মঙ্গলের দুটি ক্ষুদ্র চাঁদের অস্তিত্ব থাকার কথা নয়; রহস্য উন্মোচনে নতুন অভিযান জাপানের
মঙ্গল গ্রহের দুটি উপগ্রহ এখন আলোচনার কেন্দ্রে।মঙ্গল গ্রহের বহু অমীমাংসিত রহস্য রয়েছে, তবে জাপানের নেতৃত্বে পরিচালিত 'মার্শিয়ান মুন্স এক্সপ্লোরেশন' (এমএমএক্স) প্রকল্পটি এর চারপাশে আবর্তনরত অন্যতম দুটি বৃহৎ কৌতুহলের বিষয় নিয়ে কাজ করবে।
ফোবোস এবং ডিমোস নামক এই ক্ষুদ্র ও অসমান আকারের উপগ্রহ দুটি দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে, যা থেকে তারা মঙ্গলের শুরুর দিকের ইতিহাস সম্পর্কে বিভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়ার আশা করছেন।
মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে অবস্থিত নাসার গদার্দ স্পেস ফ্লাইটিং সেন্টারের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী এবং এমএমএক্স অভিযানের অংশগ্রহণকারী বিজ্ঞানী ডক্টর ড্যানিয়েল গ্লাভিন বলেন, 'সৌরজগৎ গঠনের প্রধান অমিমাংসিত রহস্যগুলোর মধ্যে একটি হলো ফোবোস এবং ডিমোসের উৎপত্তি, আর তাই বিষয়টি উদঘাটন করতে আমাদের এমন একটি অভিযানের প্রয়োজন।'
এর আগের মঙ্গল অভিযানগুলো যখনই সুযোগ পেয়েছে, তখনই এই অদ্ভুত উপগ্রহ জুটিকে পর্যবেক্ষণ করেছে। বিগত বছরগুলোতে লাল গ্রহটিকে প্রদক্ষিণকারী অরবিটারগুলো এই পাথুরে উপগ্রহগুলোর ছবি তুলেছে, অন্যদিকে কিউরিওসিটি ও পারসিভিয়ারেন্স-এর মতো রোভারগুলো মঙ্গল ও সূর্যের মাঝখান দিয়ে ফোবোসের অতিক্রম করার চমৎকার "গুগলি আই" (উদ্ভট চোখের মতো) গ্রহণের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেছে। তবে কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও, বিজ্ঞানীরা এখনও জানেন না ফোবোস ও ডিমোসের সৃষ্টি কীভাবে হয়েছিল।
ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাদেনায় অবস্থিত নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির গবেষণা বিজ্ঞানী ডক্টর অ্যাবিগেইল ফ্রেম্যান বলেন, 'মহাকাশের এই ছোট্ট আলু আকৃতির বস্তুগুলো আসলে কী? আমরা এই মুহূর্তে ফোবোস বা ডিমোসের ব্যাখ্যা দিতে পারছি না। এদের তো অস্তিত্বই থাকার কথা নয়, অথচ এরা রয়েছে। এরা ভীষণ অদ্ভুত, অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং খুবই রহস্যময়।'
সোমবার জাপানের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোর ৪:৪১ মিনিটে দক্ষিণ-পশ্চিম জাপানের কাগোশিমা প্রিফেকচারের 'জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি'র তানেগাশিমা স্পেস সেন্টারের ইয়োশিনোবু লঞ্চ কমপ্লেক্স থেকে 'এইচ৩' রকেটে চড়ে এমএমএক্স মহাশূন্যের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এই রোবোটিক অভিযানটি একটি আন্তর্জাতিক যৌথ উদ্যোগ—যেখানে নাসা, ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি (ইএসএ), ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর স্পেস স্টাডিজ এবং জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টারের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ফোবোস থেকে ১০ গ্রামেরও বেশি (০.৪ আউন্স) নমুনা সংগ্রহ করে ২০৩১ সালে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা।
এমএমএক্স-এর তোলা বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও সংগৃহীত নমুনা ফোবোস এবং ডিমোসের উৎপত্তির অজানা ইতিহাসের নিখোঁজ সূত্রগুলোর জট খুলতে পারে—এমনকি লাল গ্রহটি সম্পর্কেও নানা অজানা তথ্য প্রকাশ করতে পারে। সংগৃহীত নমুনার মধ্যে যদি মঙ্গলের কোনো অংশ বা কণা থাকে, তবে চীনের সাথে চলা প্রতিযোগিতায় এটিই হতে পারে পৃথিবীতে মঙ্গলের নমুনা সফলভাবে ফিরিয়ে আনা প্রথম কোনো মহাশূন্য অভিযান।
একটি রহস্যময় চাঁদে অবতরণ
১৮৭৭ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আসাফ হল লাল গ্রহটির এই অস্বাভাবিক উপগ্রহ দুটি আবিষ্কার করেন। রোমান যুদ্ধদেবতা 'মার্স'-এর পৌরাণিক দুই পুত্রের নামানুসারে তিনি এদের নামকরণ করেছিলেন: ফোবোস (যার অর্থ 'ভয়') এবং ডিমোস (যার অর্থ 'আতঙ্ক')।
ফোবস হলো একটি অভিশপ্ত বা ধ্বংসের মুখে থাকা চাঁদ, যা প্রতি ১০০ বছরে মঙ্গলের দিকে ৬ ফুট (১.৮ মিটার) করে এগিয়ে আসছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, প্রায় ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) বছরের মধ্যে এই অসমান আকারের পাথুরে উপগ্রহটি হয় মঙ্গলের বুকে আছড়ে পড়বে, না হয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মঙ্গলের কক্ষপথে একটি পাথুরে বলয়ে (রিং) পরিণত হবে। এই উপগ্রহটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো 'স্টিকনি গহ্বর'—এটি প্রায় ৬ মাইল (৯.৭ কিলোমিটার) চওড়া একটি বিশাল গর্ত, যা এই খুদে চাঁদের পৃষ্ঠদেশের প্রায় অর্ধেক জায়গা জুড়ে রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে হাজার হাজার উল্কাপাতের আঘাতেও ফোবসের উপরিভাগ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।
অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত দূরে থাকা এবং তুলনামূলক ছোট ডিমোস ধীরে ধীরে মঙ্গল গ্রহ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই চাঁদটির উপরিভাগ ফোবসের চেয়ে কিছুটা মসৃণ হলেও এটিও প্রচুর গর্তে ভরা এবং এক রহস্যময় পরিমাণে ধুলায় ঢাকা।
এই অদ্ভুত উপগ্রহ দুটি কীভাবে মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে এসে পৌঁছাল, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা প্রধানত দুটি তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করছেন। গ্লাভিন বলেন, একটি ধারণা অনুযায়ী—কোনো বড় বস্তু মঙ্গলের সাথে সজোরে ধাক্কা খেয়েছিল, যার ফলে ছিটকে পড়া পাথুরে উপাদানগুলো একত্রিত হয়ে ফোবস ও ডিমোসের সৃষ্টি করেছে। অন্য তত্ত্বটিতে বলা হয় যে, চাঁদ দুটি আসলে এমন দুটি গ্রহাণু, যা মঙ্গলের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল এবং এর মহাকর্ষ বলের টানে আটকা পড়েছিল।
এমএমএক্স অভিযানের অংশগ্রহণকারী বিজ্ঞানী ফ্রিম্যান আরও বলেন, 'আমাদের কোনো তথ্যই এই দুই তত্ত্বের কোনোটির সাথে পুরোপুরি মিলে যায় না। জাপানের এই রহস্যময় উপগ্রহ অভিযান এমন নতুন তথ্য খুঁজে পেতে পারে যা বিদ্যমান তত্ত্বগুলোর কোনো একটিকে সমর্থন করবে অথবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো উৎপত্তির ইতিহাস উন্মোচন করবে।'
এই অভিযানটি মূলত মঙ্গল গ্রহের কাছাকাছি থাকা এবং তুলনামূলক বড় চাঁদ 'ফোবোস'-এর ওপর নজরদারি ও সেখানে যাওয়ার দিকেই বেশি মনোনিবেশ করবে; তবে পথিমধ্যে এটি ডিমোসের ছবিও তুলবে, যাতে বিজ্ঞানীরা এই যমজ চাঁদের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন।
'ইডেফিক্স' নামের একটি ছোট রোভার বহনকারী এমএমএক্স মহাকাশযানটি—যেটিতে প্রপালশন, এক্সপ্লোরেশন এবং পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য তিনটি মডিউল রয়েছে—মঙ্গল গ্রহে পৌঁছাতে প্রায় এক বছর সময় নেবে এবং এরপর প্রায় তিন বছর ধরে ফোবসের কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করবে।
মহাকাশযানটির ল্যান্ডার বা অন্বেষণ মডিউলে থাকা একগুচ্ছ বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বিজ্ঞানীদের ভূখণ্ড, খনিজ, রাসায়নিক উপাদান এবং মহাজাগতিক বিকিরণের পরিমাপসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে সহায়তা করবে। এছাড়া, দুটি সুপার হাই-ভিশন ক্যামেরা ৪কে এবং ৮কে রেজোলিউশনে মঙ্গল ও এর চাঁদগুলোর সর্বোচ্চ হাই-ডেফিনেশন ছবি তুলবে।
মহাকাশযানটি জার্মানির মহাকাশ কেন্দ্র এবং ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর স্পেস স্টাডিজের যৌথ উদ্যোগে তৈরি 'ইডেফিক্স' রোভারটিকে প্রথমে ২০২৯ সালের শুরুর দিকে নামিয়ে দেবে। এই রোবোটিক অন্বেষণকারী যানটি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ চালাবে, যা মিশন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের ফোবসের ওপর সরাসরি নমুনা সংগ্রহের জন্য এমএমএক্স-এর চার পা বিশিষ্ট ল্যান্ডারের উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করতে সহায়তা করবে।
রোভারটি ফোবসের উপরিভাগের প্রায় ১৩১ থেকে ৩২৮ ফুট (৪০ থেকে ১০০ মিটার) উপর থেকে নিচে নেমে আসবে; এই ক্ষুদ্র চাঁদের মৃদু মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এর পতনকে হালকা করবে এবং রোভারটিকে নির্ভুলভাবে অবতরণ করার আগে সামান্য লাফিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।
স্বয়ংক্রয়ভাবে নিজের চাকা ও সোলার প্যানেল প্রসারিত করার পর এবং খাড়া অবস্থানে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার পর, ইডেফিক্স ১০০ দিনের একটি অভিযানে যাত্রা শুরু করবে। ফোবসের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এতই কম যে, প্রায় ৫৫ পাউন্ড (২৫ কেজি) ওজনের ইডেফিক্স ভূপৃষ্ঠে কাজ করার সময় মাত্র ০.৫ আউন্স (১৫ গ্রাম) ওজনের সমান অনুভূত হবে।
পানীয়ের ক্রেট বা কার্টুনের আকৃতির এই রোভারটি বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের জায়গাগুলো এবং সম্ভাব্য নিরাপদ অবতরণের স্থানগুলো খুঁজে বের করবে। এরপর মিশন টিম এমএমএক্স ল্যান্ডারের অবতরণের জন্য দুটি ভিন্ন স্থান নির্বাচন করবে।
গ্লাভিন বলেন, 'বর্তমান অরবিটারগুলোর তোলা ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে ফোবসের একটি দিক তুলনামূলক উজ্জ্বল এবং অন্য দিকটি অন্ধকার—বেশ যেন এর দুই ধরনের পৃষ্ঠ রয়েছে।' জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (জাক্সা)-র বিজ্ঞানী ড. তমোহিরো উসুই, যিনি গত ১০ বছর ধরে এই মিশনে কাজ করছেন, জানান এই কারণেই ফোবসের এই দুটি ভিন্ন অঞ্চল—একটি মঙ্গলের মুখোমুখি দিক এবং অন্যটি গ্রহটির বিপরীত দিক—প্রতিটি থেকে একটি করে নমুনা সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জাপানের ইনস্টিটিউট অফ স্পেস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিক্যাল সায়েন্সের সোলার সিস্টেম সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক উসুই বলেন, 'আমরা প্রথমে একটি অবতরণ স্থান নির্বাচন করব এবং কিছু ল্যান্ডিং অপারেশন পরিচালনা করব, এরপর সেখান থেকে উড্ডয়ন করে আবার কক্ষপথে ফিরে আসব। পরবর্তী অবতরণ স্থান অনুসন্ধানের জন্য আরও কয়েক মাস সময় লাগবে। ল্যান্ডিং অপারেশনগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।'
এমএমএক্স ল্যান্ডারের ফোবোস থেকে পাথর ও ধুলোবালি সংগ্রহ করার দুটি ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। একটি কোরিং স্যাপ্লার বা ড্রিল যন্ত্র ০.৮ ইঞ্চি (২ সেন্টিমিটার) গভীরে ছিদ্র করে ভূপৃষ্ঠের নিচের উপাদান মহাকাশযানটির নমুনা ফেরানোর ক্যাপসুলে থাকা একটি টিউবে সংরক্ষণ করবে। এছাড়া আরেকটি পৃথক বায়ুসংক্রান্ত স্যাপ্লার বা নিউম্যাটিক স্যাপ্লার উচ্চচাপযুক্ত গ্যাস ব্যবহার করে উপরিভাগের উপাদানগুলোকে ওপরে উড়িয়ে একটি টিউবে সংগ্রহ করবে।
নমুনাগুলো এমএমএক্স ল্যান্ডারে সংরক্ষণ করার পর, এটি উড্ডয়ন করবে, ডিমোস পর্যবেক্ষণ করবে এবং ২০৩০ সালে পৃথিবীর দিকে ফিরে আসার যাত্রা শুরু করবে।
উসুই বলেন, 'এমএমএক্স-এর মঙ্গল গ্রহের চাঁদগুলোর এই অভিযান থেকে প্রাপ্ত অন্তর্দৃষ্টি ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানববাহী মিশন পরিকল্পনা করতেও সাহায্য করতে পারে।'
মঙ্গলের রহস্য উন্মোচন
এমএমএক্স ল্যান্ডারটি বিভিন্ন উপাদানে ভরপুর একটি সুইস আর্মি নাইফের মতো, যা বিজ্ঞানীদের ফোবোস এবং ডিমোসের রহস্যময় উৎপত্তির রহস্য উন্মোচনের নানা উপায় সরবরাহ করে।
পৃথিবীতে নমুনা ফিরে আসার আগেই, গবেষকেরা এমএমএক্স-এর বিভিন্ন যন্ত্র—যেমন 'মার্স-মুন এক্সপ্লোরেশন উইথ গামা-রেজ অ্যান্ড নিউট্রনস স্পেক্ট্রোমিটার' (মেগান)—থেকে রিয়েল-টাইমে পাঠানো প্রাথমিক রিমোট-সেন্সিং তথ্যের একটি পূর্বরূপ পেয়ে যাবেন।
'মেগান'-এর পাওয়া তথ্য ফোবোস ও ডিমোসে হাইড্রোজেন, সোডিয়াম এবং ক্লোরিনের মতো উদ্বায়ী উপাদান বা নিম্ন স্ফুটনাঙ্ক ও গলনাঙ্কযুক্ত রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি প্রকাশ করতে পারে। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরির গ্রহে সংক্রান্ত বিজ্ঞানী এবং মেগানের সায়েন্স লিড ডেভিড লরেন্স জানান, 'এই মৌলিক উপাদানগত গঠনের পরিমাপ এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সরবরাহ করতে পারে, যা উৎপত্তির একটি নির্দিষ্ট তত্ত্বকে অন্যটির চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।'
লরেন্স বলেন, 'যদি কোনো বিশাল সংঘর্ষ ঘটে থাকে, তবে যা হয় তা হলো উপাদানগুলো প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে যায় এবং আপনি এই উদ্বায়ী উপাদানগুলোকে বাষ্পীভূত করে ফেলেন। এর বিপরীতে, আমরা সচরাচর যে সমস্ত গ্রহাণু দেখি, সেগুলোতে এই উদ্বায়ী উপাদানগুলোর পরিমাণ অনেক বেশি থাকে।'
ফ্রেম্যান 'মেগান'-এর ডেটা এবং এমএমএক্স ইনফ্রারেড স্পেক্ট্রোমিটার (এমআইাারএস)-এর ধারণ করা পর্যবেক্ষণের একটি যৌথ বিশ্লেষণ করবেন। এই স্পেক্ট্রোমিটারটি ফোবসের খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ এবং পানি-সংক্রান্ত উপাদান পরিমাপ করতে নিয়ার-ইনফ্রারেড বা নিকট-অবলোহিত আলো ব্যবহার করবে।
যদিও মঙ্গলের উপগ্রহগুলোই এই অভিযানের মূল অগ্রাধিকার, তবুও বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে এমএমএক্স-এর সংগৃহীত তথ্য মঙ্গল গ্রহের অতীতের নানা অজানা দিকও প্রকাশ করবে। ফ্রেম্যান বলেন, 'ফোবোস যদি মঙ্গলের ছিটকে বের হওয়া ও পরবর্তীতে পুনরায় একত্রিত হওয়া অংশ দিয়ে গঠিত হয়ে থাকে, তবে তা এই গ্রহটির গঠন এবং এর একেবারে শুরুর দিকের অবস্থা কেমন ছিল সে সম্পর্কে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ নতুন সূত্র দিতে পারে।'
ফ্রেম্যান আরও জানান, এমনকি এই পাথুরে উপগ্রহটিতে মঙ্গলের কোনো অবশিষ্টাংশ না থাকলেও, এটি যদি কোনো আটকে পড়া গ্রহাণু বা ধূমকেতুও হয়ে থাকে তবুও তা সমান রোমাঞ্চকর হবে—যা হয়তো সৌরজগতের দূরবর্তী প্রান্ত থেকে পানি এবং অন্যান্য উদ্বায়ী উপাদান মঙ্গলের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল।
গ্লাভিন বলেন, 'ফোবস ও ডিমোস যদি পানি এবং জৈব উপাদানে সমৃদ্ধ হয়ে থাকে, তবে তা মঙ্গলে জীবনের জন্য একটি প্রাথমিক উৎস বা অনুঘটক হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি বিশেষ করে যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী তা হলো জীবনের উৎপত্তি। আমরা কি ব্রহ্মাণ্ডে একাই? মঙ্গলে কি কখনো প্রাণের বিকাশ ঘটেছিল? ফোবসের নমুনা অধ্যয়ন করা এবং সেই সাথে ডিমোসকে বিশ্লেষণ করা সেই পুরো গল্পেরই অংশ।'
গ্লাভিন আগেরও বেশ কিছু নমুনা সংগ্রহ অভিযানে কাজ করেছেন; যেমন 'ওসিরিস-রেক্স', যা নিকট-পৃথিবী গ্রহাণু 'বেন্নু' থেকে অপ্রত্যাশিত পরিমাণে প্রচুর পরিমাণে জৈব উপাদান নিয়ে এসেছিল। এমএমএক্স অভিযানের ক্ষেত্রেও তার দল ফোবসের নমুনায় অ্যামিনো অ্যাসিড—যা প্রোটিন গঠনকারী অণু—এবং জীবনের অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান অনুসন্ধান করবে।
গ্লাভিন বলেন, 'আমরা সৌরজগতের যেখানেই দৃষ্টি দিই না কেন, মনে হয় অ্যামিনো অ্যাসিড যেন ঠিক সবখানেই রয়েছে। আমরা যা পর্যবেক্ষণ করব তা হলো—অ্যামিনো অ্যাসিডের সংখ্যা ও জটিলতার পার্থক্য, পাশাপাশি সেগুলোর আপেক্ষিক প্রাচুর্য, যা আমাদের এদের উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।'
ফোবোস ও ডিমোস সম্ভবত কোটি কোটি বছর ধরে অস্তিত্ব বজায় রেখেছে, যার অর্থ হলো এই উপগ্রহ দুটি মঙ্গল গ্রহের বিবর্তনের নীরব সাক্ষী হতে পারে। মঙ্গলের বেশ কাছাকাছি হওয়ার কারণে ফোবস একটি ছোট ডাস্টপ্যান বা ময়লা তোলার পাত্রের মতো কাজ করেছে, যা মঙ্গল গ্রহের পাতলা বায়ুমণ্ডল থেকে ভেসে আসা উপাদানগুলোকে নিজের বুকে জমা করেছে।
ফ্রেম্যান বলেন, 'ঠিক যেভাবে মঙ্গলের টুকরো পৃথিবীতে এসে পড়েছে, একইভাবে ফোবসের উপরিভাগেও মঙ্গলের টুকরো এসে জমা হতে পারে। আমরা যখন ফোবস থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে আসব, তখন তার মধ্যে মঙ্গলের ছোট ছোট টুকরো মিশে থাকতে পারে।'
শুধু এমএমএক্স-ই লাল গ্রহটির দিকে ছুটছে না। চীনের 'তিয়ানওয়েন-৩' মিশন—যার লক্ষ্য ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণ করে মঙ্গল গ্রহ থেকে সরাসরি নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা—তাও ২০৩১ সালের মধ্যে ফেরত আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গ্লাভিন বলেন, '২০৩০-এর দশকের শুরুটা সত্যিই মঙ্গল গ্রহ অনুসন্ধানের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ হতে পারে।'
