ইরান যুদ্ধে ধরা পড়ছে ঘাঁটির দুর্বলতা: মধ্যপ্রাচ্যে সেনা কমানোর, ভূর্গভে স্থাপনা সরানোর পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ হলে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতির ধরন বদলাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক মাস ধরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অঞ্চলজুড়ে কয়েক দশকে গড়ে তোলা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও গোয়েন্দা স্থাপনাগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ার পর এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শেষে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু এলাকায় সামরিক উপস্থিতি কমানো যায় কি না, তা নিয়ে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন। যেসব ঘাঁটি রাখা হবে, সেগুলোর কিছু স্থাপনা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষায় মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছে পেন্টাগন।
এতে কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে বড় পর্যালোচনাগুলোর একটি শুরু হতে পারে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছেন। পাশাপাশি সেখানে দুটি বিমানবাহী রণতরি ও এক ডজনের বেশি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন আছে। তবে ইরানের হামলায় প্রমাণিত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য গড়ে তোলা স্থায়ী ঘাঁটিগুলোও এখন হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে।
সিএনএনকে একজন মার্কিন কর্মকর্তা ও সাবেক একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রিয়াদে সিআইএর একটি ঘাঁটি ইরানের হামলায় কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।
এখন এসব ক্ষয়ক্ষতি থেকেই ওয়াশিংটনে বড় একটি প্রশ্ন উঠেছে—মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক অবকাঠামোর কতটা আদৌ পুনর্নির্মাণ করা হবে?
কিছু ঘাঁটি আর নাও বানানো হতে পারে
সিএনএন জানিয়েছে, আগামী বছর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও সামরিক স্থাপনার কাঠামো বদলানোর কয়েকটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন সামরিক কর্মকর্তারা।
তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পর্যালোচনা শুরু হয়নি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও হয়নি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়াও এ ধরনের বড় পরিবর্তনের অন্যতম শর্ত।
ইরানের হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হওয়া কিছু স্থাপনা নতুন করে না বানিয়ে পরিত্যক্ত রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এর একটি কারণ হলো, এসব স্থাপনা পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।
পেন্টাগনের কম্পট্রোলার জুলস 'জে' হার্স্ট এপ্রিলে জানিয়েছিলেন, ক্ষয়ক্ষতি মেরামতে কত খরচ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের সামরিক উপস্থিতি রাখতে চায়, তার ওপরও সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
তিনি বলেন, কিছু স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করা হবে কি না, সেটিও পেন্টাগনকে ঠিক করতে হবে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ থেকে মার্কিন সেনা কমানোর বিষয়েও আলোচনা করছেন। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষার বড় দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বড় স্থায়ী সামরিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণে কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। এ ব্যয়ের একটি অংশ বহন করতে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকেও অনুরোধ করতে পারে ওয়াশিংটন।
ভূর্গভে স্থাপনা সরানোর পরিকল্পনা
তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা কমানো মানেই দেশটির সামরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া নয়।
অবশিষ্ট সেনাদের নিরাপদ রাখতে সামরিক স্থাপনাগুলো কীভাবে আরও সুরক্ষিত করা যায়, তা নিয়েও কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে কিছু স্থাপনা মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
পেন্টাগন আগে থেকেই ভূগর্ভস্থ স্থাপনার কথা ভেবেছিল। তবে যুদ্ধের শুরুর দিকের হামলায় বর্তমান ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা স্পষ্ট হওয়ার পর বিষয়টি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, 'এই দুর্বলতাগুলো সবসময়ই জানা ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বিষয়টি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়নি।'
সিআইএ ও মার্কিন বিশেষ বাহিনীর ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আরও বড় হতে পারে। সংবেদনশীল অভিযান পরিচালনার জন্য এসব বাহিনীর সদস্য ও সরঞ্জাম সবসময় মধ্যপ্রাচ্যে রাখার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
বিকল্প হিসেবে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর কথা ভাবা হচ্ছে। অভিযান শেষে তাদের আবার দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
সেনা উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবনা
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি কমানোর এই আলোচনা গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের নেওয়া উদ্যোগের পরও অঞ্চলটিতে দেশটির সামরিক প্রতিশ্রুতি কমাতে না পারার বিষয়টি সামনে এনেছে।
১৯৯৮ সালেই মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ২৭ হাজার মার্কিন সেনা ছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধ এবং অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করলে এ উপস্থিতি দ্রুত বাড়ে।
২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের সময় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছিল। ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা কখনোই প্রায় ১ লাখের নিচে নামেনি।
পরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এশিয়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ও সম্পদ সরানোর উদ্যোগ নেন। প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্পও চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কৌশলগত হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তবে একের পর এক নতুন সংকট যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও মধ্যপ্রাচ্যে ফিরিয়ে এনেছে।
এবারের পরিবর্তনের আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধেরও কোনো সমাধান হয়নি।
ইরান এখনো মার্কিন ঘাঁটি ও সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ইরানের অবকাঠামোয় হামলা এবং তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও অব্যাহত রেখেছে ওয়াশিংটন।
সিএনএন এর আগে জানিয়েছিল, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন যে আরও সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক চাপের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই কৌশল কত দিনে ফল দেবে, তার কোনো স্পষ্ট সময়সীমা নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত কেমন হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে আপাতত ইরানের হামলার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
নিকট ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনা ও সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের হামলার ঝুঁকিতে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাহরাইন নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন। দেশটিতে ঐতিহ্যগতভাবে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর রয়েছে।
গত সপ্তাহে নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল বলেন, 'আমরা শিগগিরই সেখানে ফিরছি না। বিষয়টি নিয়ে আমি পুরোপুরি সৎ থাকতে চাই।'
