যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও স্নায়ুযুদ্ধকালীন আইনে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সারসুরকে বহিষ্কারের অনুমতি দিল মার্কিন আদালত
স্নায়ুযুদ্ধ আমলের একটি আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সালাহ সারসুরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠাতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের একজন অভিবাসন বিচারক রায় এ দিয়েছেন। সালাহ সারসুর উইসকনসিনের সর্ববৃহৎ মসজিদের সভাপতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের একজন স্থায়ী বাসিন্দা।
ইসরায়েল-অধ্যুষিত পশ্চিম তীরে বেড়ে ওঠা সারসুরকে গত মার্চ মাসের শেষের দিকে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) আটক করে। পরবর্তীতে একজন ফেডারেল বিচারক পর্যবেক্ষণ করেন যে, সারসুর বাকস্বাধীনতা হরণজনিত প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের একটি জোরালো দাবি উত্থাপন করেছেন যা তার আটকাদেশকে বেআইনি ঘোষণা করে। এর ভিত্তিতে জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি মুক্তি পান।
শিকাগো ইমিগ্রেশন আদালতের বিচারক জেইমি সালিনার্দি মঙ্গলবার দেরিতে দেওয়া এক রায়ে সরকারের দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। রায়ে বলা হয়, শীতল যুদ্ধ আমলের 'ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট'-এর আওতায় সারসুর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। তবে গ্রিন কার্ড আবেদনে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার যে অভিযোগ সরকার তুলেছিল, তা খারিজ করে দিয়েছেন বিচারক।
মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, 'বিচারক এই মামলায় দেশ থেকে অপসারণের (রিমুভ্যাবিলিটি) একাধিক ভিত্তি বজায় রেখেছেন।'
সারসুর এই রায়কে "অত্যন্ত হতাশাজনক" উল্লেখ করে বলেন, তার আইনি দল এর বিরুদ্ধে আপিল করবে।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'ন্যায্য অধিকার এবং ফিলিস্তিনের বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো থেকে আমি পিছপা হব না। আইনি প্রক্রিয়ার সবকটি পথ নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত সারসুরকে পাঠানো যাবে না। সারসুর জানিয়েছেন, তাকে পশ্চিম তীরে ফেরত পাঠানো হলে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।
উইকনসিনের বৃহত্তম মসজিদ 'ইসলামিক সোসাইটি অব মিলওয়াকি' জানিয়েছে, সারসুর তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ বলেছে, 'সারসুরকে তার ফিলিস্তিনি ও মুসলিম পরিচয় এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার থাকার কারণেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।'
তার আইনি দল জানিয়েছে, তিনি টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং আইসিই হেফাজতে থাকার সময়ে তার ওজন ৩০ পাউন্ডেরও বেশি কমে গিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে সারসুরের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে কিশোর বয়সে ইসরায়েলি সামরিক আদালতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন—যার সুযোগ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন তাকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। অবশ্য সারসুর জানিয়েছেন, এই তথ্য মার্কিন সরকার কয়েক দশক ধরেই জানে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা 'বি'তসেলেম'-এর মতে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিচারের জন্য ব্যবহৃত সামরিক আদালতগুলোতে সাজা দেওয়ার হার ৯৬ শতাংশ এবং সেখানে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করার ইতিহাস রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দাবি করেছে, ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর বাড়িঘরে পেট্রোল বোমা (মলোটভ ককটেল) নিক্ষেপের অভিযোগে সারসুর দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।
সারসুর এই ধরনের অপরাধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, নির্যাতন চালিয়ে এবং চাপ প্রয়োগ করে অতীতে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়।
এদিকে, ট্রাম্প ফিলিস্তিনপন্থী বিদেশি বিক্ষোভকারীদের দেশ থেকে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্ট) উদ্যোগ নিয়েছেন, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে সেগুলোর অনুদান বন্ধের হুমকি দিয়েছেন, অভিবাসীদের সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণের নিয়ম কঠোর করেছেন এবং ইসরায়েলের সমালোচকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
ট্রাম্পের অভিযোগ, 'ফিলিস্তিনপন্থীদের এসব সুর ইহুদিবিদ্বেষী এবং তারা চরমপন্থীদের সমর্থন করে।' তবে মানবাধিকার কর্মী এবং কয়েকটি ইহুদি গোষ্ঠীসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য—'গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলাদারিত্বের সমালোচনা করা মানেই ইহুদিবিদ্বেষ নয়, এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার দাবিকে চরমপন্থার সমর্থন হিসেবে মিলিয়ে ফেলা অনুচিত।'
