মার্কিন নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য রেকর্ডসংখ্যক মামলা দায়ের করছে ট্রাম্প প্রশাসন
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ অপরাধ করার অভিযোগে দেশটির নাগরিকত্ব গ্রহণ করা ৪০ জনের নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য নতুন করে ৪০টি মামলা করেছে।
সোমবার এক বিবৃতিতে ফেডারেল প্রসিকিউটররা বলেন, তারা অর্থপাচার, শিশুদের যৌন নির্যাতন, ভিসা জালিয়াতি ও কর ফাঁকিসহ 'গুরুতর অপরাধে' অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে এত অল্প সময়ের মধ্যে নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য করা আবেদনের সংখ্যার দিক থেকে এই ৪০টি মামলা সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। এসব আবেদন আগস্টের শেষ দিক থেকে অক্টোবরের শুরুর সময়ের মধ্যে করা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চে বলেন, "আজকের এই ঘোষণা আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগের সূচনা করছে।"
তিনি আরও বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে বিচার বিভাগ জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং মার্কিন জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।"
সোমবারের ঘোষণায় যে ৪০ নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, তারা মেক্সিকো, পাকিস্তান, চীন ও সিয়েরা লিওনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করার সময় নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং নিজেদের সম্পর্কে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছিলেন।
তাদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের মামলাগুলোতে অধিকাংশ সাজা হয়েছে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণের পর।
তালিকায় থাকা দুজনের বিরুদ্ধে চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
বিচার বিভাগের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি নাগরিক হওয়ার আগে অপরাধগুলো করায় নাগরিকত্ব পাওয়ার সময় তাদের 'ভালো নৈতিক চরিত্র' ছিল না এবং তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত হয়নি।
নাগরিকত্ব বাতিলের আইনের বিস্তৃত ব্যবহার
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বাতিলের আইন কয়েক দশক ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে এই আইন গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার হলোকাস্টে জড়িত থাকার তথ্য গোপন করা অথবা যুদ্ধাপরাধে অংশ নেওয়ার অভিযোগে কয়েক ডজন নাগরিকের নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছিল।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে এমা গোল্ডম্যানের ঘটনা। লিথুয়ানিয়ায় জন্ম নেওয়া এই নৈরাজ্যবাদী ও নারী অধিকারকর্মীকে ১৯১৭ সালে যুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে তার নাগরিকত্ব বাতিল করে তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নে ফেরত পাঠানো হয়।
তবে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর এ ধরনের নাগরিকত্ব বাতিলের ঘটনা অনেক কমে গেছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নির্বাসন অভিযান পরিচালনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে, দেশের বাইরে জন্ম নেওয়া কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য প্রসিকিউটররা আদালতের কাছে আবেদন করতে পারেন, যদি প্রমাণ হয় যে নাগরিকত্বের আবেদনের সময় তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কোনো 'গুরুত্বপূর্ণ তথ্য' গোপন করেছিলেন, যা জানা থাকলে তাকে নাগরিকত্ব পাওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হতো।
তবে ট্রাম্পের নাগরিকত্ব বাতিলের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিরোধিতার মুখে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে কিছু মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়তে পারেন।
সমালোচকেরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প এমন কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব বাতিলের ব্যবস্থা ব্যবহার করতে চাইছেন, যাদের তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হিসেবে দেখেন।
উদাহরণস্বরূপ, গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা বিপুলসংখ্যক সোমালি-আমেরিকানের নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নিতে পারে। মিনেসোটায় সোমালি অভিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিশু দিবাযত্নকেন্দ্রে জালিয়াতির অভিযোগ সামনে আসার পর এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।
তখন ট্রাম্প লিখেছিলেন, "তারা যেখান থেকে এসেছে, সেটি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ ও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ সেই সোমালিয়াতেই তাদের পাঠানো উচিত।"
ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের সদস্যদের মধ্যে বিশেষ করে প্রতিনিধি অ্যান্ডি ওগলস নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও তুলেছেন। মামদানি উগান্ডায় জন্মগ্রহণ করেছেন।
ট্রাম্প নিজেও মিথ্যাভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে মামদানি যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থান করতে পারেন।
এক পর্যায়ে ট্রাম্প প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের সম্ভাবনার কথাও তুলেছিলেন। মাস্ক ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও উপদেষ্টা ছিলেন। তবে ২০২৫ সালে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ার পর ট্রাম্প এমন কথা বলেন।
ট্রাম্প জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ব্যবস্থাও বাতিল করার চেষ্টা করেছেন। এই ব্যবস্থার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী প্রায় সব শিশুই দেশটির নাগরিকত্ব পায়।
এর অল্প কয়েকটি ব্যতিক্রমের মধ্যে রয়েছে কূটনীতিকদের সন্তান এবং বিদেশি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সন্তান।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত এবং নাগরিকত্ব গ্রহণের মাধ্যমে পাওয়া নাগরিকত্বের মতো এটি বাতিল করা যায় না।
জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ব্যবস্থা বাতিলের জন্য ট্রাম্পের নেওয়া উদ্যোগ খারিজ করে দেয়।
তবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা সীমিত করার লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয়বার একটি নির্বাহী আদেশ জারি করার পর এ নিয়ে আইনি লড়াই এখনও চলছে।
