ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি: গ্রিনল্যান্ডে বড় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ঘোষণা, প্রতিপক্ষের ঘাঁটি নিষিদ্ধ
যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক এবং গ্রীনল্যান্ড একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে—যার অধীনে যুক্তরাষ্ট্র গ্রীনল্যান্ডে নিজস্ব বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতির প্রসার ঘটাবে এবং একই সাথে দ্বীপাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পথ বন্ধ করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার জানিয়েছেন এমন তথ্য জানিয়েছেন।
'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া দেশটির কোনো শত্রু ভাবাপন্ন রাষ্ট্র এই দ্বীপে স্পর্শকাতর কোনো অর্থনৈতিক বা কৌশলগত বিনিয়োগ করতে পারবে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই চুক্তির কোনো মেয়াদ বা মেয়াদউত্তীর্ণের তারিখ নেই।
ট্রাম্প লিখেছেন, 'আমার নির্দেশনায়, আমরা ডেনমার্ক ও গ্রীনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের সাথে কাজ করেছি যাতে এটি নিশ্চিত করা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চিরকালের জন্য গ্রীনল্যান্ডে যা প্রয়োজন তা করার পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে—যা গ্রীনল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষায় ভূমিকা রাখবে।'
এর আগে শুক্রবার রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড গ্রীনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক দ্বীপটিকে কিনে নেওয়ার ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের যে স্বপ্ন ছিল—তা থেকে বেশ কিছুটা পিছিয়েই রয়েছে।
১৯৫১ সালের একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বদৌলতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই গ্রীনল্যান্ডের ওপর প্রায় পূর্ণাঙ্গ আকাশসীমা ব্যবহার এবং সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অধিকার ভোগ করে আসছে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা ইঙ্গিত দেয়, তিনি এই আলোচনার ফলাফলে বেশ সন্তুষ্ট এবং অন্তত নিকট ভবিষ্যতে তিনি হয়তো দ্বীপটির ভূখণ্ড দাবির বিষয়টি পুনরায় সামনে আনবেন না। বিস্তারিত কোনো বিবরণ না দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শীঘ্রই এই দ্বীপে বড় আকারের সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলবে—যেখানে দ্বীপটির দুর্গম উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইতোমধ্যেই মার্কিন স্পেস ফোর্সের একটি ঘাঁটি রয়েছে। ট্রাম্প আরও লেখেন, 'এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক অবিশ্বাস্য স্বপ্ন পূরণ।'
চুক্তির ব্যাপ্তি নিয়ে অস্পষ্টতা
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুক্রবার জানানো হয়েছে যে, এই চুক্তিটি উত্তর আটলান্টিক এবং সুমেরু অঞ্চলের (আর্কটিক) নিরাপত্তা আরও জোরদার করবে।
গ্রীনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন এক বিবৃতিতে বলেছেন, চুক্তিটিতে গ্রীনল্যান্ডের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় এই সুমেরু দ্বীপটির অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, 'এটি আমাদের সবার জন্যই কল্যাণকর।'
তবে নতুন এই চুক্তির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কোনো সামরিক ঘাঁটি নির্মিত হবে কি না—সেটিসহ অনেক বিষয়ই শুক্রবার রাত পর্যন্ত অস্পষ্ট ছিল। সাধারণত আলোচনা বা চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এর পোস্টগুলোতে প্রায়শই পর্যাপ্ত তথ্য বা সুনির্দিষ্ট বিবরণের অভাব থাকে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সদস্য এবং পেন্টাগনের প্রাক্তন কর্মকর্তা ইমরান বায়োমি বলেছেন, 'মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রীনল্যান্ড বা ডেনমার্কের অনুমোদন ছাড়াই স্বাধীনভাবে নতুন ঘাঁটি নির্মাণ করতে পারে, তবেই কেবল এটি একটি নতুন বিষয় বলে গণ্য হবে। তবে সার্বিকভাবে, মনে হচ্ছে ওয়াশিংটন ন্যাটোর সাথে সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর টানাপোড়েন সৃষ্টি না করেই কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে এই উদ্দেশ্যগুলোর সিংহভাগই অর্জন করতে পারত।'
ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ডটিতে চুক্তিটি সাধারণ মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তাও স্পষ্ট নয়। দ্বীপটির বাসিন্দারা পূর্ণ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা রাখেন এবং মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের যেকোনো প্রচেষ্টাতেই সবসময় ক্ষোভ প্রকাশ করে এসেছেন।
পৃথক এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, এই চুক্তিটি দ্বীপটিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের জাতীয় নিরাপত্তার যাবতীয় উদ্বেগ "স্থায়ী এবং পূর্ণাঙ্গভাবে" নিরসন করেছে।
তিনি লেখেন, 'গ্রীনল্যান্ড চিরকালের জন্য উত্তর আমেরিকার কৌশলগত প্রতিরক্ষা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং এটি প্রতিপক্ষ যেকোনো শক্তিকে এই দ্বীপ ও এর আশপাশের অঞ্চল থেকে দূরে রাখবে।'
চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, এই সমঝোতা অনুযায়ী ন্যাটোভুক্ত নয় এমন দেশগুলোর জন্য গ্রীনল্যান্ডে কোনো প্রকার সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের সুযোগ নিষিদ্ধ থাকবে। একই সাথে এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার অনুমতি দেবে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে প্রবেশের অধিকার, ঘাঁটি স্থাপন ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়—যা গ্রীনল্যান্ড ভবিষ্যতে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করলেও কার্যকর থাকবে।
