ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন অস্ত্র কোম্পানিগুলোর অর্ডার ও বিক্রি বেড়েছে
মার্কিন অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ পূরণ এবং দেশের প্রতিরক্ষা শিল্প খাতকে 'যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির অবস্থায়' নিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় বৃদ্ধির দরুন বিক্রি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে।
লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রুম্যান এবং রেথিয়নের মূল প্রতিষ্ঠান আরটিএক্স তাদের মুনাফার পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, তাদের হাতে থাকা কাজের অর্ডারের পরিমাণ সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
লকহিড জানিয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবসা থেকে আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৪১০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে প্যাট্রিয়ট এবং প্রিসিশন স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়াচ্ছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র এ বছর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যবহার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সংস্থার কাছ থেকে তিন হাজার ৫০০ কোটি ডলারের একটি অর্ডার, যার মাধ্যমে টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উৎপাদন চার গুণ বাড়ানো হবে, মেরিল্যান্ডভিত্তিক এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা মোট অর্ডারের পরিমাণ ২৩ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন কেন্দ্র' মে মাসে জানিয়েছিল, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র এক হাজার থেকে এক হাজার ৪০০ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তার সঙ্গে এটি মিলিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে 'গভীর ব্যাকলগ বা অর্ডার জট' সৃষ্টি হয়েছে, যা দূর করতে ২০২৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
রেথিয়নের দ্বিতীয় প্রান্তিকের বিক্রিও ১৮ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে, যা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গত ১০ বছরে গড়ে বছরে ৮৬টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র কেনা হলেও, শুধু ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ৭৮৫টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র কেনার আবেদন করেছে।
মেলিয়াস রিসার্চের বিশ্লেষক স্কট মিকাস বলেন, 'ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত আরটিএক্সের বিক্রি করা ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আরও কমিয়ে দেবে।'
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারেও চাহিদা শক্তিশালী রয়েছে। রেথিয়নের হাতে থাকা মোট অর্ডারের ৪৮ শতাংশই বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে এসেছে। এই অর্ডারের বড় অংশ এসেছে প্যাট্রিয়ট, এআইএম-১২০ আমরাম এবং জিইএম-টি ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা থেকে।
বৃহস্পতিবার সকালে লকহিডের শেয়ারের দাম ১১ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। একই দিনে আরটিএক্সের শেয়ারের দামও ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ-সংক্রান্ত বিভাগগুলোর বিক্রিতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির কথা জানিয়েছে।
এদিকে, নর্থরপ গ্রুম্যান মঙ্গলবার জানিয়েছে, তাদের হাতে থাকা মোট অর্ডারের পরিমাণ সর্বকালের সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তারা মোট ২ হাজার কোটি ডলারের নতুন চুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ৭৬০ কোটি ডলারের চুক্তি রয়েছে 'সেন্টিনেল' আন্তমহাদেশীয় দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্থলভিত্তিক 'পরমাণু ত্রয়ী' প্রতিরোধ কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ক্ষয় হওয়া এবং এর আগে ইউক্রেনকে সরবরাহের ফলে কমে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদনের গতি বাড়াতে উৎসাহ দিচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে এবং গোলাবারুদ কেনার জন্য সাত বছরের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত চুক্তি দেওয়া হচ্ছে, যাতে এসব প্রতিষ্ঠান ও তাদের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতের চাহিদা সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হতে পারে।
লকহিড মে মাসে আলাবামায় একটি নতুন উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে নর্থরপ, রেথিয়ন এবং আরেক প্রধান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এল-থ্রি হ্যারিসও তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে কয়েকশ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে।
আরটিএক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রিস্টোফার ক্যালিও বৃহস্পতিবার বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রস্তাব এক লক্ষ কোটি ডলারের সীমা অতিক্রম করতে যাচ্ছে—এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।'
তিনি আরও বলেন, 'এর সঙ্গে যে বহু বছরের বাজেট প্রস্তাবগুলো রয়েছে, সেগুলোও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আগামী বহু বছর ধরে এই চাহিদা অব্যাহত থাকবে বলে আমি মনে করি।'
লকহিডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিম টাইকলেট বৃহস্পতিবার বিনিয়োগকারীদের বলেন, নতুন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত চুক্তিগুলো 'সরকারের খেয়ালখুশিমতো পরিবর্তন করা যাবে না।' তিনি আরও বলেন, 'অর্ডার আসার আগেই আমরা উৎপাদন এবং নকশা তৈরির সক্ষমতায় বিনিয়োগ করছি।'
