আবারও ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি ও রাশিয়ার তেলের দ্বিমুখী চাপে ভারত
একটি নতুন নিষেধাজ্ঞা আইন যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলোর ওপর চড়া শুল্ক আরোপের ব্যাপক ক্ষমতা দেয়, তা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের এমনিতেই উত্তপ্ত বাণিজ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা এই বিলটি তাকে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা অব্যাহত রাখা দেশগুলো থেকে আসা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রদান করে। কংগ্রেসের মূল উদ্দেশ্য ছিল মস্কোর ইউক্রেন যুদ্ধ পরিচালনাকারী রাজস্বের উৎস বন্ধ করে দেওয়া।
তবে আইনটি ট্রাম্পকে কখন এবং কীভাবে এসব শুল্ক প্রয়োগ করবেন সে বিষয়ে যথেষ্ট ইচ্ছাধীন ক্ষমতা দেয়। আর তিনি ভারতীয় পণ্যের ওপর এমন শুল্ক আরোপ করবেন কি না, বা কখন করবেন যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় আমদানির খরচ বাড়িয়ে তুলবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ভারতের দৃষ্টিতে এই আইনটিকে একটি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ট্রাম্পের ক্ষমতা ও দরকষাকষির সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, ঠিক এমন সময়ে যখন তিনি নিজেই রাশিয়ার সাথে ব্যবসার সুযোগ খুঁজছেন।
পরিস্থিতির সময়কাল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বেশ কঠিন অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। ভারত তার ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করে, এবং ইরানে যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় রাশিয়ার ওপর তাদের নির্ভরশীলতা আবারও বেড়েছে।
বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান 'কেপলার'-এর মতে, এই গ্রীষ্মে ভারতের মোট আমদানিকৃত তেলের প্রায় অর্ধেকই ছিল রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল। এই নতুন আইনটি মার্কিন নীতির ঘনঘন পরিবর্তনের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত, যা ভারতকে বারবার তাদের রাশিয়ার তেল কেনার কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে।
ফেব্রুয়ারিতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে, ওয়াশিংটন ও নয়া দিল্লি একটি বাণিজ্য চুক্তি সই করে যার অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক কমাবে এবং ভারত রাশিয়ার তেল আমদানি হ্রাস করবে। এরপরই পরপর সেই চুক্তির পেছনের মূল ভিত্তিগুলো ভেঙে পড়ে। সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে, যা তাকে ভারতের সাথে দরকষাকষিতে সাহায্য করেছিল।
ইরানে যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগর থেকে তেল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ভারতকে ও অন্যান্য দেশকে অতিরিক্ত রাশিয়া থেকে তেল কিনে সেই ঘাটতি পূরণের অনুমতি দেয়।
এখন ওয়াশিংটন আবারও ভারতকে সেই তেল কেনার জন্য শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, যা এখন অন্য কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করা আগের চেয়েও কঠিন হয়ে উঠেছে। ভারতও এর কড়া জবাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, 'ভারত তার ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।'
তারা আরও জানায়, বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা তাদের সরবরাহকারীর উৎসে বৈচিত্র্য আনা অব্যাহত রাখবে। মন্ত্রণালয় বলেছে, এর প্রভাব যে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপরই পড়বে তা নয়, বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
ভারত আগেও একই ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ওয়াশিংটন নয়া দিল্লিকে ভেনেজুয়েলা ও ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে চাপ দিয়েছিল, কিন্তু পরে কূটনীতি ও জ্বালানির দামের পরিবর্তনের সাথে সাথে সেসব দেশের প্রতি আমেরিকার নীতিও বদলে যায়।
এই পরিস্থিতি ভারতকে দুটি জরুরি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য করেছে। ভারত একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তেমনি অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশের জন্য পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী মূল্যের জ্বালানি নিশ্চিত করতে চায়।
এই ভারসাম্যের হিসাবকে আরও জটিল করে তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ভারতের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হয়ে উঠছে, যদিও তারা অন্যত্র ভারতের কেনাকাটার জন্য শাস্তির হুমকি দিচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের রান্নার গ্যাস আমদানির অংশীদারত্ব ডিসেম্বরের ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক 'গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ'-এর প্রধান ও ভারতের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা অজয় শ্রীবাস্তব বলেছেন, ভারতের মার্কিন শুল্ক নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয়। তিনি যুক্তি দেন, শুল্ক কিছু ভারতীয় রফতানিকারকদের ক্ষতি করতে পারে, তবে এই অর্থ তোলা হয় আমেরিকান আমদানিকারকদের কাছ থেকে এবং দিনশেষে তা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই খরচ বাড়িয়ে দেয়।
শ্রীবাস্তবের মতে, সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আগের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করার পর তিনি যে দরকষাকষির ক্ষমতা হারিয়েছিলেন, নতুন আইনটি তাকে সেই ক্ষমতার কিছু অংশ ফিরিয়ে দিয়েছে। ভারতের সাথে দরকষাকষি করা বাণিজ্য চুক্তিটি স্থগিত অবস্থাতেই রয়ে গেছে।তবে এই নতুন ক্ষমতা ওয়াশিংটনকে ভারতের সামনে বড় কিছু প্রস্তাব করার সুযোগ দেবে—যেমন, ভারতীয় ছাড়ের বিনিময়ে শুল্কের হার কমিয়ে দেওয়া।
শ্রীবাস্তব বলেন, 'আমার সমস্যা হলো, বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও এসব ঝামেলার কোনো স্থায়ী সমাধান বা শান্তি মিলবে না।' ভারত প্রত্যক্ষ করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বড় বাণিজ্য অংশীদারদের সাথে চুক্তি করার পরও শুল্ক এবং শর্তাবলী নিয়ে পুনরায় বিতর্ক বা বিরোধ দেখা দিয়েছে।
আর এই নতুন আইন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঠিক কী বার্তা দিচ্ছে বা এর অর্থ কী দাঁড়াচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা দেশের তালিকায় ভারত একা নয়।
চীন ভারতের চেয়েও বেশি রাশিয়ার তেল কেনে এবং নতুন আইনের আওতায় তারাও পড়ে। ভারতীয় কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষকরা নজর রাখছেন—ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের ওপরও ঠিক একই রকম চাপ প্রয়োগ করে কি না, যেমনটা তারা নয়া দিল্লির ওপর করছে। প্রশ্নটির গুরুত্ব অনেক, কারণ চীনকে মোকাবিলা বা ভারসাম্য রক্ষা করার তাগিদেই ভারত বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
গত সপ্তাহে, চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়া দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সাথে একত্রিত হন এবং অ-পশ্চিমী সহযোগিতার এক সুস্পষ্ট বার্তা দিয়ে একফ্রেমে ছবি তোলেন।
আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধান ব্রিকস শক্তির দেশগুলোর মধ্যে ভারতের জন্য ওয়াশিংটনের সাথে অংশীদারত্ব গভীর করার একটি শক্তিশালী কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সি. রাজা মোহন ভারতের এই উভয়সংকটকে দুটি অস্বস্তিকর বিকল্পের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি বলে বর্ণনা করেছেন।
মোহন বলেন, 'আপনি কি আমেরিকার জ্বলন্ত কড়াই থেকে লাফ দিয়ে চীনের আগুনের কুন্ডলীতে পড়তে চান?'
চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি ভারতের জন্য ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার একটি বড় কারণ।
কিন্তু অন্যদিকে, জ্বালানি ও বাণিজ্য নিয়ে আমেরিকার ঘনঘন দাবির পরিবর্তন নয়া দিল্লিতেও এই প্রশ্ন তুলেছে, নতুন কোনো চুক্তি করলেও তা কতটা দীর্ঘস্থায়ী বা স্থায়ী হবে। শ্রীবাস্তব বলেন, 'যতক্ষণ না আমেরিকার নীতি স্থিতিশীল হচ্ছে, ভারতের কোনো চুক্তিতে যাওয়া উচিত নয়।'
