টোবর) সেন্ট পিটার্সবার্গের গ্র্যান্ড ইম্পেরিয়াল কনস্টান্টাইন প্যালেসে তাঁদের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা আবারো শুরু করা এবং যুদ্ধের ইতি টানতে বেশ কিছু 'নতুন কূটনৈতিক ধারণা' পর্যালোচনার জন্য পুতিনকে জোর আহ্বান জানান উইটকফ।
ট্রাম্পের বিশেষ দূত উইটকফ এনিয়ে ৯ম বারের মতো পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করলেন। এই বৈঠকের শুরুতেই রাশিয়ার পক্ষ থেকে বিশেষ 'সদিচ্ছার নিদর্শন' হিসেবে রাশিয়ায় হাতে বন্দি থাকা সাবেক মার্কিন শিক্ষক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেওয়া হয়।
উভয়পক্ষের আলোচনাকালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট সামলাতে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন। পুতিন উল্লেখ করেন, তেহরানের সাথে রাশিয়ার কয়েক দশকের সুদৃঢ় কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, যাকে কাজে লাগিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে মস্কো। এ ছাড়া মার্কিন কৃষকদের সহায়তা করতে রাশিয়া বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার সরবরাহ করতে রাজি বলেও জানান তিনি।
আগামী মাসে চীনে ট্রাম্পের সাথে এক সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকের বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেন পুতিন, যা ক্রেমলিনের প্রস্তাব অনুযায়ী চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ত্রিপক্ষীয় ফোরামে রূপ নিতে পারে।
পুতিন–উইটকফের এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন কিয়েভ এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ঘোর সংশয় ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম মূল ভিত্তি যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে 'রিয়েল-টাইম' গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ, যা সম্প্রতি বন্ধ রাখা রয়েছে। একইসঙ্গে ইউক্রেনের জন্য মার্কিন সামরিক স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ ধীরগতির করার যে অভিযোগ ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে উঠেছে, তা কিয়েভকে যুদ্ধক্ষেত্রে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় ক্ষমতায় এসে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার যে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার দুই বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ অচলাবস্থার পর ট্রাম্প এখন কিয়েভকে যেকোনো মূল্যে চুক্তি করতে বাধ্য করার জন্য কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। গত মঙ্গলবার তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় কিয়েভকে সতর্ক করে বলেন যে—এখনই সময় ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধের পথ খোঁজা, নাহলে তাদের "অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতির" মুখোমুখি হতে হবে।
কনস্টান্টাইন প্যালেসে বৈঠকের শুরুতেই স্টিভ উইটকফ পুতিনকে স্পষ্ট করে জানান, ওয়াশিংটনের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে ইউক্রেন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবারও একটি আনুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
তিনি বলেন, "আজকের এই আলোচনা থেকে আমার মূল প্রত্যাশা হলো—ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করা নিয়ে একটি কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। আজই চূড়ান্ত কোনো সমাধান না মিললেও, পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে—তা নিয়ে কথা বলা ও বিবেচনা করাই হবে এক বিশাল অগ্রগতি; আর পুরো বিশ্ব সেটি শোনার জন্যই অপেক্ষা করছে।"
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান যুদ্ধ শুরু হলে—মার্কিন মধ্যস্থতায় ইউক্রেন-রাশিয়া শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টা পুরোপুরি থমকে যায়।
তাছাড়া, সম্ভাব্য কোনো শান্তিচুক্তির শর্তাবলী নিয়ে ইউক্রেন ও রাশিয়ার অবস্থান বিপরীত দুই মেরুতে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেনকে একটি সমঝোতায় আসার জন্য চাপ আরও জোরদার করেছেন।
